ইতিমধ্যে দেশে বেশ লক্ষণীয় হতাশা সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমে বহু শিক্ষিত মিশরিয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল যে, ব্রিটিশ দখলদারি অবাঞ্ছিত হলেও লর্ড ক্রোমার দেশকে খেদিভ ইসমাইলের চেয়ে ঢের ভালো চালিয়েছেন। কিন্তু ১৮৯০-র দশক নাগাদ ব্রিটিশের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রায়শঃই আগের চেয়ে কম মেধাবী হতে দেখা গেছে, মিশরিয়দের সাথে সম্পর্ক উন্নত করার বেলায় তাদের তেমন একটা প্রয়াস ছিল না। গেযিরা অঞ্চলে নিজস্ব অভিজাত মহল্লা গড়ে তুলেছিল তারা। মিশরিয় সরকারী কর্মকর্তারা আবিষ্কার করেন যে, তরুণ বিট্রনদের কারণে তাদের পদোন্নতি আটকা পড়ে যাচ্ছে, ক্যাপিটুলেশন কর্তৃক ব্রিটিশ ও অন্য বিদেশীদের দেওয়া বাড়তি সুবিধার কারণে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, এইসব সুবিধা দেশের আইন-কানুন থেকে রেহাই দিয়েছিল তাদের। ক্রমেই বেশি সংখ্যক মানুষ জাতীয়তাবাদী মুস্তাফা কামালের (১৮৭৪-১৯০৮) জ্বালাময়ী ভাষণ শুনতে আগ্রহী হয়ে উঠছিল। ব্রিটিশদের অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। আব্দুহ কামালকে শূন্যগর্ভ বক্তৃতাবাজ মনে করতেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, একটি স্বাধীন আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করার আগে মিশরিয়দের দখলদারির কারণে বহুগুণে বেড়ে ওঠা কিছু মারাত্মক সামাজিক সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে।
আব্দুহ’র দৃষ্টিতে এক গভীরভাবে ধার্মিক দেশে সেক্যুলারিস্ট ধারণা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনেক দ্রুত সূচিত হচ্ছিল। ইউরোপের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে বেশ শ্রদ্ধা করতেন আব্দুহ। তবে সেগুলোকে মিশরে রোপন করা যাবে বলে মনে করেননি। বিপুল জনসংখ্যা নতুন আইনি ব্যবস্থার কিছুই বুঝতে পারেনি; এর চেতনা ও আওতা স্রেফ অজানা ছিল ওদের কাছে। এর ফলে মিশর কার্যত আইন বিহীন দেশে পরিণত হচ্ছিল।৭৩ তো আধুনিক পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে ইসলামি আইনের ব্যাপক পর্যালোচনার পরিকল্পনা করেন তিনি। তাঁর পরলোকগমনের পর ১৯২০-র দশকে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছিল। আজও তা মিশরে চালু রয়েছে। আব্দুহ বুঝতে পেরেছিলেন, মিশরের সমাজ ভেঙে পড়ছে; তাই প্রথাগত ইসলামি রীতিনীতির আধুনিক আইনি ও সাংবিধানিক বিকাশ সংযুক্ত করার প্রয়োজন ছিল; নইলে পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণার প্রতি যথেষ্ট উন্মুক্ত মিশরের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নতুন প্রতিষ্ঠানসমূহের কোনও অর্থই করতে পারবে না। উদাহরণ স্বরূপ, শুরাহর (‘পরামর্শ’) নীতিমালাকে গণতন্ত্রের সাথে মানানসই হিসাবে দেখা যেতে পারে; এবং ইজমাহ (সম্প্রদায়ের ‘ঐকমত্য’, ইসলামি আইনের অধীনে কোনও মুসলিম মতবাদ বা রেওয়াজকে যা স্বীকৃতি দেয়) এখন জনগণকে সাংবিধানিক নিয়মকানুন বুঝতে সাহায্য করতে পারে, এভাবে জনমত শাসকের ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারবে।৭৪
শিক্ষাক্ষেত্রে জরুরি সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে, উল্লেখ করেছেন আব্দুহ, সম্পূর্ণ ভিন্ন লক্ষ্যে পরিচালিত তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে; সমাজে তা অনতিক্রম্য বৈষম্য সৃষ্টি করছিল। এখনও রক্ষণশীল রীতিনীতিতে পরিচালিত ধর্মীয় স্কুল ও মাদ্রাসায় তরুণ মুসলিমরা স্বাধীন চিন্তাভাবনা থেকে নিরুৎসাহিত হচ্ছে; ঔপনিবেশিক উদ্যোগের সমর্থক ক্রিশ্চান মিশনারি স্কুলগুলোতে তরুণ মুসলিমরা দেশ ও ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। সরকারী স্কুলগুলোর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ: এগুলো ইউরোপিয় স্কুলের অক্ষম অনুকরণ, এখানে কোনও ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয় না। উলেমাদের কাছে শিক্ষাপ্রাপ্তরা সব ধরনের পরিবর্তনের পথে বাদ সাধছিল, অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষিত তরুণরা যেকোনও পরিবর্তনই গ্রহণ করছিল, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সাাথে ভাসা ভাসা পরিচিত ছিল তারা, আবার নিজ সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল।৭৫
১৮৯৯ সালে মিশরের মুফতি পরিণত হন আব্দুহ, ইসলামি আইনের ক্ষেত্রে দেশের প্রধান পরামর্শক। প্রথাগত ধর্মীয় শিক্ষার সংস্কারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মাদ্রাসার ছাত্রদের আধুনিক সমাজের অংশ হয়ে ওঠার জন্যে বিজ্ঞান পড়তে হবে। এই সময় আব্দুহর দৃষ্টিতে আযহার ছিল ইসলামের যত ভ্রান্তির জ্বলন্ত নজীর: আধুনিক বিশ্বের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আত্মরক্ষামূলক কালপ্রমাদে পরিণত হয়েছে। কিন্তু উলেমারা আব্দুহ’র সংস্কার প্রয়াসে বাধা দেন। মুহাম্মদ আলির আমল থেকেই আধুনিকতাকে রাজনীতি, আইন-কানুন, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে ঈশ্বরের প্রভাব হ্রাসকারী বিধ্বংসী আক্রমণ হিসাবে দেখে এসেছিলেন তাঁরা। তাঁদের জোর করে আধুনিক বিশ্বে ঠেলে দেওয়ার যোকানও প্রয়াসই তাঁরা প্রতিহত করবেন। ইরানি উলেমাদের বিপরীতে তাঁরা মাদ্রাসার বাইরের জীবনে মারাত্মকভাবে অস্বস্তি বোধ করতেন। এদের বেলায় আব্দুহ তেমন একটা সাফল্য লাভ করতে পারেননি। আযহারের প্রশাসনকে আধুনিকায়িত করতে পেরেছিলেন তিনি, শিক্ষকদের বেতন ও কাজের পরিবেশও উন্নত করেছিলেন। কিন্তু উলেমা ও ছাত্ররা একইভাবে পাঠ্যক্রমে আধুনিক সেক্যুলার বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্তির যেকোনও প্রয়াসের বিরোধিতা করেছেন।৭৬ এমনি বিরোধিতার মুখে হতাশ হয়ে পড়েন আব্দুহ। ১৯০৫ সালে মুফতি পদে ইস্তফা দেন এবং এর অল্পদিন পরেই মারা যান।
