এই ধরনের ঘটনাপ্রবাহে সতর্ক হয়ে ওঠেন ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা। ইহুদিদের ধর্মান্তরকরণ তাদের ঐক্যবদ্ধ রাজ্যকে কাছাকাছি আনার বদলে বরং নতুন করে বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ‘নতুন ক্রিশ্চানদের’ কারও কারও আবার তাদের পুরোনো ধর্মবিশ্বাসে ফিরে গোপনে ইহুদি মতে জীবনযাপন করার সংবাদে অসন্তুষ্ট বোধ করেছেন ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা। বলা হয়ে থাকে, তাঁরা অন্য কনভার্সোদের আবার পুরোনো ইহুদি বলয়ে ফিরিয়ে নিতে প্রলুব্ধ করতে একটা গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই গোপন ইহুদিদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ইনকুইজিটরদের, শুয়োরের মাংস খেতে অস্বীকৃতি বা শনিবারে কাজে যাবার অস্বীকৃতির মতো কর্মকাণ্ড থেকে যাদের শনাক্ত করা সম্ভব। সন্দেহভাজনরা নিজেদের অবিশ্বাস স্বীকার ও অন্যান্য গোপন ‘জুদাইযার’দের সম্পর্কে খবর না দেওয়া পর্যন্ত তাদের উপর নির্যাতন চালানো হত। এর ফলে ইনকুইজিশনের প্রথম বার বছর সময়কালে আনুমানিক ১৩,০০০ কনভার্সো নিহত হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নিহত, বন্দি বা যাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল তাদের অনেকেই ছিল বিশ্বস্ত ক্যাথলিক, তাদের মোটেই কোনওরকম ইহুদি প্রবণতা ছিল না। এই অভিজ্ঞতা বহু কনভার্সোকে তাদের নতুন ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে তিক্ত ও সংশয়বাদী করে তোলে, এবং সেটা অস্বাভাবিক নয় মোটেই।
১৪৯২ সালে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা গ্রানাদা অধিকার করার সময় ওই নগর- রাষ্ট্রে একটি নতুন ও উল্লেখযোগ্য ইহুদি সম্প্রদায়কে পেয়েছিলেন তাঁরা। তাঁরা ভেবেছিলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, ইহুদি সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হিসাবে এই দুই রাজণ্য এডিক্ট অভ এক্সপালশনে স্বাক্ষর দেন। স্প্যানিশ ইহুদি সম্প্রদায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়। আনুমানিক ৭০,০০০ ইহুদি ক্রিশ্চান ধর্ম গ্রহণ করে ইনকুইজিশনে আক্রান্ত হতে রয়ে যায়; অবশিষ্ট ১৫০,০০০ ইহুদি, আমরা যেমন দেখেছি, চলে যায় নির্বাসনে। স্পেনের ইহুদি সম্প্রদায়ের বিনাশ জেরুজালেমে ৭০ সিই’র মন্দির ধ্বংসের পর জাতির উপর নেমে আসা সবচেয়ে বিরাট বিপর্যয় হিসাবে বিশ্বজুড়ে শোকের সাথে প্রত্যক্ষ করা হয়। ইহুদিরা সেই সময় তাদের দেশ হারিয়ে প্যালেস্তাইনের বাইরে সম্মিলিতভাবে ডায়াসপোরা নামে পরিচিত বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত সম্প্রদায়ে বাস করতে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সেই থেকে ইহুদি জীবনে নির্বাসন এক বেদনাদায়ক লাইটমোটিফ হয়ে ছিল। ১৪৯২ সালে স্পেন থেকে বিতাড়নের ঘটনা ঘটেছিল ইউরোপের বিভিন্ন অংশ থেকে একের পর এক ইহুদিদের উৎখাতের ঘটনা ঘটার এক শতাব্দীর পর। ভিয়েনা ও লিনয থেকে ১৪২১ সালে উৎখাত করা হয় তাদের, কোলন থেকে ১৪২৪ সালে; অসবার্গ থেকে ১৪৩৯ সালে, ১৪৪২ সালে বাভারিয়া থেকে ও রাজধানী শহর মোরাভিয়া থেকে ১৪৫৪ সালে। পেরুগিয়া (১৪৮৫), ভিসেনযা (১৪৮৬), পারমা (৪৮৮), মিলান ও লুক্কা (১৪৮৯) ও ১৪৯৪ সালে তাসকানির মতো প্রধান প্রধান শহর থেকে ইহুদিদের বিতাড়ন করা হয়েছিল। আস্তে আস্তে পোল্যান্ডে পা রাখার মতো একটা শক্ত জায়গা প্রতিষ্ঠা করছে ভেবে পুবে ভেসে যেতে থাকে ইহুদিরা।’ নির্বাসনকে এই সময় ইহুদি জীবনের অপরিহার্য অসুখ বলে মনে হচ্ছিল।
নিশ্চিতভাবেই উৎখাতের পর অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরে বিভিন্ন আফ্রিকান ও বালকান প্রদেশে আশ্রয় নেওয়া স্প্যানিশ ইহুদিদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এটা। মুসলিম সমাজের সাথে চলতে অভ্যস্ত ছিল তারা, কিন্তু স্পেনের-বা সেফরাদ, ওরা যেনামে ডাকত-পরাজয় এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। এইসব সেফারদিক ইহুদিরা মনে করেছিল যে খোদ তারা ও বাকি সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। নির্বাসন যেমন আধ্যাত্মিক তেমনি ভৌত স্থানচ্যুতিও বটে। নির্বাসিতদের জগৎ সম্পূর্ণ অজানা এবং সেকারণে অর্থহীন। সমস্ত স্বাভাবিক সমর্থন ছিনিয়ে নেওয়া সহিংস উদ্বাস্তু হওয়ার ঘটনা আমাদের জগৎ ভেঙে দেয়, আমাদের পরিচয়ের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিতে সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলো থেকে আমাদের চিরকালের জন্যে ছিন্ন করে ও স্থায়ীভাবে এক অচেনা পরিবেশে ছুঁড়ে দেয়, যাতে করে আমাদের মনে এমন ধারণা সৃষ্টি করতে পারে যে খোদ অস্তিত্বই বিপদাপন্ন হয়ে পড়েছে। নির্বাসন মানুষের নিষ্ঠুরতার সাথে সম্পর্কিত হলেও একজন ন্যায়পরায়ণ ও দয়াময় ঈশ্বরের যে জগৎ নির্মাণের কথা সেখানে অশুভের সমস্যা নিয়ে নানা জরুরি প্রশ্নও উঠে আসে।
সেফারদিক ইহুদিদের অভিজ্ঞতা উৎখাত ও স্থানচ্যুতির চরম ধরন ছিল, পরবর্তীকালে মানুষ আগ্রাসী আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এর স্বাদ পাবে। আমরা দেখব যে, আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা এক ভিন্ন পরিবেশে শেকড় বিস্তার করেছিল। সংস্কৃতিকে তা এমন ভীষণভাবে বদলে দিয়েছিল যে অনেক মানুষই নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও দিশাহারা বোধ করেছে। পুরোনো পৃথিবীকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল আর নতুন বিশ্ব এতটাই অচেনা ছিল যে, লোকে তাদের একসময়ের চারপাশের পরিচিত পরিবেশও আর চিনতে পারছিল না। নিজেদের জীবনের কোনও অর্থ খুঁজে পাচ্ছিল না। সেফারদিকদের মতো অনেকের মনেই এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে গেঁথে গিয়েছিল যে, তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এই বিভ্রান্তি ও বেদনার ভেতর অনেকেই কোনও কোনও স্প্যানিশ নির্বাসিতের মতোই আচরণ করেছে। ধর্মের শরণাপন্ন হয়েছে তারা। কিন্তু তাদের জীবনধারা সম্পূর্ণ পাল্টে যাওয়ায় তাদের প্রবলভাবে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে প্রাচীন ঐতিহ্যকে ভাষা দেওয়ার জন্যে ধর্মবিশ্বাসকে নতুনভাবে বিকশিত করতে হয়েছিল।
