অবশ্য, একই সময়ে ‘ইহুদি’রা একটা প্রতীকেও পরিণত হয়েছিল যার উপর লোকে আধুনিকায়নের সামাজিক গোলমালের ভীতি ও সংস্কারকে স্থান দিতে পারছিল। ইহুদিরা ঘেটো থেকে বের হয়ে ক্রিশ্চান মহল্লায় আবির্ভূত হয়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে অসাধারণ সাফল্য অর্জন শুরু করায় তারা যেন পুরোনো ব্যবস্থার বিনাশই প্রতীকায়িত করে তুলেছিল। ইউরোপিয়রা আধুনিকতাকে ভীতিকর ‘মেল্টিং পট’ হিসাবেও অনুভব করেছে। নতুন শিল্পোন্নত বিশ্ব প্রাচীন সব বাধা ভেঙে ফেলছিল, অনেকে এখন একে পরিষ্কার সীমারেখাহীন আকার বিহীন সমাজ হিসাবে ধরে নিয়েছিল, অরাজক ও নিশ্চিহ্নকারী অবস্থা। মূলধারায় মিশে যাওয়া ইহুদিদেরই বেশি অস্বস্তিকর মনে হয়েছে। তারা কি ‘অ-ইহুদি’-তে পরিণত হয়ে এখনও অনতিক্রম্য মনে হওয়া বিভাজন রেখা অতিক্রম করতে পেরেছে? আধুনিক অ্যান্টি-সেমিটিজম আধুনিকায়ন ও সামাজিক বিভ্রান্তির ভীতিকর মাত্রার গোলমালে বিব্রত বোধকারীদের হতাশা ও অসন্তোষ প্রকাশের একটা লক্ষ্য তৈরি করে দিয়েছিল। ‘সংজ্ঞায়িত’ করার মানে ছিল এইসব ভীতিকর পরিবর্তনের উপর সীমা আরোপ করা; কোনও কোনও প্রটেস্ট্যান্ট যেমন কঠোরতর মতদবাদগত সংজ্ঞার ভেতর নিশ্চয়তার সন্ধান করেছে, অন্যরা নতুন করে পুরোনো সামাজিক সীমারেখা গড়ে তুলে শূন্যতাকে দূরে ঠেলে রাখার চেষ্টা করেছে।
১৮৮০-র দশক নাগাদ আলোকনের সহিষ্ণুতা করুণভাবে অগভীর প্রমাণিত হয়ে পড়ে। আততায়ীর হাতে রাশিয়ায় উদারনৈতিক জার দ্বিতীয় আলেক্সান্দার নিহত হওয়ার পর বিভিন্ন পেশায় ইহুদিদের নতুন করে অংশ নেওয়ার উপর নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ১৮৯১ সালে দশ হাজারেরও বেশি ইহুদিকে মস্কো থেকে বহিষ্কার করা হয় ও ১৮৯৩ থেকে ১৮৯৫ সাল মেয়াদে এই অঞ্চলে ব্যাপক মাত্রায় বিতাড়নের ঘটনা ঘটে। অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক মার্জনা পাওয়া বা এমনকি তাদের হাতেই ঘটা হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারও ছিল। এসব ঘটনায় অবশেষে কিশিনেভের (১৯০৫) হত্যাকাণ্ডে পর্যবসিত ইহুদিদের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, এখানে পঞ্চাশ জন ইহুদিকে হত্যা করা হয়, আহত হয় পাঁচ শো। বছরে মোটামুটি পঞ্চাশ হাজার ইহুদি পশ্চিমে পালিয়ে যেতে শুরু করেছিল, পশ্চিম ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও প্যালেস্তাইনে বসতি গড়তে শুরু করে তারা। কিন্তু বিচিত্র পোশাক-আশাক ও ভিনদেশী রীতিনীতি নিয়ে এই পূর্বাঞ্চলীয় ইহুদিদের পশ্চিম ইউরোপে আগমন পুরোনো সংস্কারকে ফের চাঙা করে তোলে। ১৮৮৬ সালে জার্মানি সরকারীভাবে অ্যান্টি-সেমিটিক প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রথম পার্লামেন্টারি ডেপুটি নির্বাচিত করে; ১৮৯৩ সাল নাগাদ এর সংখ্যা দাঁড়ায় ষোল। অস্ট্রিয়ায় ক্রিশ্চান সমাজতন্ত্রী কার্ল ল্যুগার (১৮৪৪-১৯১০) এক শক্তিশালী অ্যান্টি- সেমিটিক আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ১৮৯৫ এর দিকে তিনি ভিয়েনার মেয়র নির্বাচিত হন। নতুন অ্যান্টি-সেমিটিজম এমনকি ফ্রান্সেও আঘাত হানে, ইহুদিদের মুক্তিদানকারী প্রথম ইউরোপিয় জাতি ছিল এরা। ৫ই জানুয়ারি, ১৮৯৫ জেনারেল স্টাফের একমাত্র ইহুদি অফিসার ক্যাপ্টেন আলফ্রেড দ্রেফাস বানোয়াট প্রমাণের ভিত্তিতে জার্মানদের কাছে গোপন তথ্য পাচারের দায়ে দোষী সব্যস্ত করা হয়; এই সময় উত্তেজিত মব চিৎকার করে বলছিল, ‘দ্রেফাসের মৃত্যু চাই! ইহুদিদের মৃত্যু চাই!’
