১৮৭০-র দশকে এক দল নতুন লেখক বর্তমানের লেবানন ও সিরিয়া থেকে কায়রোয় এসে বসতি করেন।৫৩ এদের বেশিরভাগই ছিলেন ক্রিশ্চান, ফরাসি ও আমেরিকান মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন তাঁরা, এবং তাঁদের এভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে প্রবেশাধিকার ছিল। এঁরা ছিলেন নতুন সাংবাদিকতার চর্চাকারী, অটোমান অঞ্চল থেকে খেদিভ ইসমাইলের কায়রোতে বেশি স্বাধীনতা আছে বলে আবিষ্কার করেন তাঁরা। নতুন নতুন সাময়িকী প্রকাশ করেন এরা, যেখানে লব্ধজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতি, ভূগোল, ইতিহাস, শিল্পকারখানা, কৃষিখাত, নৈতিকতা আর সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে বিভিন্ন নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, সাধারণ আরব পাঠকের কাছে গুরুত্ব পূর্ণ আধুনিক ধ্যান ধারণা পৌঁছে দেয়। এঁদের প্রভাব ছিল বিপুল। বিশেষ করে এই ক্রিশ্চান আরবরা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সেক্যুলার হয়ে ওঠার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন; তাই ধর্ম নয় কেবল বিজ্ঞানই সভ্যতার ভিত্তি হতে পারে জোর দিয়েছেন। তাহতাওয়ির মতো পাশ্চাত্যের প্রেমে পড়েছিলেন তাঁরা, মিশরের জনগণের কাছে এই উৎসাহ পৌছে দিয়েছিলেন।
পরবর্তী কালে গড়ে ওঠার বৈরিতার আলোকে এই প্রাথমিক সমীহের কথা চিন্তা করা বেশ করুণই বলা চলে। তাহতাওয়ি ও সিরিয় সাংবাদিগণ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এক সংক্ষিপ্ত মধুচন্দ্রমার কাল অতিবাহিত করছিলেন। ইসলামের প্রতি প্রাচীন ক্রুসেডিয় ঘৃণা যেন মুছে গেছে বলে মনে হয়েছিল, তাহতাওয়ি স্পষ্টতই ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে কোনও রকম রাজনৈতিক হুমকি মনে করতে পারেননি। যদিও তাঁর প্যারিস সফরের সাথে ফরাসিদের হাতে আলজেরিয়ার নিষ্ঠুর উপনিবেশিকরণের ঘটনা মিলে গিয়েছিল। তাহতাওয়ির কাছে ব্রিটিশ ও ফ্রান্স ছিল স্রেফ প্রগতির ধারক। কিন্তু ১৮৭১ সালে এক ইরানি আবির্ভূত হন কায়রোয়, তিনি পাশ্চাত্যকে ভয় করতে শিখেছিলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পশ্চিমা বিশ্ব আধিপত্য অর্জনের পথে এগিয়ে চলেছে। ইরানি ও শিয়া হলেও জামাল আল-দিন (১৮৩৯-৯৭) নিজেকে ‘আল-আফগানি’ (দ্য আফগান) বলে অভিহিত করতেন, সম্ভবত নিজেকে সুন্নি হিসাবে তুলে ধরে ইসলামি বিশ্বে বৃহত্তর শ্রোতাকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলেন।৪ প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা লাভ করেছিলেন তিনি, এখানে ফিকহ (জুরিসপ্রুডেন্স) এবং ফালসাফা ও অতীন্দ্রিয়বাদের (ইরফান)-এর নিগূঢ় অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত ছিল, তারপরেও বিট্রিশ ভারতে এক সফরের সময় তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, আধুনিক বিজ্ঞান ও গণিতই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। অবশ্য, প্যারিসাবসীদের দেখে মুগ্ধ হয়ে তাহতাওয়ির মতো আফগানি পশ্চিমের প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে যাননি। উপমহাদেশে এক দীর্ঘস্থায়ী তিক্ততা রেখে যাওয়া ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় বিদ্রোহের (১৮৫৭) সাথে তাঁর সফর কাল মিলে গিয়েছিল। আরব, তুরস্ক, রাশিয়া ও ইউরোপ সফর করেন আফগানি, পাশ্চাত্যের সর্বব্যাপিতা ও মুক্তি দেখে দারুণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। পশ্চিম ইসলামকে মাড়িয়ে যাবে বলে স্থির নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন। ১৮৭১ সালে কায়রো পৌঁছানোর মুহূর্তে একটা মিশন ছিল তাঁর হাতে। মুসলিম বিশ্বকে ইসলামের পতাকা তলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা দিতে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শানাতে ধর্মকে ব্যবহারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি।
আফগানি ছিলেন আবেগপ্রবণ, বাগ্মী, বেপরোয়া ও রগচটা মানুষ। অনেক সময় খারাপ ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছেন তিনি, কিন্তু সন্দেহাতীত ক্যারিশমা ছিল তাঁর। কায়রোয় অল্প দিনেই তিনি এক দল শিষ্য সংগ্রহ করেন ও তাদের তাঁর প্যান- ইসলামিক ধারণা প্রচারে উৎসাহিত করেন। এই সময় আধুনিক মিশরের ভবিষ্যৎ রূপ নিয়ে বেশ আলাপ আলোচনা চলছিল। সিরিয় সাংবাদিকরা সেক্যুলার রাষ্ট্রের ধারণাকে সমর্থন করেছেন, তাহতাওয়ির বিশ্বাস ছিল মিশরিয়দের উচিত হবে পাশ্চাত্য কায়দার জাতীয়তাবাদের চর্চা করা। আফগানি এসবের কোনওটার পক্ষেই ছিলেন না। তাঁর চোখে, ধর্ম দুর্বল হয়ে গিয়ে থাকলে মুসলিম সমাজ অবশ্যই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কেবল ইসলামকে সংস্কার করে ও নিজস্ব অনন্য সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে আঁকড়ে থেকেই মুসলিম দেশগুলো আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে ও জ্ঞানিক আধুনিকতার নিজস্ব ভাষ্য নির্মাণ করতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলিমরা কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ইসলামি সম্প্রদায় (উম্মাহ) অচিরইে অস্তিত্ব হারাবে। সময় কম। ইউরোপিয় সাম্রাজ্যবাদীরা প্রতিদিনই শক্তিশালী হয়ে উঠছে, খুবই অল্প দিনের ভেতর ইসলামি বিশ্ব পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পায়ে দলিত হবে।
সুতরাং, আফগানির ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রত্যক্ষ করা আধুনিকতার সমস্যাগুলোর প্রতি সাধারণ সাড়া নিশ্চিহ্নতার ভীতি থেকে উৎসারিত ছিল। তিনি বিশ্বাস করেছেন যে, আধুনিক হওয়ার জন্যে ইউরোপিয় জীবনধারা বেছে নেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। মুসলিমরা নিজেদের মতো করেই সেটা করতে পারবে। স্রেফ ব্রিটিশ ও ফরাসিদের অনুকরণ করলে, নিজেদের ঐতিহ্যের উপর পাশ্চাত্য মূল্যবোধ চাপিয়ে দিলে, নিজেদেরই হারিয়ে ফেলবে তারা। স্রেফ বাজে নকলে পরিণত হবে তারা, না ঘরকা না ঘাটকা; এভাবে নিজেদেরই দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তুলবে।৫৫ ওদের আধুনিক বিজ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে, সেটা ইউরোপের কাছ থেকেই শিখতে হবে; কিন্তু এটাই, যুক্তি দেখিয়েছেন তিনি, ‘আমাদের হীনতার ও পতনের’ প্রমাণ। ‘ইউরোপিয়দের অনুকরণ করে নিজেদের সভ্য করে তুলছি আমরা।’৫৬ একটা প্রধান সমস্যা অনুভব করেছিলেন আফগানি। পাশ্চাত্য আধুনিকতা যেখানে বিশালাংশে উদ্ভাবন ও মৌলিকতার চর্চা করে সফল হয়েছিল, মুসলিমরা কেবল অনুকরণের ভেতর দিয়েই তাদের সমাজকে আধুনিক করে তুলতে পারে। আধুনিকায়ন কর্মসূচির একটি সহজাত ও অনিবার্য ঘাটতি রয়েছে।
