প্যালেস্তাইনে একটি ইহুদি স্বদেশ ভূমি সৃষ্টির আন্দোলন যায়নিজম আধুনিকতার প্রতি এইসব ইহুদি সাড়ার ভেতর সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও কল্পনা নির্ভর। এটা কোনও একরৈখিক আন্দোলন ছিল না। যায়নিস্ট নেতারা নানা রকম আধুনিক ধ্যান-ধারণা থেকে গ্রহণ করেছেন: জাতীয়তাবাদ, পাশ্চাত্য আধিপত্যবাদ, সমাজতন্ত্র ও ইহুদি আলোকনের সেক্যুলারিজম। প্যালেস্তাইনে একটি সমাজতন্ত্রী সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে লিপ্ত ডেভিড বেন গুরিওনের (১৮৮৬-১৯৭৩) লেবর যায়নিজম প্রধান যায়নিস্ট আদর্শ হিসাবে আবির্ভূত হলেও যায়নিস্ট উদ্যোগ পুঁজিবাদের উপরও দারুণভাবে নির্ভর করেছে। ১৮৮০ থেকে ১৯১৭ সালের ভেতর ইহুদি ব্যবসায়ীরা প্যালেস্তাইনে অনুপস্থিত আরব ও তুর্কি জমির মালিকদের কাছ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনোয়োগ করে জমি ক্রয় করেছে। থিওদর হার্যেল (১৮৬০-১৯০৪) ও চেইম ওয়েইম্যান (১৮৭৪-১৯৫৩)-এর মতো অন্যরা পরিণত হয়েছেন রাজনৈতিক লবিস্টে। ভবিষ্যতের ইহুদিরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপিয় কলোনি হিসাবে কল্পনা করেছেন হালে। অনেকে আবার জাতি রাষ্ট্র চায়নি। বরং নতুন স্বদেশভূমিকে ইহুদিদের পক্ষে একটা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ভেবেছে। অনেকেই আসন্ন অ্যান্টি-সেমিটক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেছে; নিশ্চিহ্নতার কবল থেকে ইহুদি জাতিকে রক্ষা করতে তাদের অবশ্যই একটা নিরাপদ আশ্রয় ও শরণ তৈরি করতে হবে। তাদের নিশ্চিহ্নতার ভীতি কোনও নৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা ছিল না, বরং তা ছিল আধুনিকতার খুনে সম্ভাবনার বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন।
যায়নবাদের সবগুলো ধরনেই ভীত বোধ করেছে অর্থডক্সরা। উনবিংশ শতাব্দীতে ধর্মীয় ধরনের যায়নবাদ সৃষ্টির অন্তত দুটি প্রয়াস চলেছিল, কিন্তু কোনওটাই তেমন একটা সমর্থন পায়নি। ১৮৪৫ সালে সারায়েভোর সেফারদিক ইহুদি ইয়েহুদা হাই আলকালাই (১৭৯৮-১৮৭৮) যায়নে প্রত্যাবর্তনের প্রাচীন মেসিয়ানিক মিথকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কর্মসূচিতে পরিণত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। মেসায়াহ কোনও ব্যক্তি নন, বরং একটা প্রক্রিয়া ‘খোদ ইহুদিদের প্রচেষ্টার ভেতর দিয়েই এর সূচনা ঘটবে, তাদের অবশ্যই সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নেতা নির্বাচন করতে হবে এবং নির্বাসনের দেশ ত্যাগ করতে হবে।’৩৭ বিশ বছর পরে পোলিশ ইহুদি ভি হার্শ কালিশার (১৭৯৫-১৮৭৪) তাঁর দেভিশাত যায়নে (‘যায়নের আশা’, ১৮৬২) ঠিক এই বিষয়টিই তুলে ধরেন। প্রাচীন মিথলজিকে যৌক্তিক করার চেষ্টা করছিলেন আলকালাই ও কালিশার, একে ধরায় নামিয়ে এনে সেকুলারাইজ করছিলেন। কিন্তু ধর্মপ্রাণ, ধার্মিক বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ ইহুদির কাছে এ জাতীয় যেকোনও ধারণাই মারাত্মক ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের বছরগুলোয় যায়নিস্ট আন্দোলন গতি অর্জন ও সুইট্যারল্যান্ডের বাসেলে অনুষ্ঠিত বিশাল যায়নিস্ট সম্মেলনে আন্তর্জাতিক পরিচয় পেলে অর্থডক্সরা একে চরম ভাষায় নিন্দা জানিয়েছিল।” প্রাক আধুনিক বিশ্বে মিথের সম্পূর্ণতই লোগোসের এখতিয়ারে থাকা বাস্তব ভিত্তিক কর্মকাণ্ডের নীল-নকশা হওয়ার কথা ছিল না। মিথের কাজ ছিল এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে অর্থ ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি দান করা। শাব্বেতাই যেভি ঘটনা মনের অদৃশ্য বলয়ের কাহিনী ও ইমেজকে রাজনীতির বলয়ে প্রয়োগ করায় কী বিপদ হতে পারে সেটা দেখিয়েছিল। সেই প্রয়াসের ব্যর্থতার ধাক্কার পর থেকে মিথোসকে লোগোস-এর মতো বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগযোগ্যতা থাকার মতো করে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে পুরোনো সংস্কার ইহুদি কল্পনায় টাবুর শক্তি লাভ করেছিল। নিষ্কৃতি অর্জনের যে কোনও মানবীয় প্রয়াস বা পবিত্রভূমিতে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে ‘সমাপ্তিকে ত্বরান্বিত’ করা ছিল ঘৃণিত। ইহুদিদের এমনকি যায়নে ফিরে যেতে বেশি প্রার্থনা করার উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। একমাত্র নিষ্কৃতি দানের অধিকারী ঈশ্বরের বিরুদ্ধে এমন যেকোনও উদ্যোগ গ্রহণ বিদ্রোহের শামিল; যেকেউ এমন কিছু করলে সে ‘অন্যপক্ষে’, দানবীয় বিশ্বে যোগ দেবে। ইহুদিদের অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে হবে। এটা নির্বাসনের অস্তিত্বমূলক অবস্থার একটা শর্ত।৩৯ মোটামুটি শিয়া মুসলিমদের মতোই ইহুদিরা রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিষিদ্ধ করেছিল, ইহুদি ইতিহাস থেকে ভালো করেই জানা ছিল তাদের ইতিহাসে মিথকে মূর্ত করে তোলা কতখানি মারাত্মক হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আজও যায়নিজম ও এই আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট ইহুদি রাষ্ট্র ইহুদি বিশ্বে খোদ অধুনিকতার চেয়ে ঢের বেশি বিভাজক হয়ে আছে। যায়নিজম ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে বা বিপক্ষে সাড়া ইহুদি মৌলবাদের সব ধরনের ক্ষেত্রে মূল প্রেরণাদায়ী শক্তিতে পরিণত হবে।° যায়নিজমের মাধ্যমেই মূলত সেক্যুলার আধুনিকতা ইহুদি জীবনে প্রবেশ করেছে; চিরকালের মতো একে বদলে দিয়েছে। এর কারণ প্রথমত, যায়নবাদীরা ইহুদিবাদের অন্যতম পবিত্র প্রতীক ইসরায়েল দেশকে যৌক্তিক, জাগতিক ও প্রায়োগিক বাস্তবতায় পরিণত করতে দারুণভাবে সফল হয়েছিল। একে অতীন্দ্রিয় বা হালাখিয়ভাবে ধ্যান করার বদলে যায়নবাদীরা শারীরিকভাবে, কৌশলগতভাবে ও সামরিকভাবে এই দেশে বাস করেছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থডক্সদের কাছে গোড়ার দিকের এই বছরগুলোতে এর মানে ছিল পবিত্র বাস্তবতাকে মাড়িয়ে যাওয়া ধর্মদ্রোহীর মতো। এটা ছিল শত শত বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে যাওয়া অশ্লীলতার পরিকল্পিত কাজ।
