আবারও, আফগানি একটি বাস্তব সমস্যা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাঁর সামাধান, আকর্ষণীয় শোনালেও, বাস্তবায়নযোগ্য ছিল না, কারণ ধর্মের কাছে এর প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। দুর্বলতা, অস্থিরতা ও উন্মূলতার ফলে সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানোর শংকা তাঁর ঠিকই ছিল। এইসব রেডিক্যালভাবে নতুন ধারণার সাথে সৃজনশীলতার সাথে সামাল দিয়ে উঠতে ইসলামকে পরিবর্তিত হবার কথা বলে ঠিক যুক্তিই দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু খোদ ধর্মীয় সংস্কারের পক্ষে কোনও দেশকে আধুনিক করে পাশ্চাত্য হুমকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। মিশর শিল্পায়িত হতে না পারলে, একটি সজীব আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে না পারলে ও কৃষিভিত্তিক সমাজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে যেতে না পারলে, কোনও আদর্শই দেশটিকে ইউরোপের সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে না। পশ্চিমে আমাদের স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্র, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতার আধুনিক আদর্শগুলো একাধারে অর্থনীতি ও দার্শনিক ও রাজনীতি বিজ্ঞানীদের অবদান। ঘটনাপ্রবাহ অচিরেই প্রমাণ করবে যে, মিশরিয়রা নিজেদের যত মুক্ত ও আধুনিকই ভাবুক না কেন, অর্থনৈতিক দুর্বলতা তাদের রাজনৈতিকভাবে ভঙ্গুর ও পশ্চিমের উপর নির্ভরশীল করে তুলবে, এবং এই অমর্যাদাকর দাসত্ব তাদের পক্ষে সত্যিকারের আধুনিক চেতনার চর্চা আরও কঠিন করে তুলবে।
কিন্তু আধুনিকতার জন্যে এই আকুতি সত্ত্বেও যেসব ইরানি বুদ্ধিজীবীদের সংস্পর্শে ছিলেন তাঁদের মতোই আফগানি তখনও অনেক দিক থেকেই প্রাচীন বিশ্বের মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন তিনি, প্রার্থনা করতেন, ইসলামি আচার পালন করতেন ও ইসলামি বিধিবিধান মেনে জীবন যাপন করতেন।৫৭ মোল্লা সদ্রার অতীন্দ্রিয়াবাদের চর্চা করতেন, তাঁর বিবর্তনমূলক পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি শিষ্যদের ফালসাফাহর নিগূঢ় লোকবিদ্যার শিক্ষা দিতেন ও প্রায়শঃই মধ্যযুগের দার্শনিকের মতো যুক্তিতর্ক করতেন। অন্যান্য ধর্মীয় চিন্তাবিদের মতো নিজের বিশ্বাসকে যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। তিনি যুক্তি তুলে ধরেছিলেন যে, কোরান মুসলিমদের অন্ধবিশ্বাসে কোনও কিছু মেনে না নেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে, প্রমাণ দাবি করার নির্দেশ দিয়েছে; সুতরাং, সমীহজনকভাবে তা আধুনিক বিশ্বের সাথে মানানসই। প্রকৃতপক্ষেই, আফগানি এপর্যন্তও বলেছিলেন যে, ইসলাম আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদেরই অনুরূপ, পয়গম্বর যে আইন গ্রহণ করেছিলেন সেটা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতোই ও ইসলামের সব মতবাদকেই যুক্তি ও প্রাকৃতিক প্রদর্শনী দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব।৫৮ একেবারেই ভুল ছিল এটা। যেকোনও প্রথাগত ধর্মের মতো লোগোসের সীমার বাইরে গিয়ে পয়গম্বরিয় ও অতীন্দ্রিয় অন্তর্দৃষ্টির উপর নির্ভর করেছে ইসলাম, এবং প্রকৃতপক্ষে আফগানি স্বয়ং এভাবেই ধর্মকে প্রত্যক্ষ করেছেন। ভিন্ন মানসিক অবস্থায় তিনি একই রকম স্বচ্ছন্দে বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরতে পারতেন, যা ‘যত সুন্দরই হোক না কেন…মানবজাতিকে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করতে পারেনি, মানুষ আদর্শের জন্যে পিপাসার্ত থাকে, যা অন্ধকারে ও দূরে অবস্থান করে ও দার্শনিক ও পণ্ডিতগণ একে না ধারণা করতে পারেন না অনুসন্ধান করতে পারেন।৫৯ ইরানি বুদ্ধিজীবীদের মতো আফগানির তখনও এক পা ছিল প্রাচীন বিশ্বে, আবার একই সময়ে তিনি নতুন বিশ্বের আকাঙ্ক্ষা করেছেন। নিজের বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক দেখতে চেয়েছেন তিনি, কিন্তু রক্ষণশীল কালের যেকোনও অতীন্দ্রিয়বাদীর মতোই জানতেন, তাঁর ধর্মের মিথোস মানবজাতিকে এমন এক অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে বিজ্ঞান যা পারেনি।
