স্কোপস দোষী সব্যস্ত হন, কিন্তু এসিএলইউ তাঁর পক্ষে জরিমানা পরিশোধ করে, ডেটনে ডাররো ও আধুনিক বিজ্ঞান ছিল সন্দোহতীতভাবে বিজয়ী। পত্রপত্রিকাগুলো সানন্দে ব্রায়ান ও তাঁর সমর্থকদের হতাশাব্যঞ্জক পশ্চাদপন্থী হিসাবে চিত্রিত করে। বিশেষ করে সাংবাদিক এইচ. এল. মেনককেন মৌলবাদীদের জাতির জঞ্জাল হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জোরের সাথে বলেন যে, মুখ ব্যাদান করে থাকা আপল্যান্ড উপত্যকার আদিম মানুষসহ গ্রামের লোকজনকে যেহেতু ভালোবাসতেন, তাই ব্রায়ানের এক ‘এক-ঘোড়া টেনিসি গ্রামে’ মারা যাওয়াটাই ভালো হয়েছে।’ সর্বত্রই আছে মৌলবাদীরা।
তারা গ্যাস কারখানার নোংরা পথের মতোই পুরু। সব জায়গাতেই আছে তারা মরণশীল মনের পক্ষে ভার বহন করা খুবই কঠিন শিক্ষা, এমনকি ছোট স্কুলহাউসের ছাদের আবছা, করুণ শিক্ষাও। ৩৫
মৌলবাদীরা অতীতের অধিবাসী; বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার শত্রু ছিল তারা, আধুনিক বিশ্বে অংশ নেওয়ার অযোগ্য। দ্য ওয়ার অন মডার্ন সায়েন্স (১৯২৭)-এ মেয়নার্ড শিপলি যেমন যুক্তি দেখিয়েছেন যে, মৌলবাদীরা গোষ্ঠীতে ক্ষমতা অধিকার করতে পারলে এবং আইন করে মানুষের উপর তাদের বিধিবিধান চাপিয়ে দিলে আমেরিকানরা তাদের সংস্কৃতির সেরা অংশ খোয়াবে, আবার ফিরে যাবে অন্ধকার যুগে। সংস্কৃতি সব সময়ই প্রতিযোগিতার বিষয়, বিভিন্ন গোষ্ঠী যার যার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। মৌলবাদীদের উপর ভর্ৎসনা চাপিয়ে দিয়ে ডেটনে সেকুলারিস্টরা যুদ্ধে জয়লাভ করেছে, প্রমাণ করেছে তাদের গুরুত্বের সাথে নেওয়ার প্রয়োজন নেই বা উচিত হবে না। স্কোপস ট্রায়ালের পর মৌলবাদীরা নীরব ছিল, উদারপন্থীরা গোষ্ঠীতে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়েছিল, এক ধরনের আঁতাত হয়েছিল বলে মনে হয়। উইলিয়াম বেল রাইলি ও তাঁর অনুসারীরা লড়াই তুলে রেখেছিলেন বলে মনে হচ্ছিল; দশকের শেষ নাগাদ রাইলি উদারপন্থী হ্যারি ফসডিকের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হন।
তবে মৌলবাদীরা আসলে পুরোপুরি বিদায় হয়নি। প্রকৃতপক্ষে বিচারের পর আরও চরম হয়ে উঠেছিল তারা। নিজেদের তিতিবিরক্ত মনে করে মূলধারার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ লালন করছিল। ডেটনে তারা-বিশ্রীভাবে-ধর্ম প্রাচীন প্রাসঙ্গিকতাহীন বিষয় ও কেবল বিজ্ঞানই গুরুত্বপূর্ণ, রেডিক্যাল সেক্যুলারিস্টদের এমনি চরম দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লড়ার প্রয়াস পেয়েছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেনি তারা, কাজটা করার জন্যে ভুল প্ল্যাটফর্ম বেছে নিয়েছিল। ব্রায়ানের জার্মান-বিরোধী ভীতি ছিল ভ্ৰান্তিপূর্ণ, ডারউইনকে দানোবে পরিণত করাও ভুল ছিল। কিন্তু ধর্মের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ঔচিত্যবোধসমূহ মানুষের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাকে বল্গাহীন যুক্তিবাদের স্বার্থে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে অবিবেচকের মতো ছুঁড়ে ফেলা উচিত হবে না। বিজ্ঞান ও নীতির সম্পর্কের বিষয়টি সব সময়ই জ্বলন্ত উদ্বেগের বিষয় হয়েছিল। কিন্তু মৌলবাদীরা ডেটনে মামলায় হেরে গিয়েছিল, অসন্তোষের সাথে আচরণ করে সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়েছিল তাদের। পঞ্চাশ বছর আগে নিউ লাইটসরা আমেরিকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল; স্কোপস ট্রায়ালের পর তারা পরিণত হয় বহিরাগতে। কিন্তু মেনককেনের মতো সেক্যুলার ক্রুসেডারদের পরিহাস ছিল উল্টো ফলদায়ী। মৌলবাদী ধর্মবিশ্বাস গভীর ভীতি ও উদ্বেগে প্রোথিত যা কেবল খাঁটি যৌক্তিক যুক্তি দিয়ে প্রশমিত হওয়ার নয়। ডেটনের পর আরও উগ্র হয়ে ওঠে তারা।৩৬ বিচারের আগে বিবর্তন তাদের কাছে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না, এমনকি চার্লস হজের মতো অক্ষরবাদীরা পর্যন্ত পৃথিবীর বয়স বাইবেলে যাই বলা হোক না কেন ছয় হাজার বছরের বেশি, এটা মেনে নিয়েছিলেন। নিউ ফান্ডামেন্টালিস্টরা জেনেসিসকে সম্পূর্ণভাবে বৈজ্ঞানিক দিক থেকে নির্ভুল আখ্যায়িতকারী তথাকথিত ‘সৃষ্টিবিজ্ঞান’ বিশ্বাস করত। কিন্তু ডেটনের পর মৌলবাদীরা আরও বেশি করে মানসিকভাবে নিজেদের রুদ্ধ করে ফেলে, সৃষ্টিবিজ্ঞানবাদ ও অটল বাইবেলিয় অক্ষরবাদ মৌলবাদী মানসিকতায় মূল বিষয়ে পরিণত হয়। তারা রাজনৈতিক বর্ণালীর আরও ডানে সরে যায়। যুদ্ধের আগে রাইলি ও জন আর. স্ট্র্যাটনের (১৮৭৫-১৯২৯) মতো মৌলবাদীরা সামাজিক সংস্কারের লক্ষ্যে বামপন্থীদের সাথে মিলে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন। এবার সোশ্যাল গস্পেল গোষ্ঠীতে তাদের পরাস্তকারী উদারবাদীদের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল। এটা আমাদের কাহিনীর একটা অব্যাহত থিম হয়ে থাকবে। মৌলবাদ আগ্রাসী উদারবাদ বা সেক্যুলারিজমের সাথে এক প্রতীকী সম্পর্কের ভেতর অবস্থান করে। আক্রান্ত হলে অনিবার্যভাবে আরও চরম, তিক্ত ও আগ্রাসী হয়ে ওঠে।
ডাররো ও মেন্ককেন মৌলবাদীদের সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের অধিকবাসী ভেবে ভুল করেছিলেন। তাদের দিক থেকে মৌলবাদীরা আন্তরিক আধুনিকবাদী। ‘মৌলে’ ফিরে যাবার প্রয়াসে তারা বিংশ শতাব্দীর অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও বৈজ্ঞানিক ধারার সাথেই একাত্ম ছিল।৩৭ অন্য যেকোনও আধুনিকতাবাদীর মতোই বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদে আসক্ত ছিল, যদিও কান্টিয় না হয়ে বরং বেকনিয় ছিল তারা। ১৯২০ সালে এ.সি. ডিক্সন যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, তিনি ক্রিশ্চান ‘কারণ আমি চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, বৈজ্ঞানিক।’ ধর্ম বিশ্বাস অন্ধাকারে ঝাঁপ দেওয়া নয়, বরং ‘সঠিক পর্যবেক্ষণ ও সঠিক চিন্তার উপর’ নির্ভরশীল।৩৮ মতবাদসমূহ কেবল ধর্মতাত্ত্বিক আঁচঅনুমান নয়, বরং সত্যি। এটা সম্পূর্ণই আধুনিক ধর্মীয় বিকাশ ছিল, রক্ষণশীল কালের প্রাক আধুনিক আধ্যাত্মিকতা থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে। মৌলবাদীরা এমন এক কালে ধার্মিক হওয়ার উপায়ের সন্ধান করছিল যখন বিজ্ঞানের লোগোসকে সব কিছুর উপরে মূল্য দেওয়া হচ্ছিল। সময়ই বলে দেবে ধর্মীয়ভাবে এইসব প্রয়াস কতখানি সফল হবে, তবে ডেটন দেখিয়ে দিয়েছিল যে মৌলবাদ অপবিজ্ঞান, বিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক মাণদণ্ডের সাথে খাপ খাওয়ার উপযুক্ত নয়।
