কারণ সেকুল্যার যায়নবাদীরা ধর্ম প্রত্যাখ্যান করার বেলায় ছিল সোজাসাপ্টা। তাদের আন্দোলন প্রকৃতপক্ষেই ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল। এদের অনেকেই ছিল নাস্তিক, সমাজতন্ত্রী, মার্ক্সিস্ট। খুব অল্প জনই তোরাহর বিভিন্ন নির্দেশনা পালন করত। কেউ কেউ ইতিবাচকভাবে ধর্মকে ঘৃণা করেছে, তাদের মতে এই ধর্ম ইহুদি জনসাধারণকে নিষ্ক্রিয় বসে থেকে মেসায়াহর অপেক্ষায় থাকতে উৎসাহিত করে ব্যর্থ করে দিয়েছে। নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সাহায্য করার বদলে ধর্ম ইহুদিদের জগৎ থেকে অদ্ভুত অতীন্দ্রিয় অনুশীলন বা প্রাচীন টেক্সট পাঠে অনুপ্রাণিত করেছে। প্রাচীন মন্দিরের শেষ রেলিক্স জেরুজালেমের পশ্চিম প্রাচীর আঁকড়ে ধরে ইহুদিদের কান্নার দৃশ্য বহু যায়নবাদীকে হতাশায় ভরে তুলেছে। অতিপ্রাকৃতের উপর আপাত অসহায় নির্ভরতা তারা যা কিছু অর্জনের প্রয়াস পাচ্ছিল তার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে ছিল। যায়নবাদীরা ঘেটোর অস্বাস্থ্যকর, সীমিত জীবন থেকে মুক্ত এক নতুন আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে চাইছিল-নতুন ইহুদি। নতুন ইহুদি হবে স্বায়ত্তশাসিত, নিজ দেশে নিজের ভাগ্যের নিয়ন্তা। কিন্তু শেকড় ও আত্মসম্মানের এই সন্ধান ছিল ইহুদি ধর্ম থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার শামিল।
সবার উপরে যায়নবাদীরা ছিল বাস্তববাদী। এটা আধুনিক কালের মানুষে পরিণত করেছিল তাদের। কিন্তু তারপরেও তারা গভীরভাবে ভূমির প্রতীকের বিস্ফোরণমূলক ‘শক্তি’ সম্পর্কে সজাগ ছিল। ইহুদিবাদের পৌরাণিক বিশ্বে ভূমি ছিল দুটি পবিত্রতম বাস্তবতা হতে অবিচ্ছেদ্য: ঈশ্বর ও তোরাহ। কাব্বালাহর অতীন্দ্রিয় যাত্রায় সত্তার অভ্যন্তরে অবতরণের শেষ পর্যায়ের সাথে প্রতীকীভাবে সম্পর্কিত ছিল, এবং কাব্বালিস্টের আপন সত্তার গভীরে আবিষ্কৃত স্বর্গীয় সত্তার মতো একই রূপের। ভূমি ছিল ইহুদি পরিচয়ের ক্ষেত্রে মৌল বিষয়। যায়নবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি যত বাস্তববাদীই হয়ে থাকুক, তারা বুঝতে পেরেছিল, অন্য কোনও দেশই আসলে ইহুদিদের ‘রক্ষা’ করতে পারবে না; মনস্তাত্ত্বিক উপশম এনে দেবে না। রাব্বিনিক প্রতিষ্ঠানের প্রবল বিরোধী পেরেযত্ স্মোলেনকিন (১৮৪২-৯৫) বিশ্বাস করতেন, একমাত্র প্যালেস্তাইনই ইহুদি রাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থান হতে পারে। লিও পিন্সকার (১৮২১-৯১) অনেক পরে নিজ বিবেচনা বোধের বিরুদ্ধে গিয়ে ধীরে ধীরে এই মতবাদে সমর্থন দিয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হন যে প্যালেস্ত াইনেই ইহুদি রাষ্ট্র হতে হবে। বাসেলে দ্বিতীয় যায়নিস্ট সম্মেলনে (১৮৯৮) উগান্দায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে থিওদর হালে আরেকটু হলেই নেতৃত্ব খোয়াতে যাচ্ছিলেন। তিনি প্রতিনিধিদের সামনে উঠে হাত তুলে সামিস্টের এই কথাগুলো উচ্চারণ করতে বাধ্য হন: ‘জেরুজালেম, তোমাকে ভুলে গেলে আমার ডান হাত যেন খসে পড়ে!’ যায়নবাদীরা তাদের সম্পূর্ণ সেক্যুলার এমনকি ঈশ্বরবিহীন অভিযানকে বাস্তব পৃথিবীতে একটি বাস্তবায়নযোগ্য বাস্তবতায় পরিণত করতে মিথোসের শক্তি কাজে লাগাতে প্রস্তুত ছিল। সাফল্যই ছিল তাদের বিজয়। কিন্তু পৌরাণিক, পবিত্র ভূগোলকে সমর্থন দান একে কাঠিন বাস্তবে রূপান্তরিত করার প্রয়াস পাওয়ার সময় বরাবরের মতোই সমস্যাসঙ্কুল হয়ে উঠবে। প্রথম দিকের যায়নবাদীদের পূর্ববর্তী দুই হাজার বছরের প্যালেস্তাইনের আঞ্চলিক ইতিহাস সম্পর্কে তেমন একটা ধারণা ছিল না; তাদের শ্লোগান: ‘জনহীন এক দেশের জন্যে দেশহীন এক জাতি!’ দেশটি যে নিজস্ব দেশের জন্যে নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা লালনকারী প্যালেস্তাইনি আরবদের অধিবাস থাকার সত্যির প্রতি যারপরনাই উপেক্ষাই তুলে ধরেছিল। যায়নবাদ এর সীমিত, বাস্তব ভিত্তিক ও আধুনিক লক্ষ্যে সফল হয়ে থাকলেও তা ইসরায়েলের জনগণকে এমন এক বিরোধে জড়িয়ে দিয়েছিল এই বইটি লেখার মুহূর্তেও যা প্রশমিত হওয়ার তেমন একটা লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
*
মিশর ও ইরানের মুসলিমরা, আমরা যেমন দেখেছি, প্রথমে আধুনিকতাকে আগ্রাসী, আক্রমণাত্মক ও শোষণমুলক আবিষ্কার করেছিল। আজকাল পাশ্চাত্যের জনগণ মুসলিম মৌলবাদীদের পক্ষ থেকে তাদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা, তাদের নীতিমালাকে শয়তানসুলভ হিসাবে প্রত্যাখ্যান ও সেক্যুলারিজম, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মতো মূল্যবোধের প্রতি কটাক্ষ করার কথা শুনে অভ্যস্ত। এমন একটা ধারণা রয়েছে যে ‘ইসলাম’ ও পাশ্চাত্য সম্পূর্ণ বেমানান; তাদের আদর্শ সম্পূর্ণ বিপরীত, পশ্চিম যা কিছুর পক্ষে ‘ইসলাম’ তারই বিরোধিতা করে থাকে। সুতরাং, এটা উপলব্ধি করা জরুরি যে, আসল ব্যাপার তা নয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা যেমন দেখেছি, মুসলিমরা তাদের নিজস্ব আধ্যাত্মিক শক্তিতেই অনেক ধারণা ও মূল্যবোধ অর্জন করেছিল। তারা ধর্ম ও রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার উপলব্ধির বিকাশ ঘটিয়েছিল ও ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার দর্শন গড়ে তুলেছিল; যৌক্তিক চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিল। ন্যায়বিচার ও সাম্যের প্রতি কোরানিক জোর আধুনিক পাশ্চাত্য রীতির মতোই পবিত্র। সুতরাং, বহু মুসলিম চিন্ত াবিদের পাশ্চাত্যের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া বিস্ময়কর নয়। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, ইউরোপিয় ও মুসলিমরা একই মূল্যবোধ ধারণ করে, যদিও ইউরোপের জনগণ নিশ্চিতভাবেই আরও দক্ষ, গতিশীল ও সৃজনশীল সমাজ নির্মাণে অগ্রসর হয়েছে, যাকে তাঁরা নিজেদের দেশে নতুন করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
