প্যালেস্তাইনে পৌঁছানোর পর প্রথমবারের মতো এইসব সেক্যুলারিস্টের সাথে কুকের পরিচয় হয়। কয়েক বছর আগে তাদের ধর্ম প্রত্যাখ্যান তাঁকে ভীত করেছিল, কিন্তু পবিত্র ভূমিতে কাজ করতে যেতে দেখার পর তাঁর ধারণা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন তিনি। তিনি আবিষ্কার করেন তাদের নিজস্ব আধ্যাত্মিকতা রয়েছে। হ্যাঁ, ওরা বেপরোয়া ও উদ্ধত বটে, কিন্তু ওদের ‘দয়া, সততা, স্বচ্ছতা ও করুণা…এবং [ওদের মাঝে] জ্ঞানের চেতনা ও উর্ধ্বারোহণের মহান গুণাবলী ও আদর্শও রয়েছে।’ সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ‘বিশ্বব্যবস্থায় বাসকারী ও মধ্যপন্থী ও ভদ্রলোকদের ব্যথিতকারী ওদের বিদ্রোহী ভাব’ ইহুদি জনগণকে সামনে ঠেলে দেবে; ইহুদিরা প্রগতি অর্জন করতে চাইলে এবং তাদের নিয়তিকে পূরণ করতে চাইলে ওদের গতিশীলতা জরুরি।৬১ যায়নবাদী অগ্রপথিকদের তারিফ করার সময় তিনি এমন সব গুণ বেছে নিয়েছিলেন যেগুলো প্রাক আধুনিক কালে দারুণভাবে ঘৃণিত বিবেচিত হত, যখন লোকে চলমান ব্যবস্থার ছন্দ ও সীমা মেনে নিতে বাধ্য ছিল, যেখানে সীমা অতিক্রমকারী ব্যক্তিবিশেষ সমাজকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত।৬২
এই প্রবল প্রাণগুলো কোনও রকম সীমায় নিজেদের বন্দি হতে দিতে অস্বীকার করে নিজেদের সংহত করেছে,…শক্তিশালী জানে যে শক্তির এই প্রকাশ আসে বিশ্বকে পরিশুদ্ধ করতে, জাতি, মানবতা ও বিশ্বকে উজ্জীবিত করতে। কেবল সূচনার লগ্নেই এটা বিশৃঙ্খলার ও রূপে আবির্ভূত হয়েছিল।৬৩
তালুমুদিয় কালে র্যাবাইরা কী ভবিষ্যদ্বাণী করেননি যে ‘ঔদ্ধত্য ও স্পর্ধার একটা কাল[৬৪] আসবে যখন তরুণরা প্রবীনদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে? এই বেদনাদায়ক বিদ্রোহ স্রেফ ‘মেসায়াহর পদক্ষেপ…গম্ভীর পদক্ষেপ, বিশুদ্ধ আনন্দময় অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
কুক ছিলেন নতুন সেক্যুলারিজমকে আলিঙ্গন করতে পারা প্রথম গভীরভাবে ধর্মীয় চিন্তকদের অন্যতম; যদিও যায়নবাদী উদ্যোগ প্যালেস্তাইনে এক ধৰ্মীয় নবায়নের দিকে চালিত করবে বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। ধার্মিক সেক্যুলারিস্টদের- মিথোস ও লোগোসের প্রতিভূ-শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছে না ভেবে নিষ্কৃতির সিন্থেসিসের দিকে চালিতকারী দুটি বিপরীতমুখী দর্শনের দ্বান্দ্বিক সংঘাতের হেগেলিয় দর্শন গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সেক্যুলারিস্টরা ধার্মিকদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত কিন্তু এই বিদ্রোহে যায়নবাদীরা ইতিহাসকে এক নতুন পরিপূর্ণতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। গোটা সৃষ্টি, প্রায়শঃ বেদনাদায়কভাবে, ঈশ্বরের সাথে চূড়ান্ত মিলনের লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে। যে কেউ প্রথাগত ধারণাকে ধ্বংস করেছে বলে মনে হলেও এক নতুন উপলব্ধির দিকে নিয়ে যাওয়া আধুনিক বিজ্ঞানের বর্ণিত বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় বা কোপার্নিকাস, ডারউইন বা আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে এটি লক্ষ করতে পারে বলে বিশ্বাস করতেন কুক। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বেদনাকেও লুরিয় পরিভাষায় শেষ পর্যন্ত আমাদের জগতে পবিত্রকে পুনঃস্থাপিতকারী ‘ব্রেকিং অভ দ্য ভেসেলস’, সৃজনশীল প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে দেখা যেতে পারে।৬৬ ধার্মিক ইহুদিদের এভাবেই যায়নবাদী বিদ্রোহকে বিবেচনা করা উচিত। ‘এমন কিছু সময় আসে যখন তোরাহর বিধিবিধানকে অবশ্যই লঙ্ঘন করতে যেতে হয়,’ ঔদ্ধত্যের সাথে যুক্তি দিয়েছেন কুক। মানুষ যখন ভিন্ন পথের সন্ধান করছে, যখন সমস্ত কিছুই নতুন ও নজীরবিহীন, তখন ‘বৈধ পথ দেখিয়ে দেওয়ার নেই কেউ, তখন লক্ষ্য অর্জিত হয় সব সীমা ছিন্ন করার ভেতর দিয়ে। এটা ‘বাহ্যিকভাবে শোকাবহ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আনন্দের একটা উৎস! ৬৭
