ব্রায়ানের উপসংহার ছিল উপরিগত, আনাড়ী ও ভ্রান্ত, কিন্তু লোকে তাঁর কথা শুনতে প্রস্তুত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বিজ্ঞানের সাথে মধুচন্দ্রিমার কালের অবসান ঘটিয়েছিল, এর ভীতিকর সম্ভাবনা নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছিল, কোনও কোনও মহলে একে সীমানার ভেতর আটকে রাখারও চিন্তাভাবনা চলছিল। ডারউইনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কোনও কোনও বিজ্ঞানীর ‘কাণ্ডজ্ঞান’কে অগ্রাহ্য করার বিব্রতকর প্রবণতার একটা প্রধান নজীর ছিল। যারা সহজ সাধারণ ধর্মের সন্ধান করত, বিবর্তনবাদ প্রত্যাখ্যান করার জন্যে তাদের বোধগম্য বিশ্বাসযোগ্য কারণ আবিষ্কারে দারুণ আগ্রহী ছিল তারা। ব্রায়ান তাদের সেটা দিয়েছিলেন এবং একা হাতে বিবর্তনের প্রসঙ্গটিকে মৌলবাদী এজেন্ডার শীর্ষে তুলে দিয়েছেন। ডারউইনবাদ ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক সত্যির বিরোধিতা করে বলে এটা ছিল নতুন মৌলবাদী রীতির প্রতি আবেদন সৃষ্টি করা একটা কারণ। এর প্রভাব সম্পর্কে ব্রায়ানের বিকৃত ব্যাখ্যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রকাশিত নতুন ভীতিকে ধারণ করতে পেরেছিল। পঞ্চাশ বছর পরে চার্লস হজ যেমন যুক্তি দেখিয়েছেন, ডারউইনের প্রকল্প মৌলবাদীদের বেকনিয় মানসিকতার বিরোধী ছিল, তখনও তারা প্রাক আধুনিক কালের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আঁকড়ে ছিল। ইয়েল ও হার্ভার্ড ও অন্যান্য বড় বড় শহরের বুদ্ধিজীবী ও সফিস্টিকেটরা উৎসাহের সাথে এইসব নতুন ধারণা অনুসরণ করে থাকতে পারেন, কিন্তু বহু ছোট শহরের আমেরিকানদের কাছে এসব ছিল অজ্ঞাত, তারা ভেবেছিল সেক্যুলারিস্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের সংস্কৃতি গ্রাস করে নিচ্ছে। কিন্তু তারপরেও বিবর্তনের বিরুদ্ধে অভিযান হয়তো কোওনদিনই হাইয়ার ক্রিটিজিমকে প্রতিস্থাপিত করতে পারত না যদি না এযাবৎ মৌলবাদীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা দক্ষিণে এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটত।
দক্ষিণবাসীদের পক্ষে মৌলবাদী হয়ে ওঠার কোনও কারণই ছিল না। এই পর্যায়ে দক্ষিণের রাজ্যগুলো উত্তরের তুলনায় বেশ রক্ষণশীল ছিল, মৌলবাদী প্রচারণা শুরু করার পক্ষে দক্ষিণের গোষ্ঠীগুলোতে উদারপন্থীদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু পাবলিক স্কুলে বিবর্তবাদের শিক্ষা নিয়ে দক্ষিণবাসীরা উদ্বিগ্ন ছিল। এটা ছিল অজানা আদর্শের কাছে সমাজের ‘উপনিবেশীকরণের’ নজীর। ফ্লোরিডা, মিসিসিপি, লুইসিয়ানা ও আরকান-স’র রাজ্য সভায় ডারউইনের মতবাদের শিক্ষাদান নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে বিল উত্থাপন করা হয়েছিল। টেনিসির বিবর্তনবাদ বিরোধী আইন ছিল বিশেষভাবে কঠোর। তাদের পরীক্ষা করতে এবং বাক স্বাধীনতা ও প্রথম সংশোধনীর পক্ষে প্রতীকী আঘাত হানতে ছোট শহর ডেটনের এক তরুণ শিক্ষক জন স্কোপস একবার স্কুলের প্রিন্সিপালের বদলে জীববিজ্ঞান বিষয়ে ক্লাস নিতে গিয়ে আইন ভঙ্গ করার স্বীকারোক্তি দিয়ে বসেন। ১৯২৫ সালের জুলাই মাসে তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, নতুন আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) তাঁর পক্ষে মামলা লড়ার জন্যে একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়, এর নেতৃত্বে ছিলেন যুক্তিবাদী আইনবিদ ও
