তাঁর ভাবনার স্পষ্ট ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছিল হতাশা থেকে। আফগানি বিশ্বাস করেছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্যের কাছে ইসলামি বিশ্ব নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। ১৮৮০-র দশকে প্যারিসে বাস করার সময় তিনি ভাষাবিজ্ঞানী আর্নস্ট রেনানের (১৮২৩-৯২) রচনায় বৈজ্ঞানিক বর্ণবাদের দেখা পান; তাঁরা আধুনিক বিশ্বে ইসলামের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক করেছিলেন। রেনানের বিশ্বাস ছিল সেমেটিক ভাষা হিব্রু ও আরবী দূষিত, এগুলো রুদ্ধ বিকাশের নজীর। এগুলোর ‘আর্য’ভাষা ব্যবস্থার মতো সহজাত বিকাশের গ্রহণের ঘাটতি রয়েছে, নিজেদের নতুন করে সৃষ্টি করতে পারেনি। একইভাবে সেমিটিক জাতিগুলো কোনও রকম শিল্পকলা, ব্যবসা বা সভ্যতার জন্ম দিতে পারেনি। বিশেষ করে ইসলাম আধুনিকতার সাথে পাল্লা দিতে অক্ষম, মুসলিম দেশগুলোর স্পষ্ট হীনতা, তাদের সরকারের অযোগ্যতা এবং খোদ মুসলিমদের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্য’তা থেকে যার প্রমাণ মেলে। আফ্রিকার মানুষের মতো ইসলামি বিশ্বের জনগণ মানসিকভাবে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ উপলব্ধি করতে অক্ষম, একটা মৌলিক ধারণাও গঠন করার যোগ্যতা রাখে না। ইউরোপিয় বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে, আস্থার সাথে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন রেনান, ইসলাম হারিয়ে যাবে এবং অদূর ভবিষ্যতে এর অস্তিত্বই থাকবে না। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে আফগানি ইসলামের টিকে থাকা নিয়ে ভীত ছিলেন, নইলে ইসলামের বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে এমন বাড়তি গুরুত্ব দিতে যেতেন না। সত্যিকারের হুমকীর প্রতি সাড়া হিসাবে মুসলিম চিন্তাভাবনায় এক নতুন আত্মরক্ষামূলক চেতনা অনুপ্রবেশ করেছিল। রেনানের মতো চিন্তকদের রচনায় ইসলামের স্টেরিওটিপিক্যাল ও অযথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামি দেশগুলোয় ঔপনিবেশিক আগ্রাসনকে ন্যায্য প্রতিপন্ন করবে।
ইউরোপের বৃদ্ধিশীল পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রয়োজন থেকেই উপনিবেশবাদের সৃষ্টি। হেগেল যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, একটি শিল্পায়িত সমাজ ‘এর বাইরের অন্য জাতির মাঝে…ভোক্তার সন্ধান করতে ও এর মাধ্যমে টিকে থাকার প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করার’ জন্যে প্রসারিত হতে বাধ্য। নতুন বাজারের অনুসন্ধান ‘উপনিবেশের জন্যে জমিরও ব্যবস্থা করবে যেখানে সম্পূর্ণ বিকশিত বুর্জোয়াগোষ্ঠীকে ঠেলে দেওয়া হবে।’ শতাব্দীর শেষের দিকে মধ্যপ্রাচ্যের উপনিবেশিকরণ বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে চলছিল। ১৮৩০ সালে ফ্রান্স আলজেরিয়া দখল করে নিয়েছিল, নয় বছর পরে আদেন দখল করে ব্রিটেন। ১৮৮১ সালে অধিকৃত হয় তিউনিসিয়া, ১৮৮৯ সালে সুদান এবং লিবিয়া ও মরোক্কো ১৯১২ সালে। ১৯১৫ সালে সাইক্স-পিকো চুক্তি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের প্রত্যাশায় মুমূর্ষু অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ভেতর বিলি করে দেয়। এই ঔপনিবেশিক অনুপ্রবেশ ছিল প্রবল ধাক্কার মতো, কার্যত এর মানে ছিল ওই সব দেশের প্রথাগত জীবনযাত্রার অবসান, অবিলম্বে গৌণ পর্যায়ে পর্যবসিত হয়েছিল সেগুলো।