কুক সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাননি। ধার্মিক ও সেক্যুলার ইহুদিদের ভেতর ‘একটা বিরাট যুদ্ধ চলছে।’ দুটো শিবিরই তাদের দিক থেকে সত্যি: যায়নবাদীরা অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গতভাবেই লড়াই করছে, আবার অর্থডক্সরা বোধগম্যভাবেই ঐতিহ্যের অসময়োচিত বিসর্জনের ফলে দেখা দেওয়া বিশৃঙ্খলা এড়াতে উদগ্রীব। কিন্তু দুই পক্ষই আংশিক সত্য ধারণ করেছে। ৬৮ এদের মধ্যকার বিরোধ এক অসাধারণ সংশ্লেষের দিকে চালিত করবে যাতে কেবল ইহুদিরাই নয়, বরং সারা বিশ্বের সকল মানুষ উপকৃত হবে। ‘বিশ্বের সকল সভ্যতা আমাদের আত্মার পুনর্জাগরণের ভেতর দিয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠবে,’ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তিনি; ‘সকল ধর্মই নতুন ও মূল্যবান পোশাক পরিধান করবে, নোংরা, ঘৃণ্য ও অপরিচ্ছন্ন সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে দেবে।৬৯ মেসিয়ানিক স্বপ্ন ছিল এটা। কুক সত্যিই বিশ্বাস করতেন, তিনি শেষ যুগে বাস করছেন, অচিরেই মানব ইতিহাসের চূড়ান্ত সম্পূর্ণতা প্রত্যক্ষ করবেন।
কাব্বালাহর সময়হীন প্রতীকের সাথে তাঁর যুগের অসাধারণ বিকাশকে সমন্বিত করার মাধ্যমে এক নতুন মিথ গড়ে তুলছিলেন কুক। কিন্তু আধুনিক কালের মানুষ হিসাবে এই মিথকে ভবিষ্যতের দিকে চালিত করেছেন; এখান ইতিহাসকে সামনের দিকে ঠেলে নিয়ে চলা বেদনাদায়ক ও উত্তাল গতিময়তা দেখানো হয়েছে। ইহুদি পাঠকদের পরিস্থিতির স্থিতাবস্থা ও যেমন হওয়ার কথা তাকেই মিনে নিতে সম্মত করার বদলে কুক যুক্তি দেখিয়েছেন যে, অতীতের সমস্ত পবিত্র আইন উপেক্ষা করে নতুন করে শুরু করা প্রয়োজন। কিন্তু আধুনিক চাপ সত্ত্বেও কুকের মিথ তারপরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে প্রাক আধুনিক বিশ্বের অংশ। তাঁর দুটি শিবিরের দৃষ্টিভঙ্গি, ধার্মিক ও সেক্যুলার যায়নবাদী, মিথোস ও লোগাসের প্রাচীন ধারণার খুবই কাছাকাছি, শ্রমের সমান বিভাজন তুলে ধরে। যুক্তিবাদী বাস্তববাদীরাই ইতিহাসকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, লোগোস সব সময়ই যেমন করে থাকে, অন্যদিকে ধার্মিক, মিথোস ও কাল্টের প্রাচীন বিশ্বে প্রতিনিধিত্বকারীরা এই কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দেয়। ‘আমরা তেফেলিন [ফিল্যাক্ট্রিজ] সাজাই,’ অর্থডক্স বুলি উচ্চারণ করতে পছন্দ করতেন কুক। ‘আর অগ্রগামীরা ইঁট সাজায়। মিথ ছাড়া যায়নবাদীদের কর্মকাণ্ড কেবল অর্থহীনই নয়, বরং দারুণভাবে দানবীয় প্রকৃতির। যায়নবাদীরা সেটা না বুঝতে পারে, বিশ্বাস করতেন কুক, ‘কিন্তু তারা ঈশ্বরেরই হাতের পুতুল, স্বর্গীয় নির্ধারিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সাহায্য করছে। কেবল এভাবেই তাদের ধর্মীয় বিদ্রোহকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যেতে পারে; অচিরেই—তাঁর জীবদ্দশাতেই এমনটা ঘটার ইঙ্গিতও দিয়েছেন কুক-পবিত্র ভূমিতে এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব ঘটবে, ইতিহাসের নিষ্কৃতি ঘটবে।
