বুদ্ধ বিশ্বাস করতেন, স্বার্থহীন জীবন নারী ও পুরুষকে নিব্বানার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। একেশ্বরবাদীরা বলবে, এটা তাদের ঈশ্বরের সত্তায় পৌঁছে দেবে। কিন্তু একজন ব্যক্তিরূপ উপাস্যের ধারণাকে খুবই সীমাবদ্ধ মনে করেছেন বুদ্ধ, কারণ এটা বোঝায়, পরম সত্তা স্রেফ আরেকটা সত্তা মাত্র। নিব্বানা কোনও ব্যক্তি বা স্বর্গের মতো কোনও জায়গা নয়। বুদ্ধ সব সময় কোনও পরম নিয়ম বা মহা সত্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন, কেননা সেটা আঁকড়ে থাকার আরেকটা বস্তু, আরেকটা শৃঙ্খল, আলোকনের পথে আরেকটা বিঘ্ন হয়ে উঠতে পারে। সত্তার মতবাদের মতো ঈশ্বরের ধারণাও অহমকে উস্কে দেওয়া ও ফাঁপিয়ে তোলার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। ইহুদি, ক্রিশ্চান ও ইসলামের সবচেয়ে স্পর্শকাতর একেশ্বরবাদীগণ এই বিপদ সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠবে ও ঈশ্বর প্রসঙ্গে এমনভাবে কথা বলবে যা নিব্বানা সম্পর্কে বুদ্ধের সংযমের স্মারক। তারা জোর দিয়ে একথাও বলব যে, ঈশ্বর স্রেফ আরেকটা সত্তা মাত্র নন; ‘সত্তা’ সম্পর্কে আমাদের ধারণা এত সীমিত যে ঈশ্বর অস্তি ত্বহীন, অর্থাৎ ‘তিনি’ আসলে কিছু না বলাটাই অনেক সঠিক। কিন্তু অধিকতর জনপ্রিয় স্তরে এটা নিশ্চিতভাবে সত্যি যে, ‘ঈশ্বর’কে প্রায়শঃই ‘তাঁর’ উপাসকদের কল্পনা ও পছন্দ মাফিক প্রতিমায় পরিণত করা হয়। ঈশ্বরকে আমরা আমাদেরই মতো পছন্দ-অপছন্দ সম্পন্ন করলে ‘তাঁকে’ দিয়ে আমাদের সবচেয়ে সংকীর্ণ, স্বার্থপর ও এমনকি ভীষণ আশা, শঙ্কা আর কুসংস্কারকে মেনে নিতে বাধ্য করা খুবই সহজ হয়ে যায়। এই সীমাবদ্ধ ঈশ্বরের এভাবে ইতিহাসের বেশ কিছু জঘন্য ধর্মীয় নিপীড়নে অবদান রেখেছেন। বুদ্ধ আমাদের নিজস্ব সত্তায় পবিত্র অনুমোদনের সীলমোহর দানকারী উপাস্যে বিশ্বাসকে ‘অদক্ষ’ বর্ণনা করতেন; এটা কেবল বিশ্বাসীকে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক অহমবাদেই বন্দি করে রাখবে, যেটা তার ছাড়িয়ে যাবার কথা। আলোকন দাবি করে, আমরা তেমন কোনও মেকি জাঁক প্রত্যাখ্যান করব। মনে হয় ‘অনাত্মার’ প্রত্যক্ষ যোগ উপলব্ধি অন্যতম প্রধান উপায় যার মাধ্যমে আদি বৌদ্ধরা নিব্বানা প্রত্যক্ষ করেছিল। এবং সত্যি সত্যিই অ্যাক্সিয়াল যুগের ধর্মবিশ্বাসগুলো কোনও না কোনওভাবে জোর দিয়েছে যে, কেবল সম্পূর্ণ আত্মপরিত্যাগ অনুশীলন করেই আমরা নিজেদের সম্পূর্ণ করে তুলতে পারব। পরকালে আয়েসী অবকাশ লাভের মতো কোনও কিছুর ‘সন্ধানে’ ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ স্রেফ আসল উদ্দেশ্য ছাড়িয়ে যাওয়া। হরিণ বাগিচায় আলোকনপ্রাপ্ত পাঁচ ভিক্ষু গভীরতর স্তরে এবিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন।
