সেক্যুলারকে আধ্যাত্মিকতায় পরিবর্তনের অন্যতম বেপরোয়া ইহুদি প্রয়াস রূপ লাভ করেছিল র্যাবাই আব্রাহাম ইত্যহাক কুকের হাতে (১৮৬৫-১৯৩৫)। তিনিও ১৯০৪ সালে নতুন বসতির সম্প্রদায়ের র্যাবাই হওয়ার উদ্দেশ্যে প্যালেস্তাইনে অভিবাসন করেছিলেন। এক অদ্ভুত নিয়োগ ছিল এটা। বেশির ভাগ অর্থডক্সের বিপরীতে যায়নবাদী আন্দোলনে গভীরভাবে আন্দোলিত ছিলেন কুক। কিন্তু ১৮৯৮ সালে বাসেলে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় যায়নবাদী কংগ্রেসে যোগদানকারী প্রতিনিধিদের ‘যায়নবাদের সাথে ধর্মের কোনও সম্পর্ক’ না থাকার ঘোষণায় আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন।৫৭ তীব্র ভাষায় এর নিন্দা জানান তিনি। ‘অসাধারণ নতুন আন্দোলনটিকে এর খোদ জীবন ও সৌন্দর্যের আলোর উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপর-নিচে মৃত্যুর ভয়ঙ্কর কালো ছায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। এটা ‘এক ধরনের অমর্যাদা ও বিকৃতি,’ যায়নবাদকে বিনষ্টকারী ‘বিষ’, এর ‘পচন ও কীটপতঙ্গের নিচে চাপা পড়ে যাবার’ কারণ হচ্ছে। এর ফলে যায়নবাদ কেবল ‘শূন্য গর্ভ পাত্রে পরিণত হতে পারে…ধ্বংসশীলতা ও সংঘাতের চেতনায় পরিপূর্ণ ৫৮ প্রায়শঃই প্রাচীনকালের পয়গম্বরদের ভাষায় কথা বলতেন কুক, কিন্তু তাঁর চিন্তার বহু উপাদান ছিল আধুনিক। তিনি ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বহু আগেই জাতীয়তাবাদ মারাত্মক হয়ে ওঠার ও পবিত্রতার বোধ ছাড়া রাজনীতির দানবীয় চেহারা নিতে পারার সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে সক্ষম অন্যতম ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। ফরাসী বিপ্লবের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন তিনি, এই ধরনের আদর্শ নিয়েই সূচনা ঘটেছিল তার, কিন্তু রক্তপাত ও নিষ্ঠুরতার বুনো উৎসবে পরিণত হয়েছে শেষে। নিখাঁদ সেক্যুলারিস্ট আদর্শ নারী ও পুরুষের ভেতরের স্বর্গীয় ইমেজকে মাড়িয়ে যেতে পারে; একেই রাষ্ট্র পরম মূল্য দিলে তখন একজন শাসককে তাঁর দৃষ্টিতে জাতির উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টিকারী বলে মনে হওয়া সেইসব প্রজাদের বিনাশ করা থেকে বিরত রাখা যায় না। ‘যখন কেবল জাতীয়তাবাদই জনগণের মাঝে শেকড় গেড়ে বসে,’ সতর্ক করে বলেছেন তিনি, ‘তখন তা চেতনাকে উন্নত করার মতো তাদের চেতনাকে অবনমিত ও অমানবীয়করণও করতে পারে।’৫৯
অবশ্যই অতিপ্রাকৃত কিছুর শরণাপন্ন না হয়েও প্রতিটি মানুষের মাঝে পবিত্র অলঙ্ঘনীয়তার বোধ জাগাতে মানুষকে সাহায্য করার জন্যে সেক্যুলারিস্ট ধারণাও ছিল। ধর্মও যেকোনও সেক্যুলার আদর্শের মতোই ভয়ানক খুনে হতে পারে। কিন্তু সময়োপযোগী সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন কুক, কেননা গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত বিংশ শতাব্দী একের পর এক গণহত্যার কর্মকাণ্ডে বৈশিষ্ট্যায়িত হয়েছে, জাতীয়তাবাদী, সেক্যুলার শাসকগণই করেছেন একাজ। কুক যায়নবাদেরও সমান নিপীড়নকারী পরিণত হওয়ার ও ইহুদিদের অবস্থা বিপজ্জনক রকম বহুঈশ্বরবাদী হয়ে ওঠার ভয় করেছেন। ইহুদিরা জানুক বা না জানুক, তারা অস্তিত্বগতভাবে ঐশীসত্তার সাথে সম্পর্কিত ছিল বলে ঈশ্বর অভিশপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি প্যালেস্তাইনে পৌঁছুনোর পর কুকের অন্যতম প্রথম দায়িত্ব ছিল করুণভাবে অল্প বয়সে পরলোকগত থিওদর হােেলর সম্মানে প্রশংসাবাক্য উচ্চারণ করা। প্যালেস্তাইনের অর্থডক্স সম্প্রদায়ের হিংস্রতার মুখে যায়নবাদকে সহজাতভাবে অশুভ মনে করেছেন তিনি, হার্যেলকে জনপ্রিয় ইহুদি পরলোকতত্ত্বে ইহুদিদের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মেসিয়ানিক যুগের শুরুর দিকে আবির্ভূত হবেন বলে প্রত্যাশিত একজন অভিশপ্ত ত্রাণকর্তা জোসেফের বংশের মেসায়াহ হিসাবে তুলে ধরেন কুক, যিনি জেরুজালেমের তোরণে মারা যাবেন। তবে তাঁর প্রচারণা ডেভিডের বংশের প্রকৃত ত্রাণকর্তার আগমনের পথ পরিষ্কার করবে, যিনি নিস্তার নিয়ে আসবেন। হার্যেলকে এভাবেই দেখেছেন কুক। তাঁর বহু সাফল্য ছিল গঠনমূলক, কিন্তু নিজের আদর্শ থেকে ধর্মকে মুছে ফেলার চেষ্টার কারণে তাঁর কাজ এপর্যন্ত ক্ষতিকর ছিল। জোসেফীয় মেসায়াহর প্রয়াসের মতো নিশ্চিত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার মতো ছিল এটা। কুক এও যুক্তি দেখিয়েছেন যে যায়নবাদের বিরোধী অর্থডক্সরা সমানভাবে ধ্বংসাত্মক; নিজেদের ‘বস্তুগত পরিবর্তনের শত্রু’-তে পরিণত করে ইহুদি জাতিকে দুর্বল করে দিয়েছে তারা। ধার্মিক ও সেক্যুলারিস্ট ইহুদিদের পরস্পরের প্রয়োজন ছিল; একটি বাদে অন্যটি টিকতে পারত না।
এটা প্রাচীন রক্ষণশীল দর্শনকে নতুন করে তুলে ধরেছে। প্রাক আধুনিক বিশ্বে ধর্ম ও যুক্তি ভিন্ন কিন্তু সম্পূরক বলয় অধিকার করেছিল। দুটোই প্রয়োজনীয় ছিল এবং একটিকে ছাড়া অন্যটি হীন হয়ে পড়ত। কুক কাব্বালিস্ট ছিলেন, এক রক্ষণশীল কালের পুরাণ ও অতীন্দ্রিয়াবাদে অনুপ্রাণিত ছিলেন তিনি। কিন্তু আমাদের আলোচিত অন্য কয়েকজন সংস্কারকের মতো তিনি এই বিশ্বাসে আধুনিক ছিলেন যে পরিবর্তনই এখন জীবনের বিধি, যত বেদনাদায়কই হোক না কেন কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতাসমূহকে এখন ছুঁড়ে ফেলতেই হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, তরুণ যায়নবাদী বসতি স্থাপনকারীরা ইহুদিদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে-শেষ পর্যন্ত-নিষ্কৃতি নিয়ে আসবে। তাদের নিষ্ঠুর রকম বাস্তবভিত্তিক আদর্শ ছিল লোগাস; এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে ও কার্যকরভাবে কাজ করার জন্যে মানুষের যা প্রয়োজন। কিন্তু একে সৃজনশীলভাবে ইহুদিবাদের মিথোসের সাথে সম্পর্কিত করা না গেলে তা অর্থ খোয়াবে, জীবনের উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হবে ও ক্রমে হারিয়ে যাবে।