উপেনিবেশকৃত দেশ রপ্তানির জন্যে পণ্যের সরবরাহ করেছে, ইউরোপিয় শিল্পায়নের প্রক্রিয়ার পরে সেগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে। এর বিনিময়ে তা সস্তা পাশ্চাত্য উৎপাদিত পণ্য লাভ করেছে, যার মানে ছিল স্থানীয় বাজারের মার খেয়ে যাওয়া। নতুন উপনিবেশগুলোর আধুনিক প্রযুক্তিকৃত সমাজের সাথে খাপ খাওয়া নিশ্চিত করার জন্যে পুলিস ও সামরিক বাহিনীকে ইউরোপিয় ধারায় নতুন করে সংগঠিত করার প্রয়োজন ছিল; আর্থিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনীতির উৎপাদনশীল দিকেরও অভিযোজনের প্রয়োজন হয়েছে, ‘আনাড়ী’দের আধুনিক ধ্যানধারণার সাথে কিছুটা পরিচিত হতে হয়েছে। প্রজা জনসাধারণের কাছে এই আধুনিকতাকে অনুপ্রবেশকারী, নির্যাতনমূলক ও গভীরভাবে অস্থিতিশীল মনে হয়েছে। আফগানি চেয়েছিলেন মুসলিমরা যাতে নিজে থেকেই আধুনিক হয়ে দেশের ইউরোপের এমনি দুর্বল অনুরূপ হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে পারে। ঔপনিবেশবাদ একে অসম্ভব করে তুলেছিল। পাশ্চাত্য আধিপত্যের অধীনে আগত দেশগুলো আর নিজেদের মতো উন্নত হতে পারছিল না। একটি জীবন্ত সভ্যতাকে উপনিবেশবাদীরা নির্ভরশীল ব্লকে রূপান্তরিত করেছিল, স্বায়ত্তশাসনের এই ঘাটতি গভীরভাবে আধুনিক চেতনার বিরোধী দাসত্বের প্রবণতা ও অভ্যাস সৃষ্টি করেছিল। অনিবার্যভাবে তাহতাওয়ি ও অন্যান্য সংস্কারকদের মূর্ত করে তোলা ইউরোপের প্রতি আগের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তিক্ত হয়ে উঠেছিল ও অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল।
কায়রোয় আফগানির অবস্থানের সময় মিশর ক্রমে উপনিবেশের জালের দিকে এগিয়ে চলছিল, যদিও কখনওই তা সম্পূর্ণ উপনিবেশে পরিণত হয়নি। খেদিভ ইসমাইলের ব্যয়বহুল সংস্কার ও আধুনিকায়নের প্রকল্পসমূহ দেশকে দেউলিয়া করে দিয়েছিল, ইউরোপিয় ঋণের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল তা। ১৮৭৫ সালে খেদিভ ব্রিটিশের কাছে স্যুয়েয খাল বিক্রি করতে বাধ্য হন, এবং ১৯৭৬ সালে, আমরা যেমন দেখেছি, ইউরোপিয় শেয়ারহোল্ডাররা মিশরের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিয়েছিল। ইসমাইল নিজেকে মুক্ত করার প্রয়াস পেলে অটোমান সুলতানের সাথে যোগসাজশে ব্রিটিশ তাঁকে উৎখাত করে। খেদিভাত তাঁর ছেলে তেওফিকের হাতে বর্তায়। ১৮৮১ সালে মিশরিয় সামরিক বাহিনীর কিছু অফিসার আহমাদ বে উরুবির নেতৃত্বে এক অভ্যুত্থান সংগঠিত করেন। আফগানির কিছু অনুসারী ও মিশরে আধুনিক সাংবিধানিক শাসনের আকাঙ্ক্ষী কিছু লোক যোগ দেয় তাঁদের সাথে। উরুবি নতুন খেদিভের উপর নিজের সরকারকে কায়েম করতে সক্ষম হন, এই বিজয়ের পর এক গণঅভ্যুত্থান ঘটে; বিট্রিশ সরকার শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয়। ১১ই জুলাই, ১৮৮২, ব্রিটিশ নৌবাহিনী আলেকজান্দ্রিয়ায় আক্রমণ চালায় ও ১৩ই সেপ্টেম্বরে তেল এল- কেবিরে উরুবিকে পরাস্ত করে। এরপর ব্রিটিশ মিশরে তাদের নিজস্ব সামরিক দখল প্রতিষ্ঠিত করে, যদিও খেদিভ তেওফিক সরকারীভাবে পুনর্বহাল হয়েছিলেন। এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, মিশরের আসল শাসক হচ্ছেন ব্রিটিশ প্রোকনসাল, ইভেলিন ব্যারিং, লর্ড ক্রোমার।
