অষ্টাদশ শতকের স্কটিশ অভিজ্ঞতাবাদী ডেভিড হিউম গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যসহ একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন: তিনি চাননি তাঁর দর্শন পাঠকদের নৈতিক আচরণকে প্রভাবিত করুক। কিন্তু অ্যাক্সিয়াল যুগের ভারতে রূপান্তরকারী না হলে জ্ঞানের কোনও তাৎপর্য ছিল না। ধম্ম ছিল কাজের আদেশব্যঞ্জক এবং অনাত্মার মতবাদ কোনও বিমূর্ত দার্শনিক প্রস্তাবনা ছিল না, বরং বৌদ্ধদের এমন আচরণ দাবি করত যেন অহমের কোনও অস্তিত্ব নেই। এর নৈতিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, ‘সত্তা’র ধারণাই কেবল ‘আমি ও আমার’ সম্পর্কিত অদক্ষ চিন্তাভাবনা সৃষ্টি ও স্বার্থপর আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে না; অহমবাদকে তর্কসাপেক্ষে সকল অশুভের উৎস হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে; সত্তার সাথে অতিরিক্ত সংযোগ ঈর্ষা বা শত্রুর প্রতি ঘৃণা, প্রতারণা, হামবড়া ভাব, অহঙ্কার, নিষ্ঠুরতা এবং সত্তা আক্রান্ত বোধ করলে, সহিংসতা ও অন্যদের বিনাশ ডেকে আনতে পারে। পশ্চিমাবাসীরা প্রায়শঃই বুদ্ধের অনাত্মার মতবাদকে নাস্তিবাদী ও হতাশাব্যাঞ্জক মনে করে, কিন্তু সর্বোত্তম অবস্থায় অ্যাক্সিয়াল যুগে সৃষ্ট সবগুলো মহান বিশ্বধর্ম দরুণ ক্ষতিকারক সর্বগ্রাসী ভীতকারী আহমকে দমন করতে চেয়েছে। বুদ্ধ অবশ্য আরও বেশি অগ্রসর ছিলেন। তাঁর অনাত্মার মতবাদ সত্তাকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়নি। তিনি স্রেফ সত্তার অস্তিত্ব অস্বীকার গেছেন। একে স্থায়ী বাস্তবতা হিসাবে কল্পনা করা ভুল ছিল। এ জাতীয় যেকোনও ভ্রান্ত ধারণা আমাদের দুঃখ-কষ্টের চক্রের সঙ্গে আটকে রাখা সেই অজ্ঞতারই লক্ষণ।
যেকোনও বৌদ্ধ শিক্ষার মতোই অনাত্মা কোনও দার্শনিক মতবাদ ছিল না, মূলত তা ছিল বাস্তব ভিত্তিক। যোগ ও অভিনিবেশের মাধ্যমে একজন শিষ্য অনাত্মার ‘প্রত্যক্ষ’ জ্ঞান অর্জন করতে পারলে অহমবাদের বেদনা ও বিপদ হতে নিষ্কৃতি পাবে সে, তখন তা যৌক্তিক অসম্ভাব্যতায় পরিণত হবে। অ্যাক্সিয়াল দেশগুলোয় আমরা দেখেছি, স্বর্গ হতে নির্বাসিত এবং জীবনকে অর্থ ও মূল্য প্রদানকারী পবিত্র মাত্রা হতে বঞ্চিত মানুষ সহসা নিঃসঙ্গ, দিশাহারা বোধ করেছে। এক নতুন বাজার অর্থনীতিতে চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জগতে নিরাপত্তাহীনতা হতেই তাদের অধিকাংশ বেদনার সৃষ্টি হয়েছিল। বুদ্ধ তাঁর ভিক্ষুদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, অন্যদের ক্ষতি সাধন করে দাপানো, তোষামোদ করা, ও ফাঁপিয়ে তুলে বাঁচানোর মতো তাদের কোনও ‘সত্তা’ নেই। সন্ন্যাসী অভিনিবেশের অনুশীলনে অভ্যস্থ হয়ে গেলে বুঝতে পারবে, আমরা যাকে ‘সত্তা’ বলি সেটা কত ক্ষণস্থায়ী। তখন আর এইসব চলমান মানসিক অবস্থায় নিজের