কিন্তু ১৯০৯ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এমিরিতাস চার্লস এলিয়ট ‘দ্য ফিউচার অভ রিলিজিয়ন’ শিরোনামের ভাষণ দেন; অধিকতর রক্ষণশীলদের মনে তা আঘাত হানে। এটা ছিল সহজ মূল আদিমূল্যবোধে প্রত্যাবর্তনের আরেকটি প্রয়াস। এলিয়টের বিশ্বাস ছিল নতুন ধর্মের একটাই নির্দেশনা থাকবে: অন্যের প্রতি বাস্তবমুখী সেবায় প্রতিফলিত ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা। চার্চ বা ঐশীগ্রন্থ বলে কিছু থাকবে না; পাপের কোনও ধর্মতত্ত্ব থাকবে না, প্রয়োজন থাকবে না উপাসনার। ঈশ্বরের উপস্থিতি এতটাই নিশ্চিত ও অভিভূতকারী হবে যে, লিটার্জিরও আর দরকার থাকবে না। বিজ্ঞানী, সেক্যুলারিস্ট বা ভিন্ন ধর্মের যারা অনুসারী তাদের ধ্যানধারণাও সমানভাবে বৈধ হয়ে যাওয়ায় সত্যির উপর ক্রিশ্চানদের একচেটিয়া অধিকার থাকবে না। অন্য মানুষের প্রতি দয়ার কারণে ভবিষ্যতের এই নতুন ধর্ম গণতন্ত্র, শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার বা প্রতিশোধকমূলক ওষুধের মতো সেক্যুলার ধারণা থেকে ভিন্ন হবে।’ সোশ্যাল গস্পেলের এই চরম ভাষ্য ছিল সাম্প্রতিক দশকগুলোর মতবাদগত বিরোধ থেকে পিছু হটা। কেবল যুক্তি বা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণযোগ্য সত্যিকে মূল্যদানকারী সমাজে ডগমা সমস্যায় পরিণত হয়। ধর্মতত্ত্ব অনায়াসে অনির্বচনীয় ও বর্ণনার অতীত কোনও বাস্তবতার প্রতীক হওয়ার বদলে নিজেই পরম মূল্যে পরিণত হওয়া প্রতিমূর্তি অন্ধসংস্কারে পরিণত হতে পারে। মতবাদকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পেলেও এলিয়ট তাঁর চোখে মূলে ফিরে যাবার চেষ্টা করছিলেন: ঈশ্বর ও প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা। সকল বিশ্বধর্মই সামাজিক ন্যায়বিচার ও দুর্বলের প্রতি সদয় আচরণের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। সকল ট্র্যাডিশনেই, যতক্ষণ ভালোমানুষি দেখানোর অহমের প্রয়াসে পরিণত না হচ্ছে, পবিত্রতার অনুভূতি সৃষ্টি করার জন্যে বাস্তবিকভাবে প্রকাশিত সুশৃঙ্খলিত সহানুভূতি লক্ষ করা গেছে। এলিয়ট এভাবে অর্থডক্স বিশ্বাসের চেয়ে বরং অনুশীলনের উপর বেশি নির্ভরশীল একটি বিশ্বাস সৃষ্টি করে আধুনিক বিশ্বে ক্রিশ্চানদের আসল টানোপোড়েনের সমাধানের প্রয়াস পেয়েছিলেন।
রক্ষণশীলরা অবশ্য ভীত হয়ে উঠেছিল। তাদের চোখে অনির্বচনীয় মতবাদ বিহীন বিশ্বাস ক্রিশ্চান ধর্মই নয়, তারা এই উদার বিপদ প্রতিহত করতে বাধ্য হয়েছে। ঐশীগ্রন্থের ভ্রান্তিহীনতার মতবাদ প্রদানকারী প্রিন্সটনের প্রেসবিটারিয়ানরা ১৯১০ সালে পাঁচটি ডগমার একটি তালিকা প্রকাশ করেন, তাঁদের চোখে এগুলো ছিল আবশ্যক: (১) ঐশীগ্রন্থের নির্ভুলতা, (২) ক্রাইস্টের ভার্জিন বার্থ, (৩) আমাদের পাপের কারণে ক্রসে ক্রাইস্টের প্রায়শ্চিত্ত, (৪) তাঁর দৈহিক পুনরুত্থান ও (৫) তাঁর অলৌকিক কর্মকাণ্ডের বস্তুগত বাস্তবতা। (শেষের এই মতবাদটি পরে প্রিমিলেনিয়ালিজমের শিক্ষা দিয়ে প্রতিস্থাপিত হবে)। এর পর হাইয়ার ক্রিটিসিজমকে প্রতিরোধ করার জন্যে ১৯০৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলিসে বাইবেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অয়েল মিলিয়নিয়ার লাইম্যান ও মিল্টন স্টুয়ার্ট বিশ্বাসীদের ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ শিক্ষা দিতে একটি প্রকল্পের অর্থ যোগান দেন। ১৯১০ সাল