এইসব প্রয়াসের কোনও কোনওটার লক্ষ্য ছিল ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃত বিহীন আধ্যাত্মিকতা তৈরি। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের পেইন্টিং, ভাস্কর্য, কবিতা এবং নাটক ছিল এক অবিন্যস্ত পরিবর্তনশীল বিশ্বের অর্থের অনুসন্ধান; তাঁরা ধারণার উন্নত উপায় ও আধুনিক মিথ সৃষ্টির চেষ্টা করছিলেন। সিগমান্ড ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণমূলক বিজ্ঞান অবচেতনের সবচেয়ে মৌলিক স্তর উন্মোচনের প্রয়াস পেয়েছে যা ছিল নতুন অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক শক্তির উৎসে প্রবেশের প্রয়াস। প্রথাগত ধর্মের প্রতি কোনও আগ্রহ ছিল না ফ্রয়েডের, একে বিজ্ঞানের লোগোসের সবচেয়ে মারাত্মক শত্রু কল্পনা ভাবতেন তিনি। তবে তিনি গ্রিকদের প্রাচীন মিথের একটা আধুনিক অর্থ খাড়া করার চেষ্টা করেছেন, এমনকি নিজস্ব পৌরাণিক কাহিনীও তৈরি করেছেন। আধুনিক অভিজ্ঞতার ত্রাস ও ভীতির অনেকটাই মানুষকে হতাশা থেকে বাঁচাতে পারার মতো এক ধরনের অদৃশ্য তাৎপর্যের সন্ধানে তাগিদ দিয়েছে যা যুক্তিপূর্ণ অবিন্যস্ত ভাবনার প্রক্রিয়ায় অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষেই ফ্রয়েড বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের প্রতি তাঁর সমস্ত ভক্তি সত্ত্বেও দেখিয়েছেন যে, যুক্তি কেবল গভীরভাবে আমাদের আচরণকে প্রভাবিতকারী কিন্তু আমাদের নিয়ন্ত্রণের অতীত অবচেতন, অযৌক্তিক ও আদিম প্রবণতার এক জ্বলন্ত পাত্রকে ঢেকে রাখা মনের একেবারে বাইরের আবরণকে তুলে ধরে।
ধার্মিক লোকজনও মৌলিক বিষয়ের উপর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার প্রয়াস পাচ্ছিল। সবচেয়ে দূরদর্শীরা বুঝতে পেরেছিল যে সম্পূর্ণ আধুনিক মানুষকে আগের মতো ধার্মিক করে তোলা সম্ভব নয়। এই প্রতিমাবিরোধী ভবিষ্যতমুখী পরিবেশে মানুষকে অত্যাবশ্যক সীমাবদ্ধতার সাথে খাপ খাইয়ে চলমান পরিস্থিতিকে মেনে নিতে সাহায্যকারী রক্ষণশীল আধ্যাত্মিকতা সাহায্য করবে না। তাদের ভাবনা ও ধারণার গোটা চেহারাই পাল্টে গিয়েছিল। পশ্চিমে সম্পূর্ণ যৌক্তিক শিক্ষার অধিকারী অনেকেই অতীতের মূল্যের উপর একটা দুর্জ্জয় অনুভূতি সৃষ্টিকারী পৌরাণিক, অতীন্দ্রিয়বাদী ও কাল্টিক আচারের জন্যে প্রস্তুত ছিল না। পেছনে যাওয়ার কোনও উপায় ছিল না। ধার্মিক হতে চাইলে বিভিন্ন আচার, বিশ্বাস ও অনুশীলন সৃষ্টি করার প্রয়োজন ছিল যা তাদের যারপরনাই বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে কথা বলবে। ধার্মিক হওয়ার নতুন উপায়ের সন্ধান করছিল বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মানুষ। প্রথম অ্যাক্সিয়াল যুগের (c.৭০০-২০০ বিসিই) মানুষ যেমন আবিষ্কার করেছিল যে প্রাচীন প্যাগান মতবাদ আর তাদের কালের নতুন অবস্থার সাথে খাপ খাচ্ছে না, ঠিক তেমনি এই দ্বিতীয় অ্যাক্সিয়াল যুগেও একই রকম চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছিল। অন্য যেকোনও সৃজনশীল উদ্যোগের মতো আধুনিক (এবং পরে উত্তরাধুনিক) বিশ্বাসের অনুসন্ধান দারুণভাবে কঠিন ছিল। সন্ধান চলছিল, তখনও পর্যন্ত কোনও সুনির্ধারিত বা এমনকি সন্তোষজনক সমাধান বের হয়ে আসেনি। আমরা যাকে ‘মৌলবাদ’ বলি সেই ধার্মিকতা কেবল তেমনি একটি প্রয়াসের নাম।