কিরমানি ও মালকুম খানের মতো বুদ্ধিজীবীগণ ইরানের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবেন, নিজেদের প্রায়শঃই উলেমাদের সাথে বিরোধে লিপ্ত অবস্থায় আবিষ্কার করবেন। কিন্তু শতাব্দীর শেষের দিকে যাজকরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সব সময় প্রাচীন বয়ানে ডুবে ছিলেন ন তারা, বরং শাহগণ জনগণের জীবনকে বিপদাপন্ন করে বসলে হস্তক্ষেপে প্রস্তুত ছিলেন। ১৮৯১ সালে নাসির আদ-দিন শাহ (১৮২৯-৯৬) একটি ব্রিটিশ কোম্পানিকে ইরানে তামাক উৎপাদন ও বিক্রির একচেটিয়া অধিকার দান করেন। কাজার শাহরা বহু বছর ধরে এই ধরনের কনসেশন দিয়ে আসছিলেন, কিন্তু এপর্যন্ত কেবল সেইসব এলাকায় যেখানে ইরানিরা সংশ্লিষ্ট ছিল না। কিন্তু তামাক ইরানের জনপ্রিয় ফসল ছিল, হাজার হাজার জমি মালিক, দোকানি ও রপ্তানিকারকের আয়ের প্রধান উৎস। দেশময় বাজারি ও উলেমাদের নেতৃত্বে ব্যাপক প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ডিসেম্বর মাসে নাজাফের নেতৃস্থানীয় মুজতাহিদ হাজ মির্যা হাসান শিরাজি এক ফতওয়া জারি করে ইরানে তামাক নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। দুর্দান্ত সিদ্ধান্ত ছিল এটা। সবাই, এমনকি অমুসলিম ইরানি ও শাহর স্ত্রীরা পর্যন্ত ধুমপান বন্ধ করে দেন। সরকার নতি স্বীকার করতে ও কননেশন প্রত্যাহারে বাধ্য হয়।৪৭ এটা ছিল পূর্বাভাসমূলক একটা সময়, ইরানি উলেমাদের সম্ভাব্য শক্তি দেখিয়ে দিয়েছিল, গোপন ইমামের একক মুখপাত্র হিসাবে তাঁরা এমনকি শাহর আনুগত্যও দাবি করতে পারতেন। ফতওয়াহটি ছিল যৌক্তিক, বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর, কিন্তু কেবল প্রাচীন পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে ইমামের কর্তৃত্ব থেকে উদ্ভুত হয়েই তা অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৮৭০-র দশকে মিশরেও আধুনিক ইউরোপকে উত্তেজনাকর ও অনুপ্রেরণামূলক হিসাবে দেখা হয়েছে, আধুনিকতার সমস্যা ও যন্ত্রণা সত্ত্বেও ইসলামিক চেতনার পক্ষেও একে অনুকূল বিবেচনা করা হয়েছে। এই উৎসাহ স্পষ্টভাবে মিশরিয় লেখক রিফাহ আল-তাহতাওয়ির (১৮০১-৭৩)৪৮ রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। মুহাম্মদ আলির ভক্ত ছিলেন তিনি, আযহারে পড়াশোনা করেছেন, নতুন মিশরিয় সেনাবাহিনীতে ইমামের দায়িত্ব পালন করেছেন, এই প্রতিষ্ঠানের জন্যে তাহতাওয়ির দারুণ সমীহ ছিল। কিন্তু ১৮২৬ সালে তাহতাওয়ি মুহাম্মদ আলি প্যারিসে পাঠানো প্রথম ছাত্রদের একজন হয়েছিলেন। এটা ছিল তাঁর কাছে এক উন্মোচন। পাঁচ বছর ধরে তিনি ফরাসি, প্রাচীন ইতিহাস, গ্রিক মিথলজি, ভূগোল, গণিত ও যুক্তিবিদ্যার উপর পড়াশোনা করেন। বিশেষভাবে ইউরোপিয় আলোকনের ধারণায় রোমাঞ্চিত ছিলেন তিনি, এর যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কাছে অনেকটাই ফালসাফার মতো মনে হয়েছে।৪৯ দেশে ফেরার আগে তাহতাওয়ি তাঁর
