উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে ইরানে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তক, রাজনীতিক ও লেখকদের একটা দল ইউরোপিয় সংস্কৃতির সমীহের ক্ষেত্রে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিলেন। ফাতাদি আখুন্দযাদা (১৮১২-৭৮), মালকুম খান (১৮৩৩–১৯০৮), আব্দুল রহিম তারিবজাদা (১৮৩৪-১৯১১) এবং মির্যা আকা খান কিরমানি (১৮৫৩-৯৬) কোনও কোনও ক্ষেত্রে যায়নবাদীদের মতোই বিদ্রোহী ছিলেন। লাগাতার উলেমাদের বিরুদ্ধে লেগে থাকতেন তাঁরা, সম্পূর্ণ সেক্যুলার রাজনীতির পত্তন করতে চেয়েছেন, ধর্মকে মৌলিক পরিবর্তনের পক্ষে ব্যবহার করার প্রয়াস পেয়েছেন। যায়নবাদীদের মতোই তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে, প্রথাগত ধর্মবিশ্বাস—তাঁদের বেলায় ইসলাম-মানুষকে পশ্চাদপদ করে রেখেছে, প্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, ও মুক্ত আলোচনায় বাদ সেধেছে যা কিনা মহান পাশ্চাত্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যারপরনাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিরমানি বিশেষ করে স্পষ্টভাষী ছিলেন। ধর্ম বাস্তবভিত্তিক না হলে, তাঁর চোখে, এর কোনও প্রয়োজন নেই। হুসেইনের জন্যে কেঁদে হবে কী, যদি গরীবের জন্যে সত্যিকারের ন্যায়বিচারের অস্তিত্ব না থাকে?
ইউরোপিয় জ্ঞানী ব্যক্তিরা যখন গণিত, বিজ্ঞান, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করছে ও মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়ছে, সেক্যুলারিজমের এই যুগে দরিদ্র জনসাধারণের ভাগ্য উন্নয়নের জন্যে সংগ্রাম করছে, সেখানে ইরানি উলেমা পবিত্রতার সমস্যা আর পয়গম্বরের স্বর্গে উর্ধ্বারোহণ নিয়ে আলোচনায় মেতে আছেন।৪২
কিরমানি জোরের সাথে বলেছেন, সত্যিকারের ধর্ম মানে যৌক্তিক আলোকন ও সমান অধিকার। এর মানে উঁচু দালানকোঠা, শিল্প উদ্ভাবন, কলকারাখানা, যোগাযোগের উপায়ের প্রসারণ, জ্ঞানের বিকাশ, সাধারণ মানুষের কল্যাণ ন্যায়বিচার ভিত্তিক আইনের বাস্তবায়ন।৪৩ অবশ্যই কিরমানির ভুল হয়েছিল। ধর্ম এসবের কোনওটাই করেনি; বরং লোগোস অর্থাৎ, যৌক্তিক ভাবনা এইসব বাস্তব প্রকল্পে নিজেকে নিয়োজিত করেছে। ধর্মের কাজ ছিল এইসব বাস্তবভিত্তিক কর্মকাণ্ডকে পরম মূল্য দান করা। একদিক থেকে অবশ্য কিরমানি ঠিক ছিলেন, যখন তিনি শিয়া মতবাদকে প্রগতির পথে বাধা দেওয়ার জন্যে অভিযুক্ত করেছেন। জনমানুষকে সমাজের সহজাত সীমাবদ্ধতাগুলোকে মেনে নিতে সাহায্য করা ছিল রক্ষণশীল প্রাক আধুনিক ধর্মের অন্যতম কাজ; ইরানিরা প্রগতির প্রতি নিবেদিত আধুনিক বিশ্বে পূর্ণ অংশ গ্রহণ করতে চাইলে ধর্মকে আর তেমন কিছু করতে দেওয়া যাবে না। ইসলামকে পরিবর্তিত হতে হবে। কিন্তু কীভাবে?
