বাইবেল ইন্সটিটিউট একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলবাদী সংগঠনে পরিণত হবে। ফোলোঝিন ইয়েশিভার মতো এটা এক ঈশ্বরহীন পৃথিবীতে আধুনিক সমাজের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের লক্ষ্যে একটি ক্যাডার গঠন করার নিরাপদ ও পবিত্র অনক্লেভ তুলে ধরেছে। আসন্ন মৌলবাদী আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে চলা রক্ষণশীল প্রটেস্ট্যান্টরা মুডিকে অনুসরণ করেছে। ১৯০২ সালে উইলিয়াম বেল রাইলি নর্থওয়েস্টার্ন বাইবেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯০৭ সালে তেল ব্যবসায়ী লিম্যান স্টুয়ার্ট বাইবেল ইন্সটিটিউট অভ লস অ্যাঞ্জেলিস স্থাপন করেন। মূলধারার বিভিন্ন গোষ্ঠীতে উদারবাদীদের কাছে নিজেদের যারা কোণঠাসা মনে করেছে একজোট হতে শুরু করেছিল তারা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের বছরে প্রথম প্রফিসি অ্যান্ড বাইবেল কনফারেন্সগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রক্ষণশীল প্রটেস্ট্যান্টরা আক্ষরিক, সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বাইবেল পাঠ করার জন্যে একত্রিত হতে পারত, হাইয়ার ক্রিটিসিজম থেকে মনকে পরিষ্কার করে নিত ও নিজেদের প্রিমিলেনিয়াল ধারণা নিয়ে আলোচনা করত। একটি ভিন্ন পরিচয় গড়ে তুলতে চলেছিল তারা এবং ক্রমবর্ধিতহারে জনাকীর্ণ হয়ে ওঠা সম্মেলনগুলো চলার সময় স্বাধীন শক্তি হিসাবে আভির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠেছিল তারা।
বিশেষ অনন্য পরিচয় সৃষ্টি ছিল আধুনিক অভিজ্ঞতার প্রতি স্বাভাবিক সাড়া। সদ্য শিল্পায়িত উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলো ছিল মেল্টিং পট। ১৮৯০ সাল নাগাদ প্রতি পাঁচজন নিউ ইয়র্কবাসীর ভেতর চারজনই হয় নতুন অভিবাসী বা অভিবাসীর সন্তান ছিল। বিপ্লবের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে প্রটেস্ট্যান্ট জাতি ছিল। এখন ডব্লুএএসপি পরিচয় যেন ‘পাপিস্ট’ প্লাবনে ধুয়ে মুছে যাবে বলে মনে হচ্ছিল। দূর্ভাগ্যজনকভাবে ভিন্ন পরিচয়ের অনুসন্ধান অনেক সময় মানুষ যার বিপরীতে নিজেকে পরিমাপ করে সেই স্টেরিওটাইপ ‘অপর’-এর বিকাশের সাথে হাত ধরাধরি করে অগ্রসর হয়। আধুনিকায়নের উত্থান-পতনের প্রতি সাড়াকে ষড়যন্ত্রের এক বিকৃত ভীতি বৈশিষ্ট্যায়িত করে চলবে এবং ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমদের গড়ে তোলা মৌলবাদী আন্দোলনসূহে তা বিশেষভাবে উপস্থিত থাকবে, যাদের প্রত্যেকে তাদের প্রতিপক্ষের বিকৃত এবং প্রায়শঃই ক্ষতিকর ইমেজ গড়ে তুলবে, অনেক সময় যাদের শয়তানসুলভ অশুভ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্টরা দীর্ঘদিন ধরে রোমান ক্যাথলিকদের ঘৃণা করে এসেছে, ডেইস্ট, ফিম্যাসন ও মরমনদের ষড়যন্ত্রের ভয়ও করেছে তারা; এদের প্রত্যেকে এক সময় বা এক সময় সমাজের ক্রিশ্চান বুনন নষ্ট করে দিচ্ছে বলে মনে হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এইসব উদ্বেগ ফের চড়া হয়ে ওঠে। ১৮৮৭ সালে প্রটেক্টিভ অ্যাসোসিয়েশন গঠন করা হয়, ২,২৫০,০০০ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া সদস্য সংখ্যা নিয়ে জাতির