ধারাক্রমে কোনও স্থির সত্তা নেই। প্রতিটি কাড়া অন্যটির ওপর নির্ভরশীল ও সরাসরি ভিন্ন কিছুর দিকে চালিত করে। এটা মানুষের জীবনের অনিবার্য সত্য হিসাবে বুদ্ধের দেখা ‘হয়ে ওঠার’ এক নিখুঁত প্রকাশ। আমরা সব সময়ই ভিন্ন কিছু হতে চাই। এক নতুন ধরনের সত্তার জন্যে যুদ্ধ করছি। সত্যিকার অর্থেই দীর্ঘদিন একই অবস্থায় থাকতে পারি না। প্রতিটি সাংখারা পরবর্তীটিকে জায়গা ছেড়ে দেয়: প্রতিটি অবস্থা স্রেফ অন্যটির ভূমিকা। সুতরাং, জীবনের কোনও কিছুকেই স্থিতিশীল হিসাবে দেখা যাবে না। ব্যক্তিকে একটি প্রক্রিয়া হিসাবে দেখাতে হবে, অপরিবর্তনীয় কোনও সত্তা নয়। একজন ভিক্ষু ধারাক্রম নিয়ে ধ্যান করার সময় যোগির দৃষ্টিতে একে দেখতে পান, প্রতিটি শিহরণের উত্থান-পতনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মনোযোগি হয়ে ওঠেন, তখন কোনও কিছুর উপর ভরসা করা যাবে না, সমস্ত কিছুই অস্থায়ী (অনিক্ক), এই সত্যের ‘প্রত্যক্ষ জ্ঞান’ অর্জন করেন তিনি। তিনি তখন কার্য ও কারণের এই অন্তহীন ধারাক্রম হতে নিজেকে মুক্ত করার জন্যে দ্বিগুণ প্রয়াস চালাবেন।[২১]
অবিরাম আত্মমূল্যায়ন ও দৈনন্দিন জীবনের উত্থান-পতনের দিকে মনোযোগ এক ধরনের শীতল নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়। ধ্যানে অভিনিবেশের দৈনিক অনুশীলন অব্যাহত থাকলে তা ভিক্ষুকে আরও গভীরে প্রোথিত ব্যক্তিত্ব ও যৌক্তিক বিশ্লেষণে উপস্থাপযোগ্য ব্যক্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি এনে দেয়। ব্রাহ্মণদের কৃচ্ছতার ঘোরের জন্যে অবকাশ ছিল না বুদ্ধের। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, তাঁর ভিক্ষুদের সংযমের সঙ্গে চলতে হবে এবং আবেগ প্রকাশ হতে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু অভিনিবেশ ভিক্ষুকে তাঁর আচরণের নৈতিকতা সম্পর্কে আরও সজাগ করে তোলে। তিনি তখন তার ‘অদক্ষ’ কর্মকাণ্ড কেমন করে অন্যদের ক্ষতি সাধন করতে পারে এবং তাঁর অনুপ্রেরণাও কেমন করে ক্ষতিকারক হতে পারে সেটা লক্ষ করেন। তো, বুদ্ধ উপসংহার টেনেছেন, আমাদের ইচ্ছা কম্ম এবং তার পরিণাম রয়েছে।[২২] অচেতন বা সচেতন ইচ্ছা, যা আমাদের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ যোগায় সেগুলো মানসিক কাজ যা যে কোনও বাহ্যিক কাজকর্মের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। চেতনা হিসাবে (ইচ্ছা : পছন্দ) কম্মের পুনঃসংজ্ঞা ছিল বিপ্লবাত্মক। নৈতিকতার সামগ্রিক প্রশ্নকে তা গভীর করে তুলেছে। যা কিনা এখন মনে আর হৃদয়ে স্থাপিত, বাহ্যিক আচরণের কোনও ব্যাপার হতে পারবে না।
কিন্তু অভিনিবেশ (সাতি) বুদ্ধকে আরও ভিন্নতর উপসংহারে চালিত করেছে। পাঁচ জন ভিক্ষুর ‘স্রোতে প্রবেশকারী’ হবার তিনদিন পর হরিণ বনে দ্বিতীয় হিতোপদেশ দেন বুদ্ধ। এখানে তিনি তাঁর অনাত্মা (সত্তাহীনতা) সম্পর্কিত অনন্য মতবাদের ব্যাখ্যা দেন তিনি।