আফগানি ও আব্দুহর সংগ্রাম দেখায় রক্ষণশীল কালে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠা কোনও ধর্মবিশ্বাসকে আধুনিক বিশ্বের ভিন্ন রীতির সাথে খাপ খাওয়ানো কতটা কঠিন ছিল। তাঁরা উভয়েই দ্রুত সেক্যুলারাইজেশনের বিপদ সম্পর্কে সজাগ ছিলেন-এবং সঠিকভাবেই। স্থানচ্যুতকারী পরিবর্তনের একটা কালে ইসলাম খুবই কাঙ্ক্ষিত ধারাবাহিকতার যোগান দেবে। মিশরিয়রা পরস্পরের কাছে আগন্তুক হয়ে উঠছিল, পাশ্চাত্যকৃতরা প্রায়শঃই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। প্ৰাচ্য বা পাশ্চাত্য, কোথাওই তারা স্বস্তি পাচ্ছিল না এবং এককালে জীবনকে অর্থদানকারী পৌরাণিক ও প্রার্থনার অনুশীলন বিহীন আধুনিক অভিজ্ঞতার মূলে অবস্থিত এক শূন্যতার দিকে নেমে যাচ্ছিল তারা। প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছিল, কিন্তু নতুনগুলো ছিল অচেনা, ঠিকভাবে তাদের উপলব্ধি করা যাচ্ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে আফগানি ও আব্দুহ তখনও প্রাচীন আধ্যাত্মিকতায় পুষ্ট হচ্ছিলেন। ধর্মকে অবশ্যই যৌক্তিক হতে হবে বলে জোর দেওয়ার সময় ধর্মীয়ভাবে অর্জিত সমস্ত সত্যিকে পরিত্যাগকারী ইউরোপিয় যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানীদের চেয়ে বরং মোল্লাহ সদ্রার অনেক কাছাকাছি ছিলেন তাঁরা। যুক্তিই সব সত্যির ফয়সালাকারী ও সকল মতবাদকে যৌক্তিক প্রমাণের অধীন হওয়ার উপযুক্ত হতে হবে বলার সময় অনুশীলনকারী অতীন্দ্রিয়বাদীর মতোই কথা বলেছেন তাঁরা। কিন্তু পাশ্চাত্য যুক্তিবাদের চেতনায় আরও গভীরভাবে মগ্ন পরের প্রজন্মগুলো আবিষ্কার করবে যে কেবল যুক্তিই এক ধরনের পবিত্রতার বোধ জাগাতে সক্ষম নয়। দুয়ে অর্থের এই বিনাশকে পাশ্চাত্যের মতো মুক্তি ও স্বাধীনতার সুবিধা দিয়ে ভারসাম্য প্রদান করা হয়নি তার কারণ ক্রমবর্ধমানহারে পাশ্চাত্যই এজেন্ডা স্থির করে দিচ্ছিল-এমনকি ধর্মীয় বিষয়েও।
ব্যাপারটা কতখানি বিভ্রান্তিকর ও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে তারই একটা নজীর সৃষ্টি হয়েছিল ১৮৯৯ সালে কাসিম আমিন (১৮৬৫-১৯০৮) তাহরির আল- মারা (‘দ্য লিবারেশন অভ উইমেন’) প্রকাশ করার পর। এখানে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, নারীদের অধঃপতিত অবস্থা-বিশেষ করে পর্দা প্রথা-মিশরের পশ্চাদপদতার জন্যে দায়ী। পর্দা ‘নারী ও তার উন্নতির পথে বিরাট বাধা, এবং পরিণামে জাতি ও এর অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক।’৭৭ বইটির কারণে দারুণ শোরগোল পড়ে যায়, সেটা এখানে নতুন কিছু বলার কারণে নয়, বরং মিশরিয় লেখক একটা উপনিবেশবাদী সংস্কারকে আত্মস্থ ও গ্রহণ করায়। বছরে পর বছর মিশরের নারী-পুরুষ নারীদের অবস্থানের মৌলিক পরিবর্তনের জন্যে বিক্ষোভ করে আসছিল। খোদ আব্দুহ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, কোরান আল্লাহ’র চোখে নারী- পুরুষকে সমান হিসাবে উপস্থাপন করেছে, তালাক বা বহুগামীতা সংক্রান্ত প্রথাগত বিধি ইসলামের ক্ষেত্রে আবশ্যক নয়: এগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব, করতে হবে। ৮ নারীদের অবস্থার উন্নতি হয়েছিল। মুহাম্মদ ইসমাইল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সেখানে মেয়েদের প্রাথমিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন; ১৮৭৫ সাল নাগাদ প্রায় তিন হাজার মিশরিয় মেয়ে মিশন স্কুলে পড়াশোনা করে ও ১৮৭৩ সালে সরকার মেয়েদের জন্যে প্রথম রাষ্ট্রীয় প্রাথমিক স্কুল ও পরের বছর একটি মাধ্যমিক স্কুল স্থাপন করে। অতিথিরা মন্তব্য করেছেন, মেয়েদের ঘনঘন প্রকাশ্যে দেখা গেছে; কেউ কেউ পর্দা ফেলে দিচ্ছিল: শতাব্দীর শেষ নাগাদ মহিলারা পত্রপত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশ করছিলেন এবং ডাক্তার ও শিক্ষকে পরিণত হচ্ছিলেন। ব্রিটিশদের আবির্ভাবের সময়ই পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, যদিও অনেক পথ বাকি ছিল, তবে যাত্রা শুরু হয়েছিল।
পর্দা প্রথা ইসলামে মৌলিক বা মৌল অনুশীলনের কোনওটাই নয়। কোরান সকল নারীকে মাথা আবৃত করার নির্দেশ দেয়নি, পয়গম্বরের পরলোকগমনের অন্তত তিন প্রজন্ম পার হয়ে যাবার আগে ইসলামি বিশ্বে মেয়েদের আবৃত করে হেরেমে বিচ্ছিন্ন রাখার প্রথাটির আবির্ভাব ঘটেনি; এই সময় মুসলিমরা বাইযান্তি য়ামের ক্রিশ্চান ও পারসিয়ার যরোস্ত্রিয়দের অনুসরণ শুরু করেছিল, যারা নারীদের দীর্ঘদিন ধরে এভাবে রেখে এসেছিল। কিন্তু সব মহিলাই বোরখা পরত না; এটা ছিল মর্যাদার প্রতীক; কৃষক সমাজ নয়, বরং উঁচু সমাজের নারীরা বোরখা পরত। কাসিম আমিনের গ্রন্থ অবশ্য পর্দার প্রান্তিক অনুশীলনকে পুরোপুরি আধুনিকায়ন বিতর্কের প্রাণকেন্দ্রে নিয়ে আসে। তিনি জোরের সাথে বলেন যে, যতক্ষণ না পর্দাপ্রথার অবলুপ্তি ঘটানো হচ্ছে, মুসলিম বিশ্ব অপমানকর অবস্থায় পড়ে থাকবে। অংশত তাহরির আল-মারার কারণে সৃষ্ট শোরগোলের ফলেই পর্দা বহু মুসলিমের কাছে ইসলামি শুদ্ধতার প্রতীকে পরিণত হয়, অথচ বহু পশ্চিমার চোখে পর্দাপ্রথা ছিল ইসলামের দুরারোগ্য নারীবিদ্বেষের ‘প্রমাণ’।
পর্দাকেই ইসলামের সকল ভ্রান্তির মূল কারণ হিসাবে প্রত্যক্ষকারী আমিনই প্রথম ব্যক্তি নন। ব্রিটিশদের আগমন ঘটলে এই রেওয়াজ দেখে ভীতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিল তারা, যদিও পাশ্চাত্য পুরুষরা তখনও নারীবাদের প্রতি পরিহাসপ্রবণ ছিল, স্ত্রীরা ঘরের ভেতরেই অবস্থান করুক, এমনটাই চাইত তারা, নারী-শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের বিরোধী ছিল। লর্ড ক্রোমার এই দিক থেকে ছিলেন টিপিক্যাল : নারীর ভোটাধিকারের বিরোধিতা করার জন্যে লন্ডনের মেন’স লীগ গঠন করেছিলেন তিনি, অথচ তিনিই আবার মিশরের উপর রচিত তাঁর বিশাল গ্রন্থে মুসলিম নারীদের অবস্থার জন্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।৭৯ তাদের দমিত অবস্থা ক্ষয়রোগের মতো, একেবারে গোড়াতেই বিধ্বংসী কাজ শুরু করে দিয়েছে, শিশু অবস্থায় মায়েদের নিপীড়ন প্রত্যক্ষ করেছে এবং ইসলামের গোটা ব্যবস্থাকেই কুরে কুরে খেয়েছে। পর্দা প্রথা ‘মারাত্মক প্রতিবন্ধক যা মিশরিয়দের ‘পাশ্চাত্য সভ্যতার সূচনার সাথে সংশ্লিষ্ট চিন্তা ও চরিত্রের বিকাশকে’ আয়ত্ত করার পথ রুদ্ধ করেছে। মিশনারিরাও পর্দা প্রথার বিপর্যয়কর প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বিলাপ করেছেন, তাদের ধারণা ছিল এই প্রথা নারীকে জীবন্ত কবর দিয়েছে ও তাকে বন্দি বা দাসীর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। এ থেকেই বোঝা যায় মিশরের জনগণের কত ব্যাপকভাবে পাশ্চাত্য উপনিবেশবাদের তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন। ৮১