অহমকে মেলাবে না সে, সেগুলোর সঙ্গে একাত্ম হবে না। নিজের আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও কামনাগুলোকে তার সঙ্গে সম্পর্কহীন দূরবর্তী ঘটনা হিসাবে দেখতে শিখবে। একবার এই পক্ষপাতহীনতা ও প্রশান্তি অর্জন করার পর, দ্বিতীয় হিতোপদেশ শেষে পঞ্চভিক্ষুর কাছে ব্যাখ্যা দিলেন বুদ্ধ, নিজেকে আলোকনের উপযোগি হয়ে উঠতে দেখবে সে। ‘তার লোভ মিলিয়ে যাচ্ছে, বাসনা অদৃশ্য হয়ে যাবার পর হৃদয়ের মুক্তি অনুভব করে সে।’ লক্ষ্য অর্জন করেছে সে, আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার পর বুদ্ধ যেমন করেছিলেন তেমনি বিজয় উল্লাস প্রকাশ করতে পারে সে। ‘অবশেষে পবিত্র জীবন যাপন করা হয়েছে। যা করার ছিল, সম্পাদন করা হয়েছে; আর কিছুই করণীয় নেই।’[২৭]
এবং প্রকৃতপক্ষে পঞ্চ ভিক্ষু বুদ্ধের অনাত্মার ব্যাখ্যা শোনার পর পাঁচজনই পরিপূর্ণ আলোকপ্রাপ্ত হয়ে আরাহান্তে পরিণত হলেন। টেক্সট আমাদের বলছে, তাঁর শিক্ষা তাঁদের হৃদয়কে আনন্দে পরিপূর্ণ করে দিয়েছে।[২৮] অদ্ভুত মনে হতে পারে: আমরা যে সত্তার স্বপ্ন দেখি সেটা অস্তিত্বহীন জেনে কেন এত খুশি হবেন তাঁরা? বুদ্ধ জানতেন অনাত্মা ভীতিকর হতে পারে। বহিরাগত কেউ প্রথমবারের মতো এই মতবাদ শুনে ‘আমি নিশ্চিহ্ন, ধ্বংস হয়ে যাব, আমার আর অস্তিত্ব থাকবে না,’[২৯] ভেবে শঙ্কিত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু পালি টেক্সট দেখায়, লোকে পাঁচ ভিক্ষুর মতো ব্যাপক স্বস্তি ও আনন্দের সাথে অনাত্মাকে গ্রহণ করেছে। এতে ‘প্রমাণ’ হয়েছে, এটা সত্যি। মানুষ যখন অহমের অস্তিত্ব নেই ভেবে জীবন যাপন করে, তখন তারা আবিষ্কার করে, তারা আগের চেয়ে খুশি। আমাদের একান্ত মহাবিশ্ব হতে সত্তাকে আসনচ্যুত করে সেখানে অন্যান্য সত্তাকে স্থাপন করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত ‘অপরিমেয়’র অনুশীলনের অনুরূপ সত্তার বিস্তৃতি অনুভব করেছে তারা। অহমবাদ সংকীর্ণকারী। আমরা স্বার্থপর দৃষ্টি কোণে দেখার সময় আমাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ থাকে। আমাদের মর্যাদা ও বেঁচে থাকার তীব্র উদ্বেগ হতে সৃষ্ট লোভ, ঘৃণা ও নাগালের বাইরের যাপিত জীবন কাঠামো মুক্তি নির্দেশক। বিমূর্ত ধারণা হিসাবে উত্থাপিত হলে অনাত্মাকে অনুজ্জ্বল মনে হতে পারে, কিন্তু অভিজ্ঞতায় নেওয়া হলে মানুষের জীবন পাল্টে দেয়। যেন অহমের অস্তিত্ব নেই, এমনিভাবে জীবন যাপন করে মানুষ অহমবাদকে জয় করেছে বলে আবিষ্কার করেছে এবং অনেক ভালো বোধ করেছে। একজন যোগির ‘প্রত্যক্ষ জ্ঞান’ দিয়ে অনাত্মাকে উপলব্ধি করে তারা এক সমৃদ্ধ, পূর্ণ অস্তি ত্বে পৌঁছেছে। সুতরাং অনাত্মা নিশ্চয়ই আমাদের মানবীয় অবস্থা সম্পর্কে কিছু জানায়। যদিও সত্তার অস্তিত্ব না থাকার বিষয়টি আমরা হাতে কলমে প্রমাণ করতে পারব না।
