পেন্টাকোস্টালিস্টবাদের এক আলোকসঞ্চারী গবেষণায় আমেরিকান পণ্ডিত হার্ভে কক্স যেমন যুক্তি দেখিয়েছেন, এই আন্দোলনটি ছিল আধুনিক পাশ্চাত্যের প্রত্যাখ্যান করা বহু অভিজ্ঞতা পুনরুদ্ধারের একটা প্রয়াস।” একে যুক্তির আধুনিক কাল্টের বিরুদ্ধে তৃণমূল পর্যায়ের বিদ্রোহ হিসাবে দেখা যেতে পারে। পেন্টাকোস্টালিজম এমন এক সময়ে শেকড় বিস্তার করেছিল যখন লোকে বিজ্ঞান সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে উঠতে শুরু করেছে, যখন ধার্মিক লোকজন কেবল যুক্তির উপর নির্ভরশীলতা ঐতিহ্যগতভাবে অধিকতর স্বজ্ঞামূলক, কল্পনানির্ভর ও নন্দনতাত্ত্বিক মানসিক অনুশীলনের উপর নির্ভরশীল ধর্মবিশ্বাসের উপর উদ্বেগ সৃষ্টিকারী তাৎপর্য থাকার ব্যাপারে অস্বস্তির সাথে সজাগ হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। মৌলবাদীরা যেখানে বাইবেল ভিত্তিক ধর্মকে সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ করার প্রয়াস পাচ্ছিল, পেন্টাকোস্টালিস্ট সেখানে ধার্মিকতার মূলে ফিরে যাচ্ছিল, কক্স যাকে ‘মনের সেই ব্যাপক অপ্রক্রিয়জাতকৃত নিউক্লিয়াস’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, ‘যেখানে উদ্দেশ্যের বোধ ও তাৎপর্যের জন্যে অন্তহীন সংগ্রাম চলতে থাকে।৪৯ মৌলবাদীরা যেখানে যৌক্তিকভাবে প্রমাণিত ডগমার সাথে ধর্মবিশ্বাসকে মিলিয়ে ফেলে ধর্মীয় অনুভূতিকে মনের একেবারে বাইরের বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়ে সীমিত করে ফেলছিল, পেন্টাকোস্টালিস্টরা সেখানে পুরাণ ও ধার্মিকতার অবচেতন উৎসে ফিরে যাচ্ছিল। মৌলবাদীরা যেখানে বাণী ও আক্ষরিক অর্থের উপর জোর দিয়েছে সেখানে পেন্টাকোস্টালিস্টরা প্রথাগত ভাষা এড়িয়ে গিয়ে কোনও ঐতিহ্যের ক্রেডাল ভিত্তির অতীতে অবস্থিত আদিম আধ্যাত্মিকতায় প্রবেশের প্রয়াস পেয়েছে। আধুনিক রীতি যেখানে নারী-পুরুষকে বাস্তবভিত্তিকভাবে কেবল এই জগতের প্রতিই জোর দিতে বলে, পেন্টাকোস্টালিস্টরা সেখানে মানুষের তুরীয় আনন্দ ও দুয়ে অনুভূতি লাভের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেছে। বিশ্বাসের এমনি ধূমকেতুসুলভ বিস্ফোরণ দেখায় যে, সবাই আধুনিকতার বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদে মোহিত হয়নি। আধুনিকতার বহু মূল বিষয় থেকে এমনি সহজাত পশ্চাদপসরণ বহু লোকের পাশ্চাত্যের সাহসী নতুন বিশ্বে একটা কিছু হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি বোধ করার বিষয়টি তুলে ধরে।
আমাদের এই কাহিনীতে আমরা প্রায়শঃই লক্ষ করব যে, আধুনিকতার প্রধান সুবিধাভোগী নয় এমন মানুষের ধর্মীয় আচরণ অনেক সময়ই সেক্যুলারিস্ট সমাজে বর্জন বা প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া আধ্যাত্মিকতার জোরাল চাহিদা তুলে ধরে। আমেরিকান সমালোচক সুজান সন্টাগ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের সভ্যতায় যখনই ‘চিন্তাভাবনা একটা বিশেষ কষ্টকর জটিলতা ও আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্যের’ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখনই ‘ভাষার সাথে স্থায়ী অসন্তোষ সৃষ্টির’ কথা উল্লেখ করেছেন। এমন অবস্থায় লোকে মানবীয় ভাষার ক্ষমতা নিয়ে অতীন্দ্রিয়বাদীর অধৈর্যের অংশীদার হয়ে যায়। সকল ধর্মবিশ্বাসের অতীন্দ্রিয়বাদীরা জোরের সাথে বলেছে যে, চূড়ান্ত সত্তা শেষ পর্যন্ত অনির্বচনীয় ও প্রকাশের অতীত। কেউ কেউ মানুষ পবিত্র ও দুয়ের উপস্থিতিতে থাকার সময় ভাষা ও তার প্রকাশিত যৌক্তিক ধারণা যখন কোনও কাজে আসে না, তখন শিক্ষাব্রতীকে অনুভূতি গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পেন্টাকোস্টলিস্টদের নানা ভাষায় কথা বলার অনুরূপ তুরীয় আনন্দসুলভ উচ্চারণের উপায় গড়ে তুলেছে: উদাহরণ স্বরূপ, তিব্বতের সাধুরা দ্বৈত গম্ভীর আওয়াজ তোলেন, হিন্দু গুরুরা নাকি সুর তোলেন।৫১ আসা স্ট্রিটের পেন্টাকোস্টালিস্টরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে এমন একটা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছিল যার সাহায্যে বিভিন্ন ঐতিহ্য ঐশীসত্তাকে মানবীয় ভাবনা প্রক্রিয়ার অধীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষার প্রয়াস পেয়েছে। মৌলবাদীরা অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু তারপরেও পেন্টাকোস্টালিস্ট ও মৌলবাদীরা তাদের স্ব স্ব কায়দায় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বছরগুলোর বাস্তবতা অনুযায়ী এক নজীর বিহীন জটিলতায় পৌঁছে যাওয়া পাশ্চাত্য ডিসকোর্সের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল। স্কোপস ট্রায়ালে সাধারণ মানুষের ‘কাণ্ডজ্ঞানের’ পক্ষে লড়াই করেছিলেন ব্রায়ান, চেষ্টা করেছেন বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিতদের স্বেচ্চারিতার বিরুদ্ধে আঘাত হানার। পেন্টাকোস্টালিস্টরা যুক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছিল, কিন্তু মৌলবাদীদের মতোই স্বল্প শিক্ষিত মানুষের কথা বলার ও তাদের বক্তব্য শোনার অধিকারের উপর জোর দিচ্ছিল।
বৰ্জনবাদী ও নিন্দাবাদী ধার্মিকতার ধার্মিকতার প্রতি বিশ্বস্ত মৌলবাদীরা পেন্টাকোস্টালিস্টদের দারুণ ঘৃণা করেছে। ওয়ারফিল্ড যুক্তি দেখিয়েছেন যে, অলৌকিক ঘটনার দিন শেষ হয়ে গেছে; ঈশ্বর নিয়মিত ভিত্তিতে প্রকৃতির নিয়ম কানুন পাল্টে দেন এমন বিশ্বাসের ক্ষেত্রে পেন্টাকোস্টালিস্টরা রোমান ক্যাথলিকদের চেয়েও খারাপ। পেন্টাকোস্টালিস্টদের যুক্তিহীনতা মৌলবাদীদের কাছে বৈরী প্রতীয়মান বিশ্বে টিকে থাকা নিশ্চিত করার জন্যে বিশ্বাসের উপর আরোপের করার প্রয়াস চালানো বৈজ্ঞানিক ও মৌখিক নিয়ন্ত্রণের প্রতি আক্রমণ ছিল। অন্য মৌলাবাদীরা পেন্টাকোস্টালিস্টদের বিরুদ্ধে কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার অভিযোগ এনেছে; একজন তো এমনকি আন্দোলনকে শয়তানের শেষ বমি’ পর্যন্ত বলেছেন।৫২ কটুকাটব্য ও চূড়ান্ত বিচারের বৈশিষ্ট্য ছিল নতুন প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুণ। স্কোপস ট্রায়ালের পর গস্পেলের চেতনা থেকে বহুদূরের নিন্দাবাদের এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু মতানৈক্য সত্ত্বেও মৌলবাদী ও পেন্টাকোস্টালিস্টরা আধুনিক পাশ্চাত্য বিশ্বে আধুনিকতার বিজয়ের ফলে রয়ে যাওয়া শূন্যতা পূরণের প্রয়াস পাচ্ছিল। ভালোবাসার প্রতি গুরুত্ব আরোপ ও মতবাদের প্রতি সতর্কতা অবলম্বন করে পেন্টাকোস্টালিস্টরা এমনি প্রাথমিক কালে মধ্যবিত্ত উদারপন্থী প্রটেস্ট্যান্টদের অনেক কাছাকাছি ছিল, যদিও শতাব্দীর শেষের দিকে, আমরা যেমন দেখব, কেউ কেউ আরও চরম কট্টরপন্থী মৌলবাদী শিবিরে সরে গিয়ে দানের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বিস্মৃত হবে।
