প্রিন্সটন ধর্মতত্ত্বে হতাশার ছাপ রয়েছে। ‘ধর্মকে জীবন রক্ষার জন্যে বৈজ্ঞানিক মানুষের এক বিশাল শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে,’ ১৮৭৪ সালে ঘোষণা করেছিলেন চার্লস হজ।১৮ বৈজ্ঞানিক যুক্তির পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারী ক্রিশ্চানদের কাছে নিশ্চয়ই প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্ব বাইবেলের আক্ষরিক অর্থের বিরোধী মনে হতে শুরু করায় উদ্বেগজনক বোধ হয়েছিল। বেকনবাদী হজের কাছে ডারউইনবাদ ছিল স্রেফ বাজে বিজ্ঞান। তিনি যত্নের সাথে অরিজিন পাঠ করেছেন, কিন্তু ঈশ্বরের উপর কোনও রকম নির্ভরশীলতা ছাড়াই আকস্মিকভাবে প্রকৃতির জটিল নকশা আবির্ভূত হওয়ার ডারউইনীয় প্রস্তাব গুরুত্বের সাথে নিতে পারেননি। এভাবে তিনি আসন্ন প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদের রুদ্ধ মানসিক অবস্থাকে প্রকাশ করেছেন: হজ তাঁর বিশ্বাস থেকে ভিন্ন কোনও বিশ্বাসকেই স্রেফ বৈধ মেনে নিতে পারেননি। ‘যেকোনও সাধারণভাবে গঠিত মানুষের পক্ষে,’ জোরের সাথে বলেছেন তিনি, ‘চোখ কোনও পরিকল্পনার অংশ নয়, বিশ্বাস করা কঠিন।১৯ মানুষের ‘সুপ্রতিষ্ঠিত সত্যের সাথে বিরোধপূর্ণ সব ধরনের দর্শনীয় প্রকল্প ও তত্ত্বের বিরোধিতা করার দায়িত্ব রয়েছে—যেমন ডারউনিবাদ।’ এটা ছিল ‘কাণ্ডজ্ঞানে’র কাছে আবেদন; ঈশ্বর মানুষের মনকে ‘এমন প্রবৃত্তি দান করেছেন যা অব্যর্থ,’ ডারউইন এর বিরোধিতা করলে, তাঁর প্রকল্প অগ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই তাকে বাতিল করতে হবে।২° প্রিন্সটনে আবির্ভূত বৈজ্ঞানিক ক্রিশ্চান ধর্ম দুই নৌকায় পা দিয়ে বসেছিল। হজ প্রাচীন রক্ষণশীল কায়দায় আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য যুক্তির পথে বাধা খাড়া করানোর প্রয়াস পাচ্ছিলেন, একে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে চাননি। কিন্তু সব পৌরাণিক সত্যকে লোগোইয়ের পর্যায়ে নামিয়ে এনে প্রাচীন বিশ্বের আধ্যাত্মিকতার উপর আঘাত হেনেছেন তিনি। তাঁর ধর্মতত্ত্ব ছিল বাজে বিজ্ঞান ও অপর্যাপ্ত ধর্ম।
কিন্তু প্রিন্সটন টিপিক্যাল ছিল না। হজ ও ওয়ারফিল্ড যেখানে ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক বিশ্বাস হিসাবে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে মতবাদগত সমরূপতার উপর বিপুল গুরুত্ব আরোপ করছিলেন, সেখানে পোড়খাওয়া উচ্ছেদবাদী হেনরি ওয়ার্ড বীচার (১৮১৩-৮৭)-এর মতো অন্য প্রটেস্ট্যান্টরা আরও উদার অবস্থান গ্রহণ করছিলেন।২১ বীচারের চোখে ডগমা ছিল গৌণ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ, ভিন্ন ধর্মতত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করার দায়ে কাউকে শান্তি দান অক্রিশ্চান সুলভ। উদারবাদীরা ডারউইনবাদ বা বাইবেলের হাইয়ার ক্রিটিসিজমের মতো আধুনিক জ্ঞানিক উদ্যোগের প্রতি উদার ছিল। বীচারের চোখে ঈশ্বর কোনও দূরবর্তী, বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নন, বরং এই মর্ত্যেরই প্রাকৃতিক বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় উপস্থিত আছেন, সুতরাং, বিবর্তনকে সৃষ্টির প্রতি ঈশ্বরের অবিরাম উদ্বেগ হিসাবে দেখা যেতে পারে। মতবাদগত সমরূপতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ক্রিশ্চান ভালোবাসার চর্চা। উদার প্রটেস্ট্যান্টরা বস্তি ও শহরে সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বর উপর জোর দিচ্ছিল, তাদের বিশ্বাস ছিল নিবেদিত প্রাণ বদান্যতার ভেতর দিয়ে তারা এই বিশ্বে ঈশ্বরের ন্যায়-রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। আশাবাদী ধর্মতত্ত্ব ছিল এটা, আধুনিকতার সুফল ভোগ করতে শুরু করা মধ্যবিত্ত সমাজের কাছে আবেদন সৃষ্টি করেছিল। ১৮৮০-র দশক নাগাদ উত্তরের অনেক রাজ্যের প্রধান প্রটেস্ট্যান্ট স্কুলে এই নতুন ধর্মতত্ত্ব পাঠ করানো শুরু হয়েছিল। ইভোলিউশন অ্যান্ড রিলিজিয়নে (১৮৯৭) জন বিস্কন ও থ্রু নেচার টু গড-এ (১৮৯৯) জন ফিস্ক-এর মতো ধর্মবেত্তাগণ বিশ্বাস করেছিলেন যে, বিজ্ঞান ও ধর্মের মাঝে কোনও বৈরিতা থাকতে পারে না। দুজনই পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরের আবির্ভাব আসন্ন বলেছেন; মহাবিশ্বের প্রতিটি হৃদস্পন্দন ঈশ্বরের উপস্থিতি তুলে ধরে। গোটা ইতিহাস জুড়ে মানুষের আধ্যাত্মিক ধারণা বিবর্তিত হয়ে আসছে, এবং এখন মানুষ এক নতুন বিশ্বের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে, যেখানে নারী-পুরুষ সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করবে যে তথাকথিত ‘অতিপ্রাকৃত’ ও লৌকিকের ভেতর কোনও পার্থক্য নেই। ঈশ্বরের সাথে গভীর একাত্মতা উপলব্ধি করবে তারা, পরস্পরের সাথে শান্তিতে বসবাস করবে।
সব মিলেনিয়াল দর্শনের মতোই উদার ধর্মতত্ত্ব হতাশ হতে বাধ্য ছিল। বৃহত্তর ছন্দ অর্জন নয়, বরং গভীরভাবে বেকায়দায় পড়ে গেছে বলে আবিষ্কার করেছিল আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্টরা। মতপার্থক্য গোটা গোষ্ঠীকেই ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছিল। বিবর্তন নয়, উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিরোধের মুল কারণ ছিল হাইয়ার ক্রিটিসিজম। উদারপন্থীদের বিশ্বাস ছিল, বাইবেল সংক্রান্ত নতুন তত্ত্বগুলো কোনও কোনও প্রাচীন বিশ্বাসকে খাট করে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেগুলো ঐশীগ্রন্থের আরও গভীর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু ঐতিহ্যবাদীদের কাছে ‘হাইয়ার ক্রিটিসিজম’ ছিল ভীতিকর পরিভাষা। প্রাচীন নিশ্চয়তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলা আধুনিক শিল্পায়িত সমাজের যা কিছু ভুল তার মূর্ত প্রতীক মনে হয়েছে একে। এই সময় নাগাদ পপুলারাইজাররা নতুন ধারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে এসেছিল। বেশ ভালোরকম বিভ্রান্তির ভেতর ক্রিশ্চানরা আবিষ্কার করেছিল যে, পেন্টাটিউক আসলে মোজেসের রচনা নয়, আবার সালমও ডেভিড লিখেননি; জেসাসের কুমারী মায়ের গর্ভে জন্মলাভ নেহাতই কথার কথা, এবং মিশরের দশটি প্লেগ ছিল সম্ভব পরে অলৌকিক কাণ্ড হিসাবে ব্যাখ্যা করা প্রাকৃতিক বিপর্যয়।২২ ১৮৮৮ সালে ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক হাফ্রে ওয়ার্ড রবার্ট এলসমেয়ার প্রকাশ করেন, যেখানে হাইয়ার ক্রিটিসিজমের কারণে বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যাওয়ায় ব্রত থেকে ইস্তফা দিয়ে লন্ডনের ইস্ট এন্ডে সমাজ সেবায় নিয়োজিত এক তরুণ যাজকের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। উপন্যাসটি বেস্ট সেলারে পরিণত হয়ে, যা অনেককেই নায়কের সন্দেহের সাথে নিজেকে একাত্ম করতে পারার ইঙ্গিত দেয়। রবার্টের স্ত্রী যেমন বলেছে, ‘গস্পেল ইতিহাসের মতো সত্যি না হলে তা কীভাবে সত্যি হতে পারে বা তার কোনও মূল্য থাকতে পারে, আমার মাথায় আসে না।’২৩