বৃহত্তম ক্যাথলিক বিরোধী সংস্থায় পরিণত হয় এটি। সংস্থাটি দলের লোকদের উদ্দেশে সব প্রটেস্ট্যান্টকে হত্যা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মবিরোধী সরকার উৎখাতের আহবান জানানো আমেরিকান ক্যাথলিক বিশপদের কথিত ‘প্যাস্টরাল চিঠি’ জাল করে। ১৮৮৫ সালে জোসিয়া স্ট্রং আওয়ার কন্ট্রি: ইটস পসিবল ফিউচার অ্যান্ড ইটস প্রেজেন্ট ক্রাইসিস প্রকাশ করেন, এতে ‘ক্যাথলিক হুমকিকে’ জাতির মোকবিলা করা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিপদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। ক্যাথলিকদের ভোট দেওয়ার মানে হবে আমেরিকাকে শয়তানি প্রভাবের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া; ইতিমধ্যে আমেরিকা গথ ও ভ্যান্ডালদের চেয়ে দ্বিগুন সংখ্যক রোমান্টিস্টদের স্রোতের মোকাবিলা করেছে, পঞ্চম শতাব্দীতে এরাই রোমান সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছিল। আমেরিকানরা সর্বনাশের এক ফ্যান্টাসিকে লালন করছিল; বিকৃত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তাদের নিরেট প্রতিপক্ষের উপর নামহীন ও আকারহীন ভীতি রোপনে সক্ষম করে তুলে একে এভাবে সামালযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করেছে।৩২
*
ইউরোপে ভিন্ন পরিচয় গড়ে তোলার সাথে সম্পর্কিত হয়ে ষড়যন্ত্র ভীতি ‘বৈজ্ঞানিক’ বর্ণবাদের রূপ নিয়েছিল, যা ১৯২০-র দশকের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছবে না। ব্যাপকভাবে ইহুদি জনগণের উপর কেন্দ্রিভূত ছিল তা, এটা ছিল ইউরোপিয়দের নজীরবিহীন দক্ষতার সাথে তাদের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম করে তোলা আধুনিক বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির অবদান। চিকিৎসা বিজ্ঞান বা ল্যান্ডস্কেপে উদ্যান চর্চার মতো আধুনিক তৎপরতা মানুষকে ক্ষতিকর, অনভিজাত বা অপ্রয়োজনীয় সব জিনিস মুছে ফেলতে শিখিয়েছিল। জাতীয়তাবাদ ইউরোপিয় রাষ্ট্রসমূহের প্রধান আদর্শে পরিণত হচ্ছে, এমন একটা সময়ে ইহুদিদের উত্তরাধিকার সূত্রে ও নিরাময়অযোগ্যভাবে কসমোপলিটান মনে হয়েছে। জনতার অত্যাবশ্যকীয় জীববৈজ্ঞানিক ও জেনেরিক বৈশিষ্ট্যাদি সংজ্ঞায়িত করার জন্যে তাদের গড়ে তোলা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ইহুদিদের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে নেহাতই সংকীর্ণ ছিল। নতুন জাতিগুলো নিজেদের সংজ্ঞায়িত করার সময় আপন নতুন সত্তাকে নির্ধারণ করার জন্যে ‘অপর’-কে প্রয়োজন হয়েছে তাদের; সুবিধাজনকভাবে, হাতের কাছেই ছিল ‘ইহুদি’রা। মালি যেভাবে বাগান থেকে আগাছা উপড়ে ফেলে বা শল্যচিকিৎসক কেটে ফেলে দেন ক্যান্সার তেমনিভাবে সমাজ থেকে ইহুদিদের উচ্ছেদ করতে চাওয়া আধুনিক এই বর্ণবাদ মানুষকে উন্নত বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, এমন এক দৃঢ় বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত এক ধরনের সামাজিক এঞ্জিনিয়ারিং ছিল। শত শত বছরের ক্রিশ্চান কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল এটা এবং একে একটা বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা দিয়েছিল।
