১৯১৭ সালের আগস্টে উইলিয়াম বেল রাইলি ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যা ও প্রিমিলেনিয়ালিজমের ‘বৈজ্ঞানিক’ মতবাদসমূহ প্রচারের লক্ষ্যে একটি সংগঠন গড়ে তোলার জন্যে দ্য ফান্ডামেন্টালস-এর অন্যতম সম্পাদক এ. সি. ডিক্সন (১৮৫৪-১৯২৫) ও পুনর্জাগরণবাদী রিউবেন টরির (১৮৫৬-১৯২৮) সাথে আলোচনায় বসেন। ১৯১৯ সালে রাইলি সকল প্রটেস্ট্যান্ট গোষ্ঠীর ছয় হাজার রক্ষণশীল ক্রিশ্চানের অংশগ্রহণে ফিলাদেলফিয়ায় এক বিশাল সম্মেলনের আয়োজন করেন ও আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়ার্ল্ডস ক্রিশ্চান ফান্ডামেন্টালস অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লুসিএফএ) প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরপরই রাইলি অসাধারণভাবে সংগঠিত গস্পেল কণ্ঠশিল্পীসহ চৌদ্দজন বক্তার একটি দলকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এক সফরের ব্যবস্থা করেন, এরা আঠারটি শহরে সফর করে। উদারপন্থীরা এমনি আক্রমণের জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না, মৌলবাদী বক্তাদের প্রতি সাড়া এতটাই উৎসাহব্যঞ্জক ছিল যে রাইলি ধরে নিয়েছিলেন এক নতুন সংস্কারের সূচনা করেছেন তিনি।২২ মৌলবাদী প্রচারণাকে যুদ্ধ মনে করা হয়েছিল। নেতৃবৃন্দ অবিরাম সামরিক পরিভাষা ইমেজারি ব্যবহার করছিলেন। ‘আমার বিশ্বাস সময় হয়েছে,’ ক্রিশ্চান ওয়ার্কার্স ম্যাগাজিনে লিখেছেন ই.এ. ওলাম, ‘এদেশের ইভাঞ্জেলিস্টিক শক্তির বিশেষ করে বাইবেল ইন্সটিটিউটের কেবল বিশ্বাসের প্রতিরক্ষাকেই শক্তিশালী করা নয় বরং একে ঐক্যবদ্ধ ও আক্রমণাত্মক শক্তিতে পরিণত হতে হবে।’ এই সংখ্যায় জেমস এম. গ্রে ‘চার্চে প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক জোটের আহ্বান’ জানিয়ে একমত প্রকাশ করেন।২৩ ১৯২০ সালে নর্দার্ন ব্যাপ্টিস্ট কনভেনশনের এক সভায় কার্টিস লি ‘মৌলবাদীদের’ অ্যান্টিক্রাইস্টের কাছে হারানো অঞ্চল উদ্ধার ও ‘বিশ্বাসের মৌলবিষয়গুলোর পক্ষে মহাযুদ্ধে প্রস্তুত’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।২৪ রাইলি আরও এগিয়ে যান। এটা কোনও বিচ্ছিন্ন যুদ্ধ নয়, ‘এটা এমন এক যুদ্ধ যার থেকে কোনও রেহাই নেই।২৫
মৌলবাদীদের পরের পদক্ষেপ ছিল গোষ্ঠী থেকে উদারবাদীদের বহিষ্কার করা। বেশির ভাগ মৌলবাদীই ব্যাপ্টিস্ট বা প্রেসবিটিরিয়ান ছিল, এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রবল লড়াই। সবচেয়ে প্রভাবশালী মৌলবাদী প্রেসবিটারিয়ান ধর্মতাত্ত্বিক জে. গ্রিশাম মাচেন (১৮৮১-১৯৩৭) তাঁর জনপ্রিয় গ্রন্থ ক্রিশ্চানিটি অ্যান্ড লিবারিলিজম (১৯২৩)-এ যুক্তি দেখান যে, উদারপন্থীরা প্যাগান, ভার্জিন বার্থের মতো মৌল বিশ্বাস অগ্রাহ্য করে খোদ ক্রিশ্চান ধর্মকেই অস্বীকার করেছে। মৌলবাদী প্রেসবিটারিয়ানরা চার্চের উপর তাদের পাঁচ দফা ক্রিড চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস পেলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাধারণ সভায় ভীষণ লড়াই বেধে যায়; এক বিশেষ তিক্ত বিরোধের পর রাইলি ব্যাপ্টিস্ট সভা থেকে বের হয়ে এসে কট্টরপন্থীদের নিয়ে নিজস্ব বাইবেল ব্যাপ্টিস্ট ইউনিয়ন গঠন করেন। কিছু সংখ্যক মৌলবাদী ব্যাপ্টিস্ট মূল সংগঠনে রয়ে যায়, ভেতর থেকে সংস্কারের আশা করেছিল তারা, কিন্তু কেবলই রাইলির তীব্র ঘৃণার পাত্র হয়েছে। ২৬