এই সামঞ্জস্যহীনতা সম্ভবত অনিবার্য ছিল, কারণ আফগানি ছিলেন ক্রান্তি কালের মানুষ। তবে তাঁর উদ্বেগ থেকেও এর উদ্ভব হয়েছিল। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছিল, আফগানি নিজের ভাবনার সমস্ত স্ববিরোধিতা মুছে ফেলতে পারছিলেন না। মুসলিমদের অবশ্যই নিজেদের আরও যৌক্তিক করে তুলতে হবে। এটাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হতে হবে। তারা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে অবহেলা করে আসার ফলে ইউরোপের পেছনে পড়ে গেছে। তাদের ‘ইজতিহাদের দরজা’ বন্ধ করে দিতে বলা হয়েছিল, বলা হয়েছিল অতীতের উলেমা ও সাধুদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে। আফগানি জোরের সাথে বলেছেন, এর সাথে প্রকৃত ইসলামের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা এক ধরনের দাসত্বকে উৎসাহিত করে যা কেবল আধুনিক চেতনা বিরোধীই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বাসের ‘অত্যাবশ্যক বৈশিষ্ট্য’ ‘প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব’-কে অগ্রাহ্য করে। এখন যেমন দাঁড়িয়েছে, পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের ‘কর্তৃত্ব’ পেয়েছে, মুসলিমরা দুর্বল ও নাজুক হয়ে পড়েছে।৬১ আফগানি বুঝতে পারছিলেন ইজতিহাদের দ্বার রুদ্ধ করার ভেতর দিয়ে প্রতীকায়িত প্রাচীন রক্ষণশীল রীতিনীতি মুসলিমদের পিছু টেনে রেখেছে। কিন্তু ধর্মের মিথোসকে লোগোসের মতো উপস্থাপিত করার প্রয়াসী যেকোনও সংস্কারকের মতো তিনি একদিকে যেমন অপর্যাপ্ত ধর্মীয় ডিসকোর্সের সৃষ্টির ঝুঁকি নিয়েছিলেন তেমনি অন্য দিকে ভ্রান্ত বিজ্ঞানের।
তাঁর অ্যাক্টিভিজম সম্পর্কেও একই কথা বলা যেতে পারে। আফগানি সঠিকভাবেই তুলে ধরেছিলেন ইসলাম কর্মের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরা একটি ধর্ম। কোরানের ‘আল্লাহ অবশ্যই কোনও সম্প্রদায়ের অবস্থার পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে’৬২ এই পঙক্তিটি উদ্ধৃত করতে ভালোবাসতেন তিনি। মাদ্রাসায় আশ্রয় নেওয়ার বদলে ইসলামকে রক্ষা করতে হলে মুসলিমদের রাজনীতির বিশ্বে সংশ্লিষ্ট হতে হবে। আধুনিক বিশ্বে সত্যি বাস্তবভিত্তিক; একে অবশ্যই ভৌত ও অভিজ্ঞতার বলয়ে তৎপরতা দেখাতে হবে। আফগানি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, ইসলামের সত্যি তাঁর কালের বিশ্বে ঠিক পাশ্চাত্য আদর্শের মতোই কার্যকর। ইউরোপ অচিরেই দুনিয়া শাসন করতে যাচ্ছে উপলাব্ধি করে তাঁর কালের মুসলিম শাসকদের বিপদ সম্পর্কে সজাগ করে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আফগানির বিপ্লবী প্রকল্পগুলো ছিল প্রায়শঃই স্বয়ং-ধ্বংসী ও নৈতিকভাবে সন্দেহপূর্ণ। কোনওটাই কোনও ফল বয়ে আনেনি। স্রেফ তাঁর তৎপরতার আনুষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ডেকে এনেছে মাত্র। ১৮৭৯ সালে সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়ে মিশর থেকে ও ১৮৯১ সালে ইরান থেকে বহিষ্কার করা হয় তাঁকে, এবং পরে ইস্তাম্বুলে বাস করার অনুমতি দেওয়া হলেও অটোমান কর্তৃপক্ষের নিবিড় নজরদারিতে রাখা হয়। ধর্মীয় সত্যকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করার তাঁর প্রয়াস নিশ্চিহ্নতা ও বিপর্যয়ের ঝুঁকিপূর্ণ, আফগানি নিজেকে তাঁর ভ্রান্তিপূর্ণ বিপ্লবী কর্মতৎপরতার লক্ষ্যে ইসলামকে ‘ব্যবহার’ করার অভিযোগের শিকারে পরিণত করেছিলেন।৬৩ তিনি স্পষ্টতই ধর্মীয় ঔচিত্যবোধকে তাঁর রাজনীতির সাথে যথেষ্ট গভীরতায় সমন্বিত করতে পারেননি। ১৮৯৬ সালে তাঁর এক শিষ্য তাঁরই তাগিদে নাসির আদ-দিন শাহকে হত্যা করে, সকল ধর্মের অন্যতম মূলনীতি লঙ্ঘন করেছিলেন আফগানি: মানুষের জীবনের পরম মূল্যের প্রতি সম্মান। ইসলামকে তিনি কেবল অদক্ষ ও অদ্ভুতই করে তোলেননি, সেই সাথে অনৈতিকও।