আইনবিদ ও প্রচারক ক্লারেন্স ডাররো (১৮৫৭-১৯৩৮)। রাইলি ও অন্যান্য মৌলবাদী নেতার অনুরোধে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান আইনের সমর্থন করতে সম্মত হন। ডাররো ও ব্রায়ান জড়িয়ে পড়ার পর মামলাটি স্রেফ নাগরিক স্বাধীনতার ব্যাপার রইল না, তা পরিণত হলো ঈশ্বর ও বিজ্ঞানের এক প্রতিযোগিতায়।
স্কোপস ট্রায়াল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত।১ ডাররো ও ব্রায়ান গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকান মূল্যবোধের পক্ষে লড়ছিলেন। ডাররো বাক স্বাধীনতার পক্ষে, অন্যদিকে ব্রায়ান সাধারণ মানুষের অধিকারের পক্ষে-যারা দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞ দক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের প্রভাবের বেলায় খারাপ চিন্তা লালন করে আসছিল। ব্রায়ানের রাজনৈতিক প্রচারণা সাধারণ মানুষের পক্ষে ছিল। ইন হিজ ইমেজ-এর সমালোচনায় ডারউনের প্রতি ব্রায়ান তাঁর জবাবে দাবি করেছিলেন যে তিনি ‘সংখ্যার দিক থেকে বিশেষ করে মূক এক বিশাল জনসংখ্যার মুখপাত্র। আসলে একমাত্র তিনিই তাদের ধ্যানধারণার প্রকাশকারী যাদের শোনার ক্ষমতা রয়েছে। তারা ব্যাপক রাজনীতির অংশ ও কোনওভাবেই উপেক্ষা বা “উন্মাদসম প্রান্তিক” লোকজনের পরিহাসের পাত্র হবার নয়।২ নিঃসন্দেহে কথাটা সঠিক ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এইসব অপরিণত ও অস্পষ্ট উদ্বেগকে ঠিকমতো ভাষা দিতে পারেননি ব্রায়ান। কিন্তু ডাররো বিজ্ঞানের নিজেকে প্রকাশ ও সামনে এগিয়ে যাবার অধিকারের পক্ষে দারুণভাবে যুক্তি তুলে ধরতে পেরেছিলেন। প্রেসবিটারিয়ান ও বেকনিয় ব্রায়ান জোরের সাথে বলেন যে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে অনৈতিক প্রভাবের কারণে ডারউইনবাদের মতো ‘অসমর্থিত প্রকল্প’ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার মানুষের রয়েছে। স্বয়ং স্কোপস যেখানে গোটা বিচারটিকেই একটা প্রহসন ধরে নিয়েছিলেন, ডাররো ও ব্রায়ান সেখানে প্রাণপণে তাদের চোখে পবিত্র অলঙ্ঘনীয় মূল্যবোধের পক্ষে লড়ে চলছিলেন। কিন্তু ডাররো ব্রায়ানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পর তাঁর নিষ্ঠুর জেরার মুখে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির নির্বোধ ও অতিসরল চেহারা বের হয়ে আসে। কোণঠাসা অবস্থায় ব্রায়ান ডাররোর কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে বাইবেলের আক্ষরিক পাঠে যেমন বোঝায় পৃথিবীর বয়স তার চেয়ে ছয় হাজার বছরের বেশি, জেনেসিসে বর্ণিত সৃষ্টির ‘ছয়’ দিনের প্রতিটি দিন চব্বিশ ঘণ্টার চেয়ে বেশি এবং তিনি কোনওদিনই বাইবেলের টেক্সটের সৃষ্টির বিররণ পড়েননি, অন্য কোনও ধর্মে তাঁর আগ্রহ নেই, এবং সবশেষে ‘আমি যেসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাই না সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে যাই না’ এবং ‘মাঝেমাঝে’ যেসব নিয়ে ভাবেন কেবল সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামান ৩৪ এটা ছিল চরম পরাজয়। স্পষ্ট যৌক্তিক ধ্যানধরণার নায়ক হিসাবে আদালত থেকে বের হয়ে আসেন ডাররো, আর প্রবীন ব্রায়ান বাকোয়াজ, অযোগ্য ও পশ্চাদপন্থী মানুষ হিসাবে অপদস্থ হন; বিচারের অল্প দিন বাদে তাঁর প্রয়াসের পরিণতিতে মারা যান তিনি।
