আমিন পর্দা প্রথার এই পশ্চিমা পরিহাসসুলভ মূল্যায়ন নির্বিচারে মেনে নিয়েছিলেন। তাহির আল-মারায় নারীবাদী কিছু ছিল না। মিশরিয় নারীদের নোংরা ও অজ্ঞ হিসাবে তুলে ধরেছেন আমিন; এমন মায়েদের নিয়ে মিশর পশ্চাদপদ, অলস জাতি ছাড়া আর কীই বা হতে পারে? মিশরিয়রা কি কল্পনা করে দেখেছে যে
ইউরোপের মানুষ, যারা বাষ্প ও বিদ্যুতের শক্তি আবিষ্কার করার মতো সম্পূর্ণতা ও বুদ্ধিবৃত্তি অর্জন করেছে…যারা প্রতিদিন জ্ঞানের অনুসন্ধানে জীবনের ঝুঁকি নেয় ও জীবনের আনন্দকে সম্মান দেয়…এই বুদ্ধিমত্তা ও প্রাণ, আমরা যাদের এত সম্মান করি…এর ভেতর ভালো কিছু থাকলে এত দিন চৰ্চা করার পর তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিত? ৮২
এটা বিস্ময়কর নয় যে, এমনি তোষামুদি পাল্টা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। আরব লেখকগণ তাঁদের সমাজের এমনি মূল্যায়ন মেনে নিতে অস্বীকার করেন, এই উত্তপ্ত বিতর্কের ধারায় পর্দাপ্রথা উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়। এবং সেভাবেই আছে। অনেক মুসলিমই এখন পর্দাকে সকল নারীর জন্যে শোভনতার প্রতীক ও প্রকৃত ইসলামের চিহ্ন মনে করে। নারীবাদী যুক্তি প্ৰয়োগ করে, যার জন্যে অনেকেরই তেমন একটা বা আদৌ কোনও সহানুভূতি নেই, প্রচারণার অংশ হিসাবে উপনিবেশবাদীরা মুসলিম বিশ্বে নারীবাদের লক্ষ্যকে রঞ্জিত করেছে ও ধর্মবিশ্বাসকে এর আগে অনুপস্থিত ভারসাম্যহীনতা যোগ করে বিকৃত করেছে।
আধুনিক রীতিনীতি ধর্মকে পাল্টে দিচ্ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমদের ভেতর এমনও ছিল যারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে তাদের ধর্ম বিনাশের ঝুঁকির ভেতর রয়েছে। ধর্মবিশ্বাসকে রক্ষা করার জন্যে বেশ কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে তারা। কেউ কেউ আধুনিক সমাজ থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে পবিত্র ঘাঁটি ও আশ্রয় হিসাবে নিজস্ব উগ্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে; কেউ পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল, অন্যরা আধুনিকতার সেক্যুলার পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে নিজস্ব চ্যালেঞ্জ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি- সংস্কৃতি ও ডিসকোর্স গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। ধর্মকে বিজ্ঞানের মতোই যৌক্তিক হয়ে ওঠার একটা বিশ্বাস জেগে উঠছিল। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের বছরগুলোয় এক নতুন ধরনের আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা আমরা এখন যাকে মৌলবাদ বলছি সেই যুদ্ধংদেহী ধার্মিকতার স্পষ্ট প্রকাশের দিকে টেনে নিয়ে যাবে।
০৬. মৌলবিষয় (১৯০০-২৫)
ফ্রান্সের ল্যান্ডস্কেপকে দুঃস্বপ্নের মতো নরকে পরিণত করা ১৯১৪ সালে ইউরোপে সূচিত মহাযুদ্ধ আধুনিক চেতনার ভয়ঙ্কর ও আত্মবিনাশী প্রবণতা তুলে ধরে। তরুণদের একটা গোটা প্রজন্ম ধ্বংস করে এই যুদ্ধ ইউরোপকে একেবারে এর মুলে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, যাতে সম্ভবত কোনওদিনই তা সামলে উঠতে না পারে। যুদ্ধের পর সভ্যতার অগ্রগতির ব্যাপারে কোনও চিন্তাশীল মানুষই আর ঠাণ্ডা মাথায় আশাবাদী থাকতে পারেনি। ইউরোপের সবচেয়ে সংস্কৃত অগ্রসর