থেকে ১৯১৫ সালের ভেতর তাঁরা দ্য ফান্ডামেন্টালস শিরোনামে বারটি পেপারব্যাক প্যামফ্ল্যাটের একটা সিরিজ প্রকাশ করেন; এসব প্যামফ্ল্যাটে ধর্মবেত্তারা ট্রিনিটির মতো মতবাদের বোধগম্য বিবরণ, হাইয়ার ক্রিটিসিজমের প্রত্যাখ্যান ও গস্পেলের সত্যি প্রকাশের উপর গুরুত্ব দেন। প্রতিটি খণ্ডের আনুমানিক তিন মিলিয়ন করে কপি বিনে পয়সায় প্রত্যেক আমেরিকান প্যাস্টর, প্রফেসর ও ধর্মততেত্ত্বর ছাত্রের কাছে পাঠানো হয়। পরে এই প্রকল্প এক বিশাল প্রতীকী তাৎপর্য অর্জন করবে, কেননা মৌলবাদীরা একে তাদের আন্দোলনের প্রাণ বিবেচনা করবে। অবশ্য, এই সময় এই প্যামফ্ল্যাটগুলো তেমন একটা আগ্রহ জাগায়নি। এগুলোর সুর রেডিক্যাল বা বিশেষভাবে উগ্রও ছিল না।
কিন্তু মহাযুদ্ধের সময় রক্ষণশীল প্রটেস্ট্যান্টবাদে ত্রাসের একটা উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটে ও তা মৌলবাদী হয়ে ওঠে। আমেরিকানদের সব সময়ই বিরোধকে প্রলয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে আসার প্রবণতা ছিল। মহাযুদ্ধ তাদের অনেকেরই প্রিমিলেনিয়াল বিশ্বাসে স্থির প্রত্যয় জাগিয়েছিল। এমন ভয়াবহ মাত্রায় এমনি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড, সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে তারা, কেবল প্রলয়েরই লক্ষণ হতে পারে। এটা নিশ্চিতভাবেই বুক অভ রেভেলেশনে বর্ণিত সেই যুদ্ধ। ১৯১৪ সাল থেকে ১৯১৮ সালের ভেতর তিনটি বিশাল প্রফিসি কানফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা ‘সময়ের আরও আলামতের খোঁজে’ স্কোফিল্ড রোফারেন্স বাইবেল আঁতিপাতি করে অনুসন্ধান চালায়। সবকিছু ইঙ্গিত করে যে, এই পূর্বাভাসগুলো আসলেই সত্যি হতে যাচ্ছে। হিব্রু পয়গম্বরগণ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, প্রলয়ের আগে ইহুদিরা স্বদেশে ফিরে যাবে, সুতরাং ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্তাইনে ইহুদি বাসভূমির পক্ষে সমর্থনের অঙ্গীকারের বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭) প্রকাশ করলে প্রিমিলেনিয়ালিস্টরা একাধারে ভীতি ও আনন্দে আক্রান্ত হয়েছিল। স্কোফিল্ড বলেছিলেন, রাশিয়াই আরমাগেদনের অব্যবহিত আগে ইসরায়েলকে আক্রমণকারী ‘উত্তরের শক্তি’,১০ নাস্তিক্যবাদী কমিউনিজমকে রাষ্ট্রীয় আদর্শে রূপান্তরকারী বলশেভিক বিপ্লব (১৯১৭) যেন এই বিষয়টিকেই নিশ্চিত করেছিল। লীগ অভ নেশনস-এর প্রতিষ্ঠা নিশ্চিতভাবেই রেভেলেশন ১৬: ১৪-এর ভবিষ্যদ্বাণীকে বাস্তবে পরিণত করেছিল: রোমান সাম্রাজ্যকে পুনরুজ্জীবিত করেছে তা, অচিরেই অ্যান্টিক্রাইস্ট এর নেতৃত্ব গ্রহণ করবে। বিশ্ব ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করার সময় প্রিমিলেনিয়াল প্রটেস্ট্যান্টরা রাজনৈতিকভাবে আরও সচেতন হয়ে উঠছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যা গোষ্ঠীতে উদারপন্থীদের সাথে স্রেফ মতবাদগত বিরোধ ছিল সেটাই সভ্যতার ভবিষ্যতের জন্যে সংগ্রামের রূপ নিচ্ছিল। অচিরেই বিশ্বকে ধ্বংস করে দিতে চলা শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের সামনের কাতারে অবস্থান করতে দেখেছিল তারা। যুদ্ধের সময় এবং এর অব্যবহিত পরে জার্মান নিষ্ঠুরতার অবিশ্বাস্য সব গল্পকাহিনী যেন রক্ষণশীলদের হাইয়ার ক্রিটিসিজমের জন্মদাতা জাতিকে প্রত্যাখ্যান করে ঠিক কাজ করার প্রমাণ হিসাবে প্রতীয়মান হয়েছে।১১
