লর্ড ক্রোমার ছিলেন টিপিক্যাল ঔপনিবেশিক। তাঁর চোখে মিশরিয়রা ছিল সহজাতভাবে পশ্চাদপদ জাতি, তাদের নিজেদের ভালোর জন্যেই উপনিবিশের অধীনে আনতে হয়েছে। রেনানের মতো আপন জাতির সাথে মুসলিমদের তুলনা করতে গিয়ে ধরে নিয়েছিলেন ইউরোপ বরাবরই প্রগতির সম্মুখ কাতারে ছিল। তিনি বুঝতে পারেননি, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপিয় দেশগুলো এককালে মধ্যপ্রাচ্যের মতোই ‘পশ্চাদপদ’ ছিল, তিনি স্রেফ একটি অসম্পূর্ণভাবে আধুনিকায়িত দেশের দিকে চোখ ফেরাচ্ছেন। খোদ ‘অরিয়েন্টাল’দের সহজাতভাবে, উত্তারিকারসূত্রে ভ্রান্তিময় মনে করেছেন। মিশরে ক্রোমারের সাফল্য ছিল উল্লেখ করার মতো। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করে তুলেছিলেন তিনি, দেশের সেঁচ ব্যবস্থাকে উন্নত করেছেন ও তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি করেছেন। তিনি বাধ্যতামূলক শ্রমের প্রাচীন ব্যবস্থা কোভেই বাতিল ও একটি উপযুক্ত বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে এই প্রগতির জন্যে মূল্য দিতে হয়েছে। খেদিভ নামমাত্র দেশের দায়িত্বে থাকলেও প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ে একজন করে ইংরেজ ‘উপদেষ্টা’ ছিলেন, সবক্ষেত্রে তাঁর মতই চলত। এর প্রয়োজন রয়েছে মনে করেছেন ক্রোমার। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, ইউরোপিয়রা সব সময়ই যৌক্তিক, দক্ষ ও আধুনিক ছিল, অন্যদিকে অরিয়েন্টালরা প্রকৃতিগতভাবেই যুক্তিহীন, অবিশ্বস্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত।৬৭ একইভাবে ইসলাম ‘সামাজিক ব্যবস্থা হিসাবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ,’ এবং সংস্কার বা উন্নয়নে অক্ষম। ‘সত্যিই মারা যায়নি এমন একটা দেহকে’ নতুন করে বাঁচানো আসলেই অসম্ভব, শত শত বছর ধরে এভাবেই চলতে পারে তা, কিন্তু তারপরেও তা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মুমূর্ষু, আধুনিক নিরাময় দিয়ে তা ঠেকানো যাবে না।৮ তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এই মারাত্মক রুদ্ধ দেশটির কিছুদিনের জন্যে ব্রিটিশ সমর্থনের প্রয়োজন হবে।
ব্রিটিশ দখলদারি মিশরের সমাজে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করেছিল। উলেমাগণ শিক্ষক ও জ্ঞানের প্রধান অভিভাবকের আসন হারিয়েছিলেন, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতরা তাঁদের স্থান দখল করেছিলেন। শরীয়া আদালতগুলো লর্ড ক্রোমার প্রতিষ্ঠিত ইউরোপিয় সিভিল কোর্টের কারণে প্রতিস্থাপিত হয়। কারুশিল্পী ও ক্ষুদ্র ব্যবাসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পাশ্চাত্যকৃত সিভিল সার্ভেন্ট ও বুদ্ধিজীবীরা এক নতুন অভিজাত গোষ্ঠীর সৃষ্টি করেছিল, বিশাল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন তাঁরা। কিন্তু সম্ভবত খোদ মিশরিয়দেরই তাদের সম্পর্কে উপনিবেশবাদীদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নেওয়া সবচেয়ে ক্ষতিকর ছিল। এভাবে আফগানির এক শিষ্য মুহাম্মদ আব্দুহ (১৮৪৯-১৯০৫) ব্রিটিশ দখলদারিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আধুনিক কালকে তিনি ‘বিজ্ঞানের প্রবলধারা’ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন, ধর্মের প্রথাগত মানুষদের ডুবিয়ে দিচ্ছে:
এ এমন এক কাল যা আমাদের সাথে সভ্য জাতিসমূহের সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের অসাধারণ অবস্থা সম্পর্কে সজাগ করে তুলছে…সেই সাথে আমাদের মাঝারি দশা: এভাবে ওদের সম্পদ আর আমাদের দারিদ্র্য, ওদের গর্ব আর আমাদের অবনতি, ওদের শক্তি আর আমাদের দুর্বলতা, ওদের বিজয় আর আমাদের পরাজয়। ৬৯
এমনি ক্ষয়কারী হীনম্মন্যতা উপনিবেশবাসীদের ধর্মীয় জীবনে অনুপ্রবেশ করে আব্দুহর মতো সংস্কারকদের ঔপনিবশকারীদের অভিযোগের জবাব দিতে ও ইসলাম পাশ্চাত্যের মতোই ন্যায্য ও যৌক্তিক প্রমাণে বাধ্য করেছে। প্রথমবারের মতো মুসলিমরা বিজয়ীদের তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক এজেন্ডা স্থির করে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
উরুবি বিদ্রোহে জড়িত ছিলেন আব্দুহ, ব্রিটিশ বিজয়ের পর তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। প্যারিসে আফগানির সাথে মিলিত হন তিনি। দুজনের ভেতর অনেক বিষয়েই মিল ছিল। আফগানির অতীন্দ্রিয়াবাদী (ইরফান) ধর্মের প্রতি ভালোবাসার কারণে প্রথম দিকে তিনি তাঁর গোষ্ঠীর প্রতি আকৃষ্ট হন যাকে তিনি ‘সুখের চাবিকাঠি’৭১ বলতে পছন্দ করতেন। কিন্তু আফগানি আব্দুহকে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের সাথেও পরিচিত করিয়ে দেন, পরে আব্দুহ গিযো, তলস্তয়, রেনান, স্ত্রাউস এবং হার্বার্ট স্পেন্সারের পড়েন। ইউরোপে বেশ ভালোই স্বস্তি বোধ করতেন আব্দুহ, ইউরোপিয়দের সঙ্গ তাঁর ভালো লাগত। আফগানির মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন ইসলাম আধুনিকতার সাথে মানানসই, তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে এটা বিশেষভাবে যৌক্তিক ধর্মবিশ্বাস, এবং তাকলিদের অভ্যাস আসলে দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভ্রান্তপূর্ণ। তবে আফগানির মতোই অতীন্দ্রিয় প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক চিন্তাভাবনার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন আব্দুহ। তখনও প্রাচীন বিশ্বের আধ্যাত্মিকতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি তা। শেষ পর্যন্ত আব্দুহ রাজনীতি নিয়ে আফগানির সাথে কলহে লিপ্ত হন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মিশরের বিপ্লবের চেয়ে বরং সংস্কারই বেশি প্রয়োজন। গুরুর তুলনায় গভীর চিন্তাবিদ ছিলেন তিনি, বুঝতে পেরেছিলেন আধুনিকায়ন ও স্বাধীনতার সংক্ষিপ্ত কোনও পথ নেই। আফগানির সাথে বিপজ্জনক অর্থহীন প্রকল্পে যোগ দেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার মাধ্যমে মিশরের কিছু বড় বড় সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। ১৮৮৮ সালে তাঁকে দেশে ফিরে আসতে দেওয়া হয়। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন তিনি, মিশরিয় ও ব্রিটিশদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় থাকে, লর্ড ক্রোমার ও খেদিভের ব্যক্তিগত বন্ধুতে পরিণত হন।