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রটেস্ট্যান্টরা বেশ কিছুকাল থেকেই নতুন কিছুর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সজাগ ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে মেরুকরণ ঘটেছিল, কিন্তু ধর্মদ্রোহীদের বিচার ও বহিষ্কার প্রত্যক্ষকারী ১৮৯০-র দশকের সংকট যেন উৎরে গেছে বলে মনে হচ্ছিল। শতাব্দীর গোড়ার দিকে বছরগুলোয় উদারপন্থী ও রক্ষণশীলরা তথাকথিত প্রগতিশীল কালের (১৯০০-২০) কল্যাণমূলক কাজে সংশ্লিষ্ট ছিল; শিল্পের দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত উন্নতি ও শহুরে জীবনের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের প্রয়াস পাচ্ছিল তারা। মতবাদগত বিবাদ সত্ত্বেও সকল গোষ্ঠীর প্রটেস্ট্যান্টরা প্রগতিশীল আদর্শের প্রতি নিবেদিত ছিল, বিদেশী মিশন ও নিষিদ্ধকরণ অভিযান বা উন্নত শিক্ষাকার্যক্রমে পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করেছে। প্রবল সমস্যা মোকাবিলা করা সত্ত্বেও অধিকাংশই নিজেদের আত্মবিশ্বাসী মনে করেছে। আমেরিকা ১৯১২ সালে ‘খৃস্টায়িত’ হয়েছিল, লিখেছেন উদার ধর্মবেত্তা ওয়াল্টার রশেনবুশ; বাকি ছিল কেবল ব্যবসা ও শিল্পের ‘ক্রাইস্টের আত্মা ও ভাবনায়’ পরিবর্তিত হওয়া। 8
প্রটেস্ট্যান্টরা ঈশ্বরহীন শহর ও কলকারখানাকে পবিত্র করে তোলার লক্ষ্যে তাদের ভাষায় ‘সোশ্যাল গস্পেল’ সৃষ্টি করেছিল। তাঁদের চোখে এটা ছিল হিব্রু পয়গম্বর ও স্বয়ং ক্রাইস্টের মৌলিক শিক্ষায় ফিরে যাওয়ার একটা প্রয়াস, যিনি তাঁর অনুসারীদের বন্দিদের দেখতে, নগ্নকে কাপড় দিতে ও ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন। সোশ্যাল গস্পেলঅলারা তাদের ভাষায় দরিদ্র ও নতুন অভিবাসীদের সেবা ও বিনোদনমূলক সুবিধা দিতে ‘প্রাতিষ্ঠানিক চার্চ” প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯১১ সালে নগরীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও বেপরোয়া মহল্লায় নিউ ইয়র্ক টেম্পল প্রতিষ্ঠাকারী চার্লস স্টেলযলের মতো উদারপন্থী প্রটেস্ট্যান্টরা সমাজতন্ত্রকেই ব্যাপ্টাইজ করার প্রয়াস পেয়েছেন ক্রিশ্চানদের বাইবেলের অনুপুঙ্ক্ষ ইতিহাস পাঠের বদলে শহুরে ও শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে এবং শিশুশ্রমের মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।o শতাব্দীর গোড়ার দিকের বছরগুলোয় রক্ষণশীল ক্রিশ্চানরাও একইভাবে উদারপন্থী প্রটেস্ট্যান্টদের মতো সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, যদিও তাদের আদর্শ ছিল ভিন্ন। তারা হয়তো সামাজিক ক্রুসেডকে শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই বা চলমান বস্তুবাদের বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখে থাকবে, কিন্তু আবার উদারপন্থী স্টেলফলের মতো নিম্ন-মজুরি, শিশুশ্রম ও অনুন্নত কর্মপরিবেশের ব্যাপারেও উদ্বিগ্ন ছিল তারা। রক্ষণশীলরা পরে সোশ্যাল গস্পেলের প্রখর সামালোচনায় মেতে উঠে যুক্তি দেখাবে যে অভিশপ্ত পৃথিবীকে বাঁচানোর চেষ্টা অর্থহীন। তারপরেও শতাব্দীর গোড়ার দিকে বছরগুলোয় এমনকি ১৯০২ সালে নর্থওয়েস্টার্ন বাইবেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম বি. রাইলির মতো জাত রক্ষণশীলগণও মিনেপোলিসকে পরিচ্ছন্ন করার জন্যে সামাজিক সংস্কারকদের সাথে কাজ করতে ইচ্ছুক ছিলেন। তিনি মন্দিরে ভাষণ দেওয়ার জন্যে লিয়ন ট্রটস্কি ও এমা গোল্ডম্যানকে আমন্ত্রণকারী স্টেলফলের মতো সোশ্যাল গস্পেলঅলারদের কর্মকৌশল মেনে নিতে পারেননি, তবে রক্ষণশীলরা তখনও রাজনীতির বর্ণালীর ডান পাশে সরে যায়নি, গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে তারা তাদের কল্যাণমূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।
