কিন্তু এক গভীর ভীতি থেকেই এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হয়েছিল। এটা ছিল জাতিগত ঘৃণার একটা ব্যাপার; ক্যাথলিক, কমিউনিস্ট ও হাইয়ার ক্রিটিকদের মাধ্যমে জাতির অন্তরে বিদেশী প্রভাবের অনুপ্রবেশের ভীতি। মৌলবাদী এই বিশ্বাস আধুনিক বিশ্ব থেকে গভীর পশ্চাদপসরণ তুলে ধরে। রক্ষণশীল প্রটেস্ট্যান্টরা গণতন্ত্র সম্পর্কে পুরোপুরি দোনোমনো হয় উঠেছিল: এর ফলে ‘মব শাসন’ সৃষ্টি হবে, ‘লাল প্রজাতন্ত্রের দিকে’ নিয়ে যাবে, ‘এমন শয়তানি শাসন দুনিয়া আর দেখেনি।’১২ লীগ অভ নেশনস-এর মতো শান্তিরক্ষী প্রতিষ্ঠানসমূহ এর পর থেকে মৌলবাদীদের চোখে সম্পূর্ণভাবে অশুভে পরিপূর্ণ ঠেকবে। লীগ নিশ্চিতভাবেই অ্যান্টিক্রাইস্টের আস্তানা, সেইন্ট পল বলেছিলেন, বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যাবাদী হবে সে, সবাইকে প্রতারণা করবে। বাইবেল বলেছে, শান্তি নয়, অন্তিমকালে যুদ্ধ বাধবে, তো লীগ বিপজ্জনকভাবে ভুল পথে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অ্যান্টিক্রাইস্টেরই শান্তিরক্ষী হওয়ার কথা।১৩ লীগ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে মৌলবাদীদের বিতৃষ্ণা আধুনিকতার কেন্দ্রিয়করণের প্রতি অন্তরের ভীতি ও বিশ্ব সরকারের মতো যেকোনও কিছুর প্রতি ত্রাসের বিষয়টি তুলে ধরে। আধুনিক সমাজের বিশ্বজনীনতার মুখোমুখি হয়ে কিছু কিছু লোক সহজাত প্রবৃত্তির বশে গোত্রীয়বাদে ফিরে গেছে।
মানুষকে প্রাণ বাঁচাতে লড়াই করার বোধ জাগানো এই ধরনের ষড়যন্ত্র ভীতি অনায়াসেই আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। জেসাস আর ডিউইট মুডির প্রচারিত প্রেমময় উদ্ধারকর্তা ছিলেন না। নেতৃস্থানীয় প্রিমিলেনিয়ালিস্ট আইজ্যাক এম. হালদম্যান যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, বুক অভ রেভেলেশনের ক্রাইস্ট ‘এমন একজন হিসাবে এসেছেন যিনি আর বন্ধুত্ব বা ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষী নন… তাঁর পোশাকে রক্তের ধারা, অন্যের রক্ত। নেমে এসেছেন যেন মানুষের রক্ত ঝরাতে পারেন।১৪ যুদ্ধের জন্যে তৈরি ছিল রক্ষণশীলরা, এমনি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আক্রমণে নেমেছিল উদার প্রটেস্ট্যান্টরা।
ঈশ্বরের রাজ্যের দিকে পৃথিবীর এগিয়ে যাওয়ার দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালঞ্জ করে বসা যুদ্ধের বেলায় উদারপন্থীদেরও নিজস্ব সমস্যা ছিল। এই যুদ্ধকে সব যুদ্ধের অবসান ঘটানোর, বিশ্বকে গণতন্ত্রের পক্ষে নিরাপদ করে তোলা যুদ্ধ হিসাবে দেখেই কেবল সামাল দেওয়ার উপায় ছিল তাদের। প্রিমিলেনিয়ালিজমের সহিংসতা, গণতন্ত্রের প্রতি এর বিধ্বংসী সমালোচনা ও লীগ অভ নেশনসের কারণে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল তারা। এইসব মতবাদকে কেবল অ-আমেরিকানই নয়, বরং খোদ ক্রিশ্চান ধর্মের অস্বীকৃতি মনে হয়েছে। আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা; এবং ভালোবাসা ও সহানুভূতির গস্পেল সত্ত্বেও তাদের অভিযান ছিল ভয়াবহ ও ভারসাম্যহীন। ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদারনৈতিক ক্রিশ্চান ধর্মবিশ্বাসের নেতৃত্বস্থানীয় স্কলাস্টিক প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অভ শিকাগোর ডিভিনিটি স্কুলের ধর্মতাত্ত্বিকগণ শহরের অপর প্রান্তের মুডি বাইবেল কলেজকে আক্রমণ করতে শুরু করেন।১৫ প্রফেসর শার্লি জ্যাকসন চেজ প্রিমিলেনিয়ালিস্টদের বিরুদ্ধে দেশের সাথে বেঈমানি ও জার্মানদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। আলভা এস. টেইলর বলশেভিকদের সাথে তুলনা করেন তাদের, যারা তাদের মতোই একদিনেই পৃথিবীকে নতুন করে তৈরি করতে চায়। ক্রিশ্চান রেজিস্টারের সম্পাদক আলফ্রেড দিফেনবাখ প্রিমিলেনিয়ালিজমকে ‘ধর্মীয় চিন্তাভাবনার জগতে সবচেয়ে বিস্ময়কর মানসিক স্খলন’১৬ আখ্যায়িত করেন।
মুডি বাইবেল ইন্সটিটিউটের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের কেবল তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই নয় বরং যাদের শয়তানসুলভ মনে করত সেই শত্রুর সাথে তুলনা করে উদারবাদীরা একেবারে আঁতে ঘা দেয়। মুডি বাইবেল ইন্সটিটিউট মান্থলি’র সম্পাদক জেমস এম. গ্রে পাল্টা জবাবে বলেন, উদারবাদীদের শান্তিবাদই অস্ত্র প্রতিযোগিতায় আমেরিকাকে জার্মানদের পিছনে ফেলে দিয়েছে, সুতরাং তারা যুদ্ধের প্রয়াসকে বিপর্যস্ত করেছে।১৭ দ্য কিংস বিজনেস নামে একটি প্রিমিলেনিয়াল ম্যাগাজিনে টমাস সি. হর্টন যুক্তি দেখান যে, উদারপন্থীরাই আসলে জার্মানদের সাথে ঘোঁট পাকিয়েছে, কারণ ডিভিনিটি স্কুলে তাদের শিক্ষা দেওয়া হাইয়ার ক্রিটিসিজমই যুদ্ধের জন্যে দায়ী ও জার্মানিতে তা সুকোমল মূল্যবোধের ধস নামিয়েছে।১৮ অন্যান্য রক্ষণশীল নিবন্ধে কথিত জার্মান নিষ্ঠুরতার জন্যে যুক্তিবাদ ও বিবর্তবাদের তত্ত্বকে দায়ী করা হয়।১৯ বাইবেল ইন্সটিটিউট অভ লস অ্যাঞ্জেলিসের হাওয়ার্ড ডব্লু. কেলগ জোর দিয়ে বলেন যে, বিবর্তনের দর্শন ‘বিশ্ব আধিপত্য বিস্তারের দানবীয় পরিকল্পনা, সভ্যতার বিনাশ ও খোদ ক্রিশ্চান ধর্মের বিলুপ্তির জন্যে দায়ী।২০ তিক্ত ও উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই অক্রিশ্চানসূলভ বিরোধ স্পষ্টতই সংবেদনশীল স্নায়ু স্পর্শ করেছিল এবং নিশ্চিহ্নতার এক গভীর ভীতি জাগিয়ে দিয়েছিল। হাইয়ার ক্রিটিসিজমের বেলায় সমন্বয়ের আর কোনও সম্ভাবনা ছিল না, রক্ষণশীলদের চোখে যা পরম অশুভের আভা ধারণ করেছে বলে মনে হচ্ছিল। ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক সত্যি খোদ ক্রিশ্চান ধর্মের পক্ষে জীবন-মরণ প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল। বাইবেলের উপর সমালোচনামূলক আক্রমণ অরাজকতার জন্ম দেবে, গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, ‘উইল নিউ ইয়র্ক বি ডেস্ট্রয়েড ইফ ইট ডাজ নট রিপেন্ট?’ শিরোনামের এক বিখ্যাত নিবন্ধে ঘোষণা করেন ব্যাপ্টিস্ট যাজক জন স্ট্র্যাটন।২১ বিরোধ আয়ত্তের বাইরে চলে গিয়েছিল। ভাঙন হ্রাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।