এবার অন্যদের কাছে ধম্ম পৌঁছে দিতে হবে তাঁদের। স্বয়ং বুদ্ধ যেমন উপলব্ধি করেছিলেন, দুঃখের প্রথম মহান সত্যি উপলব্ধির মানে অন্যের দুঃখ- কষ্টে সহানুভূতিশীল হওয়া; অনাত্মার মতবাদ বোঝায়, একজন আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের জন্যে নয় বরং অন্যদের জন্যে বেঁচে থাকবে। এখন আরাহান্তের সংখ্যা ছয় জন, কিন্তু বেদনায় আবৃত বিশ্বে আলোক পৌঁছে দেওয়ার জন্যে সংখ্যাটা খুবই কম। তারপর যেন জাদুমন্ত্র বলে বুদ্ধের ছোট সংঘে নতুন সদস্যের জোয়ার দেখা দিল। প্রথমজন ছিলেন বারানসির এক ধনী বণিকের ছেলে ইয়াসা। তরুণ গৌতমের মতো বিলাসিতায় জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি, কিন্তু একরাতে ঘুম থেকে জেগে দেখেন খাটের চারপাশে ঘুমাচ্ছে তাঁর ভৃত্যরা, ওদের এমন কুৎসিত, বিশ্রী ভঙ্গি দেখে বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন তিনি। নাদান কথার মতো অন্যান্য টেক্সট কোনও রকম দুঃখ প্রকাশ ছাড়াই তরুণ গৌতম সম্পর্কে একই কাহিনী বলার ব্যাপারটি কাহিনীর আদি আদর্শ প্রকৃতি তুলে ধরে। গাঙ্গেয় অঞ্চলে অসংখ্য মানুষের অনুভূত বিচ্ছিন্নতাকেই বর্ণনা করেছেন ইয়াসা। পালি টেক্সট আমাদের বলছে, অন্তর থেকে বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠা ইয়াসা যন্ত্রণায় চিৎকার করে বললেন, ‘এ যে ভয়ঙ্কর! মারাত্মক।’ সহসা জগৎ অশ্লীল, অর্থহীন মনে হলো, অসহনীয়ও বটে। অবিলম্বে ভালো কিছুর সন্ধানে ‘সামনে বাড়ার’ সিদ্ধান্ত নিলেন ইয়াসা। একজোড়া সোনার চপ্পল পায়ে গলিয়ে পা টিপেটিপে বাবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিড়বিড় করে ‘ভয়ঙ্কর! মারাত্মক! বলতে বলতে হরিণ বাগিচার উদ্দেশে রওনা হলেন। বুদ্ধের সামনে পড়ে গেলেন তারপর। ভোরে ঘুম থেকে উঠে শীতল আলোয় হাঁটছিলেন তিনি আলোকপ্রাপ্ত মানুষের বর্ধিত মানসিক শক্তিতে ইয়াসাকে চিনতে পারলেন বুদ্ধ। ইশারায় তাঁকে বসতে বলে হাসি মুখে বললেন: ‘এটা ভয়ঙ্কর নয়। মারাত্মক নয়। এসো, বসো, ইয়াসা। তোমাকে ধম্ম শিক্ষা দেব আমি।’[৩০]
বুদ্ধের প্রশান্তি ও কোমলতা মুহূর্তে স্বস্তি যোগাল ইয়াসার। সেই অসুস্থকর আতঙ্ক রইল না তাঁর, নিজেকে বরং সুখী ও আশাবাদী বোধ করতে লাগলেন। মন আনন্দময় ও শান্ত থাকায় আলোকনের জন্যে সবচেয়ে উপযোগি অবস্থায় ছিলেন তিনি। চপ্পল খুলে বুদ্ধের পাশে বসে পড়লেন তিনি। তাঁকে মধ্যপন্থার শিক্ষা দিলেন বুদ্ধ। ধাপে ধাপে তানহা ও ইন্দ্রিয়জ সুখ এড়ানোর মৌল শিক্ষার মাধ্যমে শুরু করলেন, পবিত্র জীবