মৌলবাদীরা যখন আধুনিক ধর্ম বিশ্বাস গড়ে তুলছিল, ঠিক সেই সময় পেন্টাকোস্টালিস্টরা আলোকনের যৌক্তিক আধুনিকতাকে তৃণমূল পর্যায়ে প্রত্যাখান তুলে ধরা ‘উত্তর আধুনিক’ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলছিল। মৌলবাদীরা যেখানে তাদের দৃষ্টিতে ক্রিশ্চান ধর্মের মতবাদগত ভিত্তিতে ফিরে যাচ্ছিল, পেন্টাকোস্টালিস্টরা সেখানে, যাদের ডগমায় কোনও আগ্রহ ছিল না, আরও বেশি মৌল স্তরে প্রত্যাবর্তন করিছিল: ধর্মবিশ্বাসের ক্রিডাল ফর্মুলেশনের নিচে অবস্থিত খাঁটি ধার্মিকতার কেন্দ্রে ফিরে যাচ্ছিল। মৌলবাদীরা যেখানে ঐশীগ্রন্থের লিখিত বাণীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, পেন্টাকোস্টালিস্টরা ভাষাকে এড়িয়ে গিয়েছে-অতীন্দ্রিয়বাদীরা সব সময়ই যেমন জোর দিয়েছে যে, ভাষা ধারণা ও যুক্তির অতীতে অবস্থানকারী বাস্তবতাকে প্রকাশ করতে পারে না। তাদের ধর্মীয় ডিসকোর্স মৌলবাদীদের লোগোস ছিল না, সেটা ছিল বাণীর অতীত। পেন্টাকোস্টালিস্টরা ‘বিভিন্ন ভাষায়’ কথা বলত, তাদের বিশ্বাস ছিল পবিত্র আত্মা পেন্টাকোস্টের ইহুদি ভোজ সভায় অ্যাপসলদের উপর যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ঠিক সেভাবেই তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছেন। যখন ঐশী উপস্থিতি স্বয়ং আগুনের জিহ্বায় নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন আর অ্যাপসলদের অদ্ভুত ভাষায় কথা বলতে সক্ষম করে তুলেছিলেন। ৩৯
পেন্টাকোস্টালিস্টদের প্রথম দলটি ৯ই এপ্রিল ১৯০৬ তারিখে লস অ্যাঞ্জেলিসের এক ছোট বাড়িতে আত্মার অভিজ্ঞতা লাভ করে। দলের নেতা ছিলেন উইলিয়াম জোসেফ সিমুর (১৮৭০-১৯১৫), দীর্ঘদিন ধরে অধিকতর আনুষ্ঠানিক শ্বেতাঙ্গ প্রটেস্ট্যান্ট গোষ্ঠীতে যতটা সম্ভব তার চেয়ে আন্তরিক ও নির্বোধ ধরনের ধর্মের সন্ধানকারী গৃহযুদ্ধের পর মুক্তিলাভকারী দাসদের সন্তান। ১৯০০ সাল নাগাদ হলিনেস আধ্যাত্মিকতায় দীক্ষা নিয়েছিলেন তিনি, এর বিশ্বাস ছিল পয়গম্বর জোয়েলের ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক আদিম চার্চের উপভোগ করা নিরাময়, পরমানন্দ, ভাষা আর ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষমতা অন্তিম কালের অব্যবহিত আগে ঈশ্বরের জাতির উপর পুনঃস্থাপিত হবে। সিমুর ও তাঁর বন্ধুরা আত্মার অভিজ্ঞতা লাভ করলে দাবানলের মতো সেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকান আমেরিকান ও শ্বেতাঙ্গ অবহেলিতরা দলে দলে এত বিপুল সংখ্যায় পরের সভায় এসে হাজির হতে শুরু করেছিল যে আয়ুসা স্ট্রিটের একটা পুরোনো গুদাম ঘরে সরে যেতে হয়েছিল তাদের। চার বছরের ভেতর সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিন শো পেন্টাকোস্টাল গ্রুপ গড়ে ওঠে, পঞ্চাশটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন ৪১ প্রথম পেন্টাকোস্টাল জোয়ার ছিল আধুনিক কালের বিভিন্ন সময়ে বিস্ফোরিত আরও একটি জনপ্রিয় মহাজাগরণ, যখন লোকে অন্তস্তল থেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে পরিবর্তন একেবারেই হাতের নাগালে। সিমুর ও প্রথম পেন্টাকোস্টালিস্টদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে ছিল যে শেষের দিনগুলো শুরু হয়ে গেছে, শিগগিরই আরও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের জন্যে জেসাস আবির্ভূত হবেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন মনে হলো যতটা দ্রুত মনে হয়েছিল জেসাস তত তাড়াতাড়ি ফিরছেন না, পেন্টাকোস্টালিস্টরা তখন ভিন্ন ভাষায় কথা বলার ক্ষমতাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে। একে এবার ঈশ্বরের সাথে কথা বলার এক নতুন কায়দা মনে করতে থাকে। সেইন্ট পল ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, ক্রিশ্চানরা যখন প্রার্থনা করা কষ্টকর আবিষ্কার করে, ‘তখন স্বয়ং আত্মা আমাদের সাথে সকল উচ্চারণের অতীত গোঙানির ভেতর দিয়ে মধ্যস্ততা করে।৪২ ভাষার অতীতে অবস্থানকারী এক ঈশ্বরের দিকে হাত বাড়াচ্ছিল তারা।
এই প্রাথমিক বছরগুলোয় সত্যিই এইসব পেন্টাকোস্টালিস্ট ধর্মসভায় এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে হয়েছে। অর্থনেতিক নিরাপত্তাহীনতা ও বর্ধিত বিদেশীদের নিয়ে আতঙ্কের একটা কালে কালো ও শাদারা একসাথে প্রার্থনা করেছে ও পরস্পরকে আলিঙ্গন করেছে। সিমুর বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, ভিন্ন ভাষায় কথার বলার ক্ষমতার চেয়ে বরং জাতিগত এই সংহতিই শেষ জমানার সূচনার চূড়ান্ত লক্ষণ।৪৩ প্রশান্ত ব্যাপার ছিল না এটা। এখানে পুনর্জাগরণবাদী ও উপদলের অস্তিত্ব ছিল, কোনও কোনও শাদা পেন্টাকোস্টালিস্ট তাদের নিজস্ব ভিন্ন চার্চ গঠন করেছিল।88 কিন্তু সম্পূর্ণ সাধারণ মানুষের ভেতর অসাধারণ দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়া পেন্টাকোস্টালিস্ট আন্দোলন স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্রোহকে প্রতিফলিত করেছে। পেন্টাকোস্টালিস্ট সভায় নারী-পুরুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলত, ঘোরে চলে যেত, পরমানন্দমূলক তুরীয় অবস্থায় যেত, দেখা যেত তারা শূন্যে ভাসছে, এবং তাদের মনে হত অনির্বচনীয় আনন্দে তাদের শরীর হাসছে। বাতাসে উজ্জ্বল আলোকময় চিহ্ন দেখতে পেত লোকে, যেন প্রতাপের চাপে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে বলে মনে হত।৫ এমনি বুনো তুরীয় আনন্দ সহজাতভাবে বিপজ্জনক ছিল। কিন্তু গোড়ার দিকের এই সময়ে লোকে অন্তত মহাজাগরণের সময়ের মতো হতাশা ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়নি। আফ্রিকান-আমেরিকানরা পরমানন্দমূলক আধ্যাত্মিকতায় ঢের বেশি দক্ষ ছিল। যদিও পরে আমরা যেমন দেখব, কিছু শাদা পেন্টাকোস্টালিস্ট মনের অস্বাস্থ্যকর ও বিনাশী অবস্থায় পতিত হবে। শিশু অবস্থায় আন্দোলন ভালোবাসা ও সহানুভূতির মনোভাবের উপর গুরুত্ব দিয়েছে, যা একে নিজস্ব শৃঙ্খলা যুগিয়েছে। সিমুর সাধারণত বলতেন: ‘ক্রুদ্ধ হলে বা বাজে কথা বললে বা পরনিন্দা করলে, তুমি কতগুলো ভাষায় কথা বলতে পারছ আমি তার পরোয়া করি না, আসলে পবিত্ৰ আত্মায় দীক্ষিত হওনি তুমি।’৪৬ ‘সকল দরিদ্র ও অস্পৃশ্যকে এক করে আমাদের সবাইকে ভালোবাসতে শেখাতে ঈশ্বর এই বিলম্বিত বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন, ১৯১০ সালে ব্যাখ্যা করেছেন পেন্টাকোস্টালিজমের গোড়ার দিকের ভাষ্যকার ডি.ডব্লু. মাইল্যান্ড। ‘ঈশ্বর ঘৃণিত বস্তু, ইতর বস্তু গ্রহণ করে নিজেকে তাতে মহান করে তুলছেন।’৪৭ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহানুভুতিশীল ভালোবাসার উপর গুরুত্ব আরোপ মৌলবাদী ক্রিশ্চান ধর্মের সাথে লক্ষণীয় পার্থক্য তুলে ধরে। যেকোনও ধার্মিকতার চূড়ান্ত পরীক্ষা যদি বদান্যতাই হয়ে থাকে, এই পর্যায়ে পেন্টাকোস্টালিস্টরা সামনে এগিয়ে ছিল।