বহু আধুনিক সেক্যুলারিস্টের মতো কিরমানি এবং তাঁর বন্ধুরা জাতির বিশঙ্খলার জন্যে ধর্মকে দুষেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেছেন যে, আরবরা ক্ষতি করার জন্যে ইসলামকে ইরানের জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে, তো প্রাক ইসলামি ইরানের ক্ষীণ জ্ঞানের ভরসায় তাঁরা পার্সিয়ান পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ইউরোপিয় গ্রন্থের অপদ্ধতিগত পাঠের উপর নির্ভরশীল পাশ্চাত্য সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিও সমানভাবে অপর্যাপ্ত ও আনাড়ী ছিল। এই সংস্কারকগণ পাশ্চাত্য আধুনিকতার জটিল প্রকৃতি সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারেননি, তাঁরা এর প্রতিষ্ঠানসমূহকে (উনবিংশ শতাব্দীর প্রগতি, বিজ্ঞান ও ক্ষমতার প্রতীক) অনেকটা ‘মেশিন’ মনে করেছেন যা নির্ভুল ও যান্ত্রিকভাবে গোটা ইউরোপিয় অভিজ্ঞতাকে তৈরি করে দিতে পারবে। ইরানিরা পাশ্চাত্য সেক্যুলার আইনি কাঠামো (শরীয়ার বদলে) অর্জন বা ইউরোপিয় কায়দার শিক্ষা করতে পারলে তারাও আধুনিক ও প্রগতিশীল হয়ে উঠতে পারবে। শিল্পায়ন ও আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি তাঁরা। ইউরোপিয় শিক্ষা নিশ্চিতভাবেই তরুণ ইরানিদের পক্ষে নতুন দরজা খুলে দিত, কিন্তু তাদের সমাজের অবকাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেলে শিক্ষা দিয়ে তেমন কিছু করার থাকবে না তাদের। আধুনিকায়ন তখনও এমনকি শিশু অবস্থায়ও পৌঁছেনি; ইরানিদের তাদের কৃষিভিত্তিক সমাজকে শিল্পায়িত ও প্রযুক্তিয়ায়িত সমাজে পরিবর্তনের কষ্টকর ও হতাশব্যঞ্জক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। কেবল সেটাই যেখানে সবাই ভাবতে পারবে, লিখতে পারবে, এবং পছন্দমতো ধারণা নিয়ে কাজ করতে পারবে, সংস্কারকদের কাঙিক্ষত সেই উদার সভ্যতা সম্ভবপর করে তুলতে পারত, যেখানে কৃষিভিত্তিক সমাজের পক্ষে এই ধরনের স্বাধীনতাকে ধারণ করা সম্ভব নয়। পাশ্চাত্য প্রতিষ্ঠানগুলো উপকারী হতে পারে, কিন্তু সেগুলো নিজে থেকে তখনও রক্ষণশীল কালে রয়ে যাওয়া দিগন্তধারী কোনও জাতির মানসিকতাকে পরিবর্তন করতে পারত না।
প্রকৃতপক্ষেই খোদ সংস্কারকদেরই এক পা তখনও প্রাচীন বিশ্বে রয়ে গিয়েছিল। আধুনিক সমাজে তাঁদের প্রাথমিক পদচারণাকে বিবেচানায় রাখলে এটা তেমন বিস্ময়কর কিছু নয়। ইস্ফাহানের অতীন্দ্রিয় মতবাদ বাবিবাদ, সুফিবাদ ও সেই সাথে পাশ্চাত্যের বইপুস্তক পাঠ করার ভেতর দিয়ে প্রগতিশীল ধারণায় উপনীত হয়েছিলেন তাঁরা। শিয়া আধ্যাত্মিকতা তাঁদের প্রাচীন বাধা ছুঁড়ে ফেলার মুক্তি ও সাহস যুগিয়েছিল, কিন্তু সেটা একেবারেই রক্ষণশীল উপায়ে। কিরমানি নিজেকে সম্পূর্ণ যুক্তিবাদী দাবি করতেন: ‘যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণই আমার বক্তব্যের উৎস ও আমার কর্মকাণ্ডের ভিত্তি,’৪৫ জোরের সাথে বলেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর যুক্তিবাদ সম্পূর্ণ পৌরাণিক ও অতীন্দ্রিয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ ছিল। ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, কিন্তু তিনি ডারউইনবাদকে মোল্লা সদ্রার সম্পূর্ণতার দিকে সকল সত্তার প্রগতিশীল উন্নয়নের সাথে এক করে দেখেছেন। মালকুম খানও তাই। তাঁরা স্রেফ ইলম-এর (‘আবশ্যক জ্ঞান’) প্রাচীন মুসলিম ধারণাকে পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে স্থান করে দিতে প্রসারিত করছিলেন। সংস্কারকগণ আধুনিক দার্শনিকদের চেয়ে বরং মধ্যযুগের ফায়লাসুফদের মতো যুক্তি তর্ক দেখাতে চাইতেন। তাঁরা সকলেই শাহদের ক্ষমতাকে সীমিতকারী সাংবিধানিক সরকারের ধারণাকে সমর্থন করেছেন; ইরানে এই বিতর্ক শুরু করার ভেতর দিয়ে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। নিশ্চিতভাবেই তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল কোনও সরকারের কথা কল্পনা করেননি। মালকুম খানের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই দার্শনিক রাজার অজ্ঞ জনসাধারণকে পথ নির্দেশ করার পুরোনো ফালসাফাহ আদর্শের কাছাকাছি ছিল, আধুনিক রাজনৈতিক বিজ্ঞানীর মতো নয়। তালিবজাদা বহুদলীয় ব্যবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেননি; তাঁর দৃষ্টিতে বিরোধী দলের ভূমিকা স্রেফ সরকারী দলের সমালোচনা করা ও কোনও সংকটের সময় ক্ষমতা দখলের জন্যে তৈরি থাকা।৪৬ গণতান্ত্রিক আদর্শ গড়ে তুলতে পাশ্চাত্য জনগণের কয়েক শো বছরের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়েছিল; তো আবারও বলতে হয়, সংস্কারকগণের একে পুরোপুরি বুঝে উঠতে না পারায় বিস্ময়ের কিছু নেই। তাঁরা ছিলেন-এছাড়া আর কিছু হওয়ার উপায়ও ছিল না-ক্রান্তিকালের মানুষ, জাতিকে পরিবর্তনের দিক নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু আধুনিকতাকে সম্পূর্ণভাবে ভাষা দিতে পারেননি।