দেশগুলো নতুন সামরিক প্রযুক্তির সাহায্যে নিজেদের পঙ্গু করে দিয়েছিল। যুদ্ধকে যেন এমনি সম্পদ আর শক্তি এনে দেওয়া যান্ত্রিকীকরণের হীন প্যারোডি মনে হয়েছে। সৈন্যসামন্ত নিয়োগ, সেনাবাহিনী পরিবহন ও অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণের ব্যবস্থা চালু হয়ে যাবার পর নিজস্ব গতিবেগ অর্জন করেছিল যাকে থামানো ছিল কঠিন। ট্রেঞ্চ যুদ্ধের অর্থ ও যুক্তিহীনতা যুগের যুক্তি ও যুক্তিবাদকে অগ্রাহ্য করেছে, এর সাথে মানবীয় চাহিদার কোনওই সম্পর্ক ছিল না। পাশ্চাত্যের অধিবাসীরা অনেক দশক ধরে কারও কারও প্রত্যক্ষ করে আসা শূন্যতার দিকে সরাসরি চোখ ফিরিয়েছে। পশ্চিমের অর্থনীতিতেও ধস নামতে শুরু করেছিল, ১৯১০ সালে এমনভাবে তার অবনতি ঘটতে থাকে যে তা ১৯৩০-র দশকের মহামন্দায় পর্যবসিত হবে। পৃথিবী যেন অকল্পনীয় কোনও বিপর্যয়ের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল।। আইরিশ কবি ড, বি. ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯) ‘দ্বিতীয় আগমন’কে ন্যায়নিষ্ঠতা ও শান্তির বিজয় হিসাবে নয়, বরং বুনো অতলান্ত যুগের জন্ম হিসাবে প্রত্যক্ষ করেছেন:
সবকিছু ভেঙে পড়ে, মুল আর ধরে রাখতে পারছে না
দুনিয়ার বুকে নেমে এসেছে তুচ্ছ অরাজকতা,
রক্ত-রঙা স্রোত ধেয়ে আসছে, সর্বত্র
নিষ্কলুষতার উৎসব নিমজ্জিত হয়েছে;
সেরারাও সব বিশ্বাস খুইয়েছে, আর খারাপরা
আবেগময় প্রবল্যে পরিপূর্ণ।১
তবে শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক নজীরবিহীন সৃজনশীলতা ও বিস্ময়কর সাফল্যের কালও ছিল এটা, আধুনিক চেতনার পূর্ণ বিকাশ তুলে ধরেছে তা। সকল ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুজনশীল চিন্তাবিদগণ যেন বিশ্বকে একেবারে নতুন করে গড়ে তোলার ইচ্ছায় আচ্ছন্ন হয়েছিলেন, অতীতের সকল ধরন ছুঁড়ে ফেলে মুক্ত হতে চেয়েছেন। আধুনিক মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা গড়ে তুলেছিল, পৃথিবীকে আর আগের মতো করে দেখতে পারছিল না। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর উপন্যাস কাজ ও কারণের শৃঙ্খলিত অগ্রগতি তুলে ধরা এক বর্ণনা কৌশল গড়ে তুলেছিল; আধুনিক বর্ণনা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, কী ঘটেছে বা কী ভাবতে হবে সে সম্পর্কে পাঠককে ধন্ধে ফেলে দিয়েছে। পাবলো পিকাসোর (১৮৮১-১৯৭৩) মতো চিত্রশিল্পীরা বিষয়বস্তুকে ভেঙেচুরে ফেলেন বা একই সময়ে তা দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রত্যক্ষ করেন; তাঁরা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে দর্শকের প্রত্যাশাকে তাচ্ছিল্য করছিলেন, নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা করছিলেন। শিল্পকলা ও বিজ্ঞানে প্রাথমিক নীতিমালায়, বিভাজনের অতীত মূলে ফিরে যাওয়ার এবং এই শূন্য ভিত্তিমূল থেকে ফের শুরু করার একটা ইচ্ছা জেগে উঠেছিল। বিজ্ঞানীরা এখন অণু বা পার্টিকলের সন্ধান করছিলেন, সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিকগণ আদিম সমাজ বা আদিম দ্রব্যসামগ্রীতে ফিরে গেছেন। এটা আদ ফন্তাসে রক্ষণশীল প্রত্যাবর্তনের মতো ছিল না, কারণ অতীতকে নতুন করে গড়ে তোলার লক্ষ্য ছিল না এখানে বরং একে চুরমার করে দেওয়ার ইচ্ছাই কাজ করেছে, অ্যাটমকে ভাঙা, সম্পূৰ্ণ নতুন কিছুকে সামনে নিয়ে আসা।