। ডায়েরি প্রকাশ করেন, যা একজন বহিরাগতের চোখে আধুনিক পশ্চিম সম্পর্কে মূল্যবান প্রাথমিক ধারণা দেয় আমাদের। তাহতাওয়ির নিজস্ব সংস্কার ছিল। ধর্ম সম্পর্কে ইউরোপিয় দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কাছে অবমূল্যায়নকর ও ফরাসি চিন্তাবিদদের পয়গম্বরদের অতীন্দ্রিয় অনুপ্রেরণার চেয়ে তাঁদের যৌক্তিক অন্তর্দৃষ্টিকে উন্নত ভাববার ক্ষেত্রে উদ্ধত মনে হয়েছে। তবে তাহতাওয়ির কাছে প্যারিসের সমস্ত কিছু ঠিকভাবে কাজ করা আর আলস্যকে অপছন্দ করা ভালো লেগেছিল। তিনি ফরাসি সংস্কৃতির সূক্ষ্মতা ও নৈপূণ্যকে সমীহ করেছেন; উল্লেখ করেছেন প্যারিসবাসীরা ট্র্যাডিশনে বন্দি নয়, তবে সব সময় সবকিছুর আদি জানতে চায় ও তার প্রমাণ চায়।’ এমনকি সাধারণ মানুষও পড়ালেখা জানে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি, ‘আর প্রত্যেকে যে যার ক্ষমতা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।’ আধুনিকতার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান উদ্ভাবনের প্রতি আবেগ দেখেও মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। মানুষকে পরিবর্তনযোগ্য ও ভ্রান্তিময় করে তুলতে পারে তা, কিন্তু তাই বলে রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নয়। ‘কোনও একটা কাজে দক্ষ প্রত্যেকে এমন কিছু আবিষ্কার করতে চায় যার কথা আগে কেউ জানত না। কিংবা একটা কিছু শেষ করতে চায় যা এরই মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে।৫০
মিশরে ফিরে নতুন ব্যুরো অভ ট্রান্সলেশনের পরিচালক হওয়ার পর- মিশরিয়দের কাছে ইউরোপিয় বিভিন্ন রচনা সুলভ করে তুলেছিল এই ব্যুরো-তাহতাওয়ি মিশরের লোকজনকে পশ্চিমের কাছে শিক্ষা নেওয়ার উপর জোর দিয়েছিলেন। ‘ইজতিহাদের দরজা (“স্বাধীন যুক্তিপ্রয়োগ’) অবশ্যই খুলে দিতে হবে, উলেমাদের অবশ্যই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, শরীয়াহকে আধুনিক কালের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। ডাক্তার, এঞ্জিনিয়ার, ও বিজ্ঞানীদের মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতদের মতো একই মর্যাদা থাকতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞান ইসলামের ক্ষতি করতে পারে না; ইউরোপিয়া মূলত স্পেনের কাছ থেকে বিজ্ঞান শিখেছিল, তো পাশ্চাত্য বিজ্ঞান পড়ার সময়ে আরবরা আসলে তাদের আদি জ্ঞানই ফিরিয়ে নিচ্ছে। সরকার অবশ্যই প্রগতি ও উদ্ভাবনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না, বরং এগিয়ে চলার পথ দেখাতে হবে, কারণ পরিবর্তনই জীবনের ধারা। শিক্ষাই এর চাবিকাঠি; ফ্রান্সের মতো সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দিতে হবে, মেয়েদেরও ছেলেদের মতো সমান মর্যাদা থাকতে হবে। তাহতাওয়ি বিশ্বাস করতেন, মিশর এক মহান ভবিষ্যতের উপান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আধুনিকতার প্রতিশ্রুতিতে আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি; স্টিম এঞ্জিনের গুণ গেয়ে কবিতা লিখেছেন, স্যুয়েয ক্যানেল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রান্সন্যাশনাল রেলওয়েকে দূর দূরান্তের মানুষকে ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির বন্ধনে কাছাকাছি নিয়ে আসা এঞ্জিনিয়ারিং কৃতিত্ব হিসাবে দেখেছেন। ফরাসি ও ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের মিশরের এসে বাস করতে দেওয়া হোক! তাহলেই কেবল প্রগতির ধারা বেগবান হবে।৫২