কোনও কোনও ইহুদি ক্রিশ্চান ধর্ম গ্রহণ বা সম্পূর্ণ সেক্যুলার জীবন যাপন করার মাধ্যমে মূলধারায় মিশে যাওয়া অব্যাহত রাখে। কেউ কেউ রাজনীতিতে যোগ দিয়ে রাশিয়া ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপিয় দেশে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী নেতায় পরিণত হতে শুরু করে বা ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় সদস্য হয়ে ওঠে। অন্যরা ধরে নেয় যে জেন্টাইল সমাজে ইহুদিদের জায়গা নেই; তাদের অবশ্যই পবিত্র ভূমি যায়নে ফিরে যেতে হবে, সেখানে নতুন ইহুদি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। অন্যরা সংস্কার, রক্ষণশীল বা নিও-অর্থডক্স ইহুদিবাদের মতো একটি আধুনিকায়নের ধর্মীয় সমাধান পছন্দ করেছে। কেউ কেউ আধুনিক সমাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে প্রথাগত অর্থডক্সিকে আঁকড়ে থেকেছে। এই হারেদিমরা (‘কম্পিত জন’) নতুন বিশ্বে ইহুদিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিত ছিল, মরিয়াভাবে প্রাচীন বিশ্বকে আবার গড়ে তোলার চেষ্টা করবে তারা। এমনকি রাশিয়া বা পোল্যান্ডে ওদের পিতৃপুরুষের মতো পশ্চিম ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফারের টুপি, কালো নিকার ও কাফতান পরা অব্যাহত রেখেছিল তারা। এক বৈরী বিশ্বে বেশিরভাগই ইহুদি পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করছিল, নিশ্চিহ্নতাকে দূরে ঠেলে রাখতে সংগ্রাম করছিল তারা; এবং কোনও ধরনের পরম নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার সন্ধান করছিল।
এই মনোভাবটি মূর্ত হয়ে উঠেছিল রাশিয়ার লুবাভিচ ভিত্তিক র্যাবাই শেয়ুর যালমানের উত্তরসুরিদের বংশধারার হাতে নিয়ন্ত্রিত হাবাদ হাসিদিজমে। ১৮৯৩ সালে এই উপাধী ধারণকারী পঞ্চম রেব্বে আর. শালোম দোভ (১৮৬০-১৯২০) ইহুদিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সফর করেছেন তিনি, লিথুয়ানিয়ার মিসনাগদিমের সাথে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন, ধর্মীয় অনুসরণের অধঃগতি দেখতে পাচ্ছিলেন। ১৮৯৭ সালে ফলোঝিন, স্লোবোদকা ও মিরের মিসনাগদিক ইয়েশিভোতের আদলে হাবাদ ইয়েশিভা স্থাপন করেন তিনি। তিনিও ‘প্রভুর শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে’ তরুণদের একটা ক্যাডার গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। ‘এই শত্রুরা’ জার ও তাঁর কর্মকর্তারা ছিলেন না; এই ধরনের আন্দোলনের স্বাভাবিক ধারায় স্বধর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান হিসাবে সূচিত লুবাভিচ হাসিদিজম মৌলবাদী আন্দোলনে পরিণত হচ্ছিল। পঞ্চম রেব্বের চোখে অন্য ইহুদিরাই-মাসকিলিম, যায়নিস্ট, সমাজতন্ত্রী ইহুদি ও মিসনাগদিম- ঈশ্বরের শত্রু। তাঁর দৃষ্টিতে এরা ধর্মবিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে বিপদাপন্ন করে তুলছিল। তাঁর ইয়েশিভার ছাত্রদের বলা হত তামিমিম: ‘খাঁটিজন’। ‘রেব্বের সেনাদলের সদস্য হওয়ার’ কথা ছিল তাদের, ইহুদিবাদের টিকে থাকা নিশ্চিত করতে যারা ‘কোনও রকম আপোস বা ছাড় ছাড়াই’ যুদ্ধ করবে। মেসায়াহর আগমনের পথ তৈরি করবে তাদের সংগ্রাম
