আধুনিক বিশ্বের যৌক্তিক পক্ষপাত এই সময় পাশ্চাত্য ক্রিশ্চানদের অনেকের কাছে মিথের গুরুত্ব উপলব্ধি অসম্ভব করে তুলেছিল। বিশ্বাসকে যৌক্তিক হতে হবে, মিথোসকে হতে হবে লোগোস। সত্য-কে এখন তথ্যভিত্তিক বা যৌক্তিক ছাড়া অন্য কিছু ভাবা বেশ কঠিন হয়ে উঠেছিল। এইসব নতুন বাইবেলিয় তত্ত্ব ক্রিশ্চান ধর্মের মৌল কাঠামোকেই ধ্বংস করে দিয়ে কিছুই আর অবশিষ্ট রাখবে না বলে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি হয়েছিল। আবারও এক শূন্যতা এসে হাজির হয়েছিল। ‘আমাদের সামনে কোনও অব্যর্থ মানদণ্ড না থাকলে,’ যুক্তি দেখিয়েছেন আমেরিকান মেথডিস্ট যাজক আলেক্সান্ডার ম্যাকঅ্যালিস্টার, ‘বলতে হবে আমাদের সামনে মানদণ্ড বলতে আসলে কিছুই নেই।২৪ একটি অলৌকিক ঘটনাকে বাদ দিন, সামঞ্জস্যতা দাবি করবে আপনাকে সবগুলোকেই বাদ দিতে হবে। জোনাহ আদতেই তিমির পেটে তিন দিন তিন রাত না কাটিয়ে থাকলে তবে কি ক্রাইস্ট আদৌ সমাধি থেকে উত্থিত হয়েছিলেন? প্রশ্ন তুলেছেন লুথারান প্যাস্টর জেমস রেমেস্নাইডার।২৫ বাইবেলিয় সত্যসমূহকে এভাবে উন্মুক্ত করে তোলা হলে শোভন মূল্যবোধ মিলিয়ে যাবে। মেথডিস্ট যাজক লিয়েন্ডার ডব্লু. মিচেলের চোখে হাইয়ার ক্রিটিসিজমই ব্যাপক বিস্তৃত অন্ধকার, অবিশ্বস্ততা ও সংশয়বাদের জন্যে দায়ী। ২৬ প্রেসবিটারিয়ান এম. বি. ল্যাম্বডিন একে তালাক, দুর্নীতি, চুরি, অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের হার বৃদ্ধির জন্যে দায়ী করেছেন। ২৭
মৌল ভীতি সৃষ্টি করায় যৌক্তিকভাবে হাইয়ার ক্রিটিসিজমের আর আলোচনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। ১৮৯১ সালে ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগ এনে হাইয়ার ক্রিটিসিজমের পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন দানের জন্যে উদারপন্থী প্রেসবিটারিয়ান চার্লস ব্রিগসকে নিউ ইয়র্ক প্রেসবিটারিতে বিচারের সম্মুখীন করা হলে সেই খবর নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রথম পাতায় শিরোনাম আকারে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি খালাস পাওয়ার পর একে হাইয়ার ক্রিটিসিজমের বিজয় হিসাবে প্রশংসা করে নিউ ইয়র্ক টাইমস, কিন্তু গোষ্ঠীর সাধারণ সভা এই রায়কে বাতিল করে গির্জা থেকে ব্রিগসকে সাময়িক বরখাস্ত করে। বিচার ছিল তিক্ত ও উগ্র; এমনি হট্টগোল গোটা গোষ্ঠীকেই সরাসরি দুই ভাগ করে দিয়েছিল। পরে দুইশো প্রেসবিটারির ভেতর ভোটাভুটি হলে নব্বই ভাগই ব্রিগসের মতের বিরোধিতা করে। এটা ছিল এই সময়ের অসংখ্য ধর্মদ্রোহীতার বেশি প্রচারণা লাভকারী একটিমাত্র, তখন একের পর এক উদারপন্থীকে গোষ্ঠী থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।
১৯০০ সাল নাগাদ গোলমাল থিতিয়ে এসেছে বলে মনে হয়েছিল। হাইয়ার ক্রিটিসিজমের ধ্যারণা যেন সব জায়গায় প্রাধান্য বিস্তার করছিল, উদারবাদীরা তখনও গোষ্ঠীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ অধিকার করেছিলেন, আর রক্ষণশীলরা যেন স্তব্ধ ও নিশ্চুপ হয়েছিল। কিন্তু এই আপাত শন্তি ছিল প্রতারণামূলক। এই সময়ের পর্যবেক্ষকরা সচেতন ছিলেন যে, প্রায় সমস্ত গোষ্ঠীর অভ্যন্তরেই-প্রেসবিটারিয়ান, মেথডিস্ট, ডিসাইপলস, এপিস্কোলিয়ান, ব্যাপ্টিস্ট—দুটো ভিন্ন ‘চার্চ’ আবির্ভূত হয়েছিল, ‘পুরোনো’ ও ‘নতুন’ দৃষ্টিভঙ্গিতে বাইবেল পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছিল এগুলো।২৮
কোনও কোনও ক্রিশ্চান আসন্ন সংগ্রামের জন্যে এরই মধ্যে সংগঠিত হতে শুরু করেছিল। ১৮৮৬ সালে হাইয়ার ক্রিটিসিজমের শিক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে পুনর্জাগরণবাদী ডিউইট মুডি (১৮৩৭-৯৯) শিকাগোয় মুডি বাইবেল ইন্সটিটিউট স্থাপন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ‘গ্যাপ-ম্যান’-দের একটা ক্যাডার তৈরি করা যারা যাজক ও সাধারণ মানুষের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে তাঁর বিশ্বাস মতে জাতিকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে আসা মিথ্যা ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে। মুডিকে আমেরিকান মৌলবাদের জনক অভিহিত করা হয়েছে। প্রিন্সটনের মতো তাঁর বাইবেল ইন্সটিটিউট রক্ষণশীল ক্রিশ্চান ধর্মের ঘাঁটিতে পরিণত হবে। কিন্তু হজ বা ওয়ারফিল্ডদের চেয়ে ডগমার বিষয়ে কম আগ্রহী ছিলেন মুডি। তাঁর বাণী ছিল সহজ ও প্রাথমিকভাবে আবেগঘন: পাপপূর্ণ জগৎ ক্রাইস্ট কর্তৃক রক্ষা পেতে পারে। মুডির অগ্রাধিকার ছিল আত্মার মুক্তি, তাঁর বিশ্বাস যাই হোক না কেন পাপীদের রক্ষা করার কাজে যেকোনও ক্রিশ্চানের সাথে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ছিলেন তিনি সামাজিক সংস্কারের বেলায় তিনি উদারপন্থীদের সাথে একমত ছিলেন: তাঁর ইন্সটিটিউটের স্নাতকদের দরিদ্রদের পক্ষে মিশনারিতে পরিণত হতে হত। কিন্তু মুডি ছিলেন প্রিমিলেনিয়ালিস্ট, যুগের ঈশ্বরবিহীন ধ্যানধারণা বিশ্বের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করতেন। উদারপন্থীদের বিশ্বাস মতো পরিস্থিতির মোটেই উন্নতি ঘটছে না; বরং প্রতিটি দিনই অবনতি ঘটছে। ২৯ ১৮৮৬ সালে তাঁর বাইবেল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার বছরে, শিকাগোর হেমার্কেট স্কয়ারে গোটা জাতিকে স্তব্ধ করে দেওয়া এক করুণ ঘটনা ঘটে। ট্রেড ইউনিয়নের র্যালি অনুষ্ঠানের সময় মিছিলকারীরা পুলিসের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে বোমা বিস্ফোরণে সাত জন পুলিস প্রাণ হারায়, আহত হয় সত্তর জন। হেমার্কেট দাঙ্গা যেন শিল্পায়িত সমাজের সমস্ত অশুভকে ধারণ করেছিল। মুডি একে কেবল প্রলয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গিতেই লক্ষ করতে পেরেছিলেন। ‘এইসব মানুষকে ইভাঞ্জোলাইজ করতে হবে,’ ভবিষ্যদ্বাণী করেন তিনি, ‘নইলে কমিউনিজম ও ধর্মহীনতার প্রভাব ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে এই দেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করবে যা এর আগে কখনও দেখা যায়নি।