[২৩] মানবীয় ব্যক্তিত্বকে তিনি পাঁচটি ‘স্তূপ’ বা ‘উপাদানে’ (খণ্ড): ভাগ করেন তিনিঃ দেহ, অনুভব, ধারণা, আচরণ (স্বোচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত) ও সচেতনতা। ভিক্ষুদের প্রতিটি খণ্ডের বিষয় ভিন্নভাবে বিবেচনা করার পরামর্শ দেন। যেমন ধরা যাক আমাদের দেহ বা অনুভূতি প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। এতে করে আমাদের বেদনা যোগাচ্ছে। আমাদের তা হতাশ করে তুলছে। আমাদের আচরণ ও ধারণা সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। প্রতিটি খণ্ড দুঃখের শিকার বলে ত্রুটিপূর্ণ ও ক্ষণস্থায়ী। এর পক্ষে অসংখ্য ভাববাদী ও যোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেই সত্তার অনুসন্ধান বা ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে না। এটা কি সত্যি নয়, শিষ্যদের জিজ্ঞেস করলেন বুদ্ধ, প্রতিটি খণ্ড পরখ করার পর একজন সৎ ব্যক্তি নিজেকে এর সাথে পুরোপুরি একাত্ম করতে পারছে না বলে আবিষ্কার করবে, কারণ এটা বড় বেশি অসন্তে াষজনক? সে বলতে বাধ্য হবে: ‘এটা আমার নয়, আমি আসলে যা এটা তা নয়: এটা আমার সত্তা নয়।[২৪] কিন্তু বুদ্ধ স্রেফ চিরন্তন, পরম অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করেননি। এবার তিনি ঘোষণা করলেন, সিথিশীল নিম্নস্তরের সত্তা বলেও কিছু নেই। ধারা যেমন দেখায়, প্রতিটি সচেতন সত্তা এক অবিরাম পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে: পুরুষ বা নারী স্রেফ ক্ষণস্থায়ী পরিবর্তনশীল অস্তিত্বের ধারাক্রমমাত্র।
বুদ্ধ তাঁর গোটা জীবন এই বার্তাই প্রচার করে গেছেন। সপ্তদশ শতকের ফরাসি দার্শনিক দেকার্তে যেখানে ঘোষণা দেবেন, ‘আমি ভাবি তাই আমি অস্তিত্বশীল’, সেখানে বুদ্ধ সম্পূর্ণ বিপরীত উপসংহারে পৌঁছেছিলেন। নিজের আবিষ্কৃত অভিনিবেশের যোগী পদ্ধতিতে তিনি যত ভেবেছেন ততই পরিষ্কার হয়ে গেছে যে আমরা যাকে ‘সত্তা’ বলি তা আসলে একটা বিভ্রম। তাঁর দৃষ্টিতে, আমরা যত ঘনিষ্ঠভাবে আমাদের যাচাই করব ততই স্থায়ী সত্তা হিসাবে কোনও কিছুকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে উঠবে। মানুষের ব্যক্তিত্ব এমন স্থবির অস্তিত্ব নয় যেখানে ঘটনা সংঘটিত হয়। যোগীর অনুবীক্ষণসুলভ বিশ্লেষণের অধীনে স্থাপন করা হলে প্রতিটি ব্যক্তিই একটি প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে। ব্যক্তিত্বের বর্ণনা দেওয়ার বেলায় জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড বা খরস্রোতা ঝর্নার উপমা দিতে পছন্দ করতেন বুদ্ধ। এর এক ধরনের পরিচয় থাকলেও কোও দুটি বিশেষ মুহূর্তে এক নয়। প্রতিটি সেকেন্ডে আগুন ভিন্ন কিছু, নিভে গিয়ে আবার নিজেকে সৃষ্টি করেছে–ঠিক মানুষের মতো। দরাজ হেসে মানুষের মনকে বনেবাদারে ছুটে বেড়ানো বানরের সঙ্গে তুলনা করেছেন বুদ্ধ: ‘একটা ডাল আঁকড়ে ধরে, পরক্ষণে ওটা ছেড়ে আরেকটা ধরে।’[২৫] আমরা যাকে ‘সত্তা হিসাবে অনুভব করি তা আসলে স্রেফ সুবিধাজনক পরিভাষা, কারণ আমরা অবিরত বদলে যাচ্ছি। একইভাবে দুধ পর্যায়ক্রমে দই, মাখন, ঘি এবং ঘিয়ের সূক্ষ্ম নির্যাসে পরিণত হতে পারে। এইসব পরিবর্তনের কোনওটাকে ‘দুধ’ বলার কোনও যুক্তি নেই, যদিও সেটা বললে ঠিক হওয়ার একটা ভাব থাকে। [২৬]