অভিযান অব্যাহত থাকে। অনুভূতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, সমন্বয়ের যেকোনও প্রয়াস অবস্থার আরও অবনতি ঘটিয়েছে। শান্তিবাদী মানুষ ও সেই সময়ের আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী যাজক হ্যারি ইমারসন ফসডিক (১৮৭৮-১৯৬৯) ১৯২২ সালের ব্যাপ্টিস্ট কনভনশনে প্রদত্ত সারমনে সহিষ্ণুতার আবেদন জানালে (পরে দ্য ব্যাপ্টিস্ট-এ ‘শ্যাল দ্য ফান্ডামেন্টালিস্টস উইন’ শিরোনামে প্রকাশিত) প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা উদারবাদী ধারণার ফলে সৃষ্ট ভীষণ বিতৃষ্ণা তুলে ধরে।২৭ অন্য গোষ্ঠীতেও তা ছড়িয়ে পড়ে। সারমনের পর মৌলবাদী শিবিরের দিকে যেন ভূমিধস স্রোত নেমেছিল বলে মনে হয়েছে: অধিকতর রক্ষণশীল ডিসাইপলস অভ দ্য ক্রাইস্ট, সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্টস, পেন্টাকোস্টালস, মরমন ও স্যালভেশন আর্মি মৌলবাদী আদর্শের পক্ষে এসে দাঁড়ায়। এমনকি বিতর্ক থেকে দূরত্ব বজায় রাখা মেথডিস্ট ও এপিস্কোপালিয়ানরাও স্ব স্ব গোষ্ঠীর মৌলবাদীদের ‘ক্রিশ্চান ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ও চিরন্তন সত্যসমূহকে সংজ্ঞায়িত ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা’ করার জন্যে৮ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ১৯২৩ সালের দিকে মনে হচ্ছিল যেন মৌলবাদীরাই আসলে জিতবে ও উদারবাদীদের বিপদ থেকে গোষ্ঠীগুলোকে মুক্ত করবে। কিন্তু এরপরই এক নতুন অভিযান জাতির মনোযোগ কেড়ে নেয় ও শেষ পর্যন্ত গোটা মৌলবাদী আন্দোলনকেই দুর্নামের মুখে ফেলে দেয়।
১৯২০ সালে গণতান্ত্রিক রাজনীতিক ও প্রেসবিটারিয়ান উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান (১৮৬০-১৯২৫) স্কুল ও কলেজে বিবর্তনবাদের শিক্ষার বিরুদ্ধে ক্রুসেড শুরু করেন। তাঁর চোখে হাইয়ার ক্রিটিসিজম নয়, বরং ডারউইনবাদই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতার জন্যে দায়ী ছিল।২৯ ব্রায়ান জার্মান সামরিকবাদ ও বিবর্তনবাদের ভেতর যোগসূত্র স্থাপনের দাবিকারী দুটি গ্রন্থে বেশ মুগ্ধ হয়েছিলেন: বেঞ্জামিন কিড-এর দ্য সয়েন্স অভ পাওয়ার (১৯১৮) ও ভার্নন এল. কিলোগে-এর হেডকোয়ার্টার নাইটস (১৯১৭)। এ দুটি বইতে জার্মানদের যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার বেলায় বিবর্তনবাদের প্রভাবের বর্ণনা দেওয়া জার্মান অফিসারদের সাক্ষাৎকার অর্ন্তভুক্ত ছিল। শক্তিমানই টিকে থাকবে, এই ধারণা কেবল ‘ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেনি,’ বরং, উপসংহার টেনেছেন ব্রায়ান, ‘সৈনিকদের শ্বাস রোধ করে হত্যার জন্যে বিষাক্ত গ্যাস আবিষ্কারকারী সেই একই বিজ্ঞান প্রচার করছে যে, মানুষের রয়েছে নিষ্ঠুর পূর্ব ইতিহাস এবং বাইবেল থেকে অলৌকিক ও আধ্যাত্মিকতাকে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। একই সময়ে, ব্রায়ান মঅর মনস্তাত্ত্বিক জেমস এইচ. লিউবা তাঁর গ্রন্থ বিলিফ ইন গড অ্যান্ড ইমমর্টালিটি-তে পরিসংখ্যান তুলে ধরেন যাতে ‘প্রমাণিত’ হয়েছে যে কলেজ শিক্ষা ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিপদাপন্ন করে তুলেছে। ডারউইনবাদ তরুণ-তরণীদের ঈশ্বর, বাইবেল ও ক্রিশ্চান ধর্মের অন্যান্য মৌল মতবাদে বিশ্বাস হারানোর কারণ হচ্ছে। টিপিক্যাল মৌলবাদী ছিলেন না ব্রায়ান। তিনি যেমন প্রিমিলেনিয়ালিস্ট ছিলেন না তেমনি ঐশীগ্রন্থকেও নতুন কট্টর অক্ষরবাদ মোতাবেক পাঠ করতেন না। কিন্তু ‘গবেষণা’ তাঁকে নিশ্চিত করেছিল যে বিবর্তনবাদের তত্ত্ব নৈতিকতা, ভব্যতা ও সভ্যতার টিকে থাকার পক্ষে উপযুক্ত নয়। দ্য মিনেস অভ ডারউনিজম’ শীর্ষক ভাষণ দেওয়ার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় বিপুল দর্শক ও ব্যাপক প্রচার মাধ্যমের কাভারেজ আকৃষ্ট করেছিলেন তিনি।
