*
ইহুদি বিশ্বেও উনবিংশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠা অতিরিক্ত যৌক্তিক ধরনের ধর্মবিশ্বাস থেকে লোকের পিছিয়ে আসার লক্ষণ ফুটে উঠতে শুরু করেছিল। জার্মানিতে হারমান কোন (১৮৪২-১৯১৮) ও ফ্রান্য রোজেনভিগের (১৮৮৬-১৯২৯) মতো দার্শনিকগণ আলোকনের মূল্যবোধসমূহকে টিকিয়ে রাখার প্রয়াস পেয়েছেন, যদিও রোজেনভিগ আধুনিক মানুষের উপলব্ধি করার উপযোগি করে প্রাচীন মিথলজি ও আচার আচরণগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। সব সময় যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নাও হতে পারে তোরাহর এমন বিভিন্ন নির্দেশনাকে নিজেদের অতীতে ঐশী সত্তার দিকে ইঙ্গিতকারী প্রতীক হিসাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। আচার এক অন্তস্থঃ প্রবণতা সৃষ্টি করেছে ইহুদিদের যা পবিত্রতার সম্ভাবনার উন্মেষ ঘটাতে সাহায্য করেছে, তাদের শোনার ও অপেক্ষা করার প্রবণতার চর্চায় সাহায্য করেছে। সৃষ্টি ও প্রত্যাদেশের বাইবেলিয় কাহিনীগুলো বাস্তব নয়, বরং আমাদের অন্তস্থঃ জীবনের আধ্যাত্মিক বাস্তবতার প্রকাশ। মার্টিন বুবের (১৮৭৮-১৯৬৫) ও গারশোম শোলেমের (১৮৯৭-১৯৮২) মতো পণ্ডিতগণ যুক্তিবাদী ইতিহাসবিদগণ যে ধরনের ধর্মবিশ্বাসকে নাকচ করে দিয়েছিলেন সেগুলোর দিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। বুবের হাসিদবাদের সমৃদ্ধি তুলে ধরেছেন আর কাব্বালাহর জগৎ আবিষ্কার করেছেন শোলেম। তবে ভিন্ন জগতের বিষয় প্রাচীন এই আধ্যাত্মিকতাগুলো যৌক্তিক চেতনায় অনুপ্রাণিত ইহুদিদের পক্ষে ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
যায়নবাদীরা প্রায়শঃ এমনভাবে তাদের স্পর্ধিত সেক্যুলারিস্ট আদর্শকে উপলব্ধি করেছে যাকে এক সময় ধর্মীয় বলে অভিহিত করা হয়েছিল। বিনাশী হতাশাকে এড়াতে মানুষকে কোনওভাবে আধ্যাত্মিক শূন্যতাকে পূরণ করতে হয়েছে। প্রথাগত ধর্ম কাজ না করলে তারা জীবনকে এক দুজ্ঞেয় অর্থে ভরে তুলবে এমন একটা সেক্যুলারিস্ট আধ্যাত্মিকতা সৃষ্টি করবে। অন্যান্য আধুনিক আন্দোলনের মতো যায়নবাদ ইহুদি হওয়ার এক নতুন উপায় তুলে ধরা একক, মৌল মূল্যবোধে প্রত্যাবর্তন ছিল। স্বদেশভূমিতে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে ইহুদিরা নিজেদের কেবল কারও কারও কাছে মনে হওয়া অত্যাসন্ন অ্যান্টি-সেমিটিক বিপর্যয়ের হাত থেকেই রক্ষা করবে না, বরং ঈশ্বর, তোরাহ বা কাব্বালাহ ছাড়াই এক মনস্তাত্ত্বিক নিরাময় আবিষ্কার করবে। যায়নবাদী লেখক আশার গিন্সবার্গ (১৮৫৬-১৯২৭), আহাদ হা-আম (‘জনগণের একজন’) ছদ্মনামে লেখালেখি করতেন, তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ইহুদিদের জগৎ পর্যবেক্ষণ করার আরও যৌক্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু একজন প্রকৃত আধুনিকের মতো তিনি ইহুদিবাদের ন্যূনতম সত্তায় ফিরে যেতে চেয়েছেন, যা ইহুদিরা কেবল তাদের শেকড়ে ফিরে গিয়ে প্যালেস্তাইনে আবাস শুরু করলেই পাওয়া যাবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম ইহুদিবাদের বাহ্যিক আবরণ মাত্র। পবিত্র ভূমিতে ইহুদিদের গড়ে তোলা নতুন চেতনাই এককালে ঈশ্বর ওদের জন্যে যা করেছিলেন সেটা করবে। এটা পরিণত হবে ‘জীবনের সকল পর্যায়ের এক দিক দর্শন,’ ‘হৃদয়ের অন্তস্থলে,’ পৌঁছে যাবে ও ‘অনুভূতির সাথে যোগসূত্র স্থাপন’ করবে। এভাবে যায়নে প্রত্যাবর্তন এককালের কাব্বালিস্টের সেই অন্তস্থঃ যাত্রার মতো হয়ে দাঁড়াবে: একাত্মতা অর্জনের লক্ষ্যে মনের গভীরে অবতরণ।
ধর্মকে প্রায়শঃই ঘৃণাকারী যায়নবাদীরা তাদের আন্দোলন সম্পর্কে সহজাত প্রবৃত্তির বশেই অর্থডক্স পরিভাষায় কথা বলত। ‘অভিবাসন’ বোঝাতে তাদের ব্যবহৃত হিব্রু শব্দ আলিয়াহ আদিতে সত্তার উচ্চতর পর্যায়ে আরোহণকে বোঝাতে ব্যবহার করা হত। অভিবাসীদের তারা বলত ওলিম (‘যারা উর্দ্ধারোহণ করেছে,’ বা ‘তীর্থযাত্রী’)। নতুন কৃষি বসতিতে যোগদানকারী কাউকে বলা হত চালু – নিষ্কৃতি, মুক্তি ও উদ্ধার লাভ বোঝানো জোরাল ধর্মীয় দ্যেতনা বিশিষ্ট শব্দ।৫৪ জাফা বন্দরে পৌঁছানোর পর যায়নবাদীরা প্রায়শঃই জমিনে চুমু খেত; অভিবাসনকে তারা নবজন্ম বিবেচনা করত, অনেক সময় বাইবেলিয় গোত্রপিতাদের মতো ক্ষমতায়নের বোধ প্রকাশ করতে নামও পাল্টে ফেলত।
লেবর যায়নিজমের আধ্যাত্মিকতা আহারন ডেভিড গর্ডনের (১৮৫৬-১৯২২) হাতে সবচেয়ে বাঙ্ময় ও জোরালভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯০৪ সালে তিনি প্যালেস্তাইনে পৌছানোর পর গালিলির দেগানিয়ার এক নতুন সমবায় বসতিতে কাজ করেন। এখানে এমন অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন ধার্মিক ইহুদিরা যাকে বলবে শেখিনাহর অভিজ্ঞতা। অর্থডক্স ইহুদি ও কাব্বালিস্ট হলেও কান্ট, শোপেনহাওয়ার, নিৎশে, মার্ক্স ও তলস্তয়ের ছাত্র ছিলেন গর্ডন। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, আধুনিক শিল্পায়িত সমাজ নারী-পুরুষকে তাদের নিজেদের কাছ থেকেই নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছে। জীবন সম্পর্কে একপেশে ও অতিযৌক্তিক উপলব্ধি গড়ে তুলেছে তারা। একে ভারসাম্য দিতে তাদের অবশ্যই নিজেদের যতখানি সম্ভব প্ৰকৃতিক ল্যান্ডস্কেপের জীবনে সংশ্লিষ্ট করার মাধ্যমে চাভায়াহর পবিত্রের খুব কাছের অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা-চর্চা করতে হবে, কারণ এখানেই নিজেকে মানুষের কাছে প্রকাশ করেন অন্তহীন। ইহুদিদের ক্ষেত্রে এই ল্যান্ডস্কেপকে অবশ্যই প্যালেস্তাইন হতে হবে। ‘ইহুদির আত্মা,’ জোর দিয়ে বলেছেন গর্ডন, ‘ইসরায়েল দেশের স্বাভাবিক পরিবেশের সন্তান।’ কেবল সেখানেই একজন ইহুদি, কাব্বালিস্টরা যাকে ‘স্পষ্টতা, অন্তহীনভাবে পরিষ্কার আকাশ, স্পষ্ট দৃষ্টিকোণ, বিশুদ্ধতার কুয়াশা বলেছে, তার সন্ধান পেতে পারে। শ্রমের (আভোদাহ) মাধ্যমে একজন অগ্রগামী ‘অজ্ঞাত ঐশীসত্তাকে’ চিনতে পারবে ও অতীন্দ্রিয়বাদীরা যেভাবে আধ্যাত্মিক অনুশীলনে নিজেদের নতুন করে নির্মাণ করেছিলেন সেভাবে গড়ে তুলতে পারবে। জমিনে কাজ করে, ‘অপ্রাকৃতিক, ত্রুটিপূর্ণ, বিচ্ছিন্ন মানুষ’ ডায়াসপোরাতে তার যা পরিণতি হয়েছে, তা থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘প্রাকৃতিক, সম্পূর্ণ মানব সত্তায় পরিণত হবে, যে নিজের কাছে অনুগত।’৬ গর্ডনের কাছে মন্দিরের লিটার্জিতে ‘শ্রম’ বা ‘সেবার’র জন্যে আভোদাহ শব্দ ব্যবহৃত হওয়াটা বিস্ময়ের ছিল না। যায়নাবাদীদের পক্ষে পবিত্রতা ও সামগ্রিকতা আর প্রথাগত ধর্মীয় আচারে পাওয়ার বিষয় ছিল না, বরং গালিলিতে পাহাড় ও খামারে কঠোর পরিশ্রমেই মিলছিল।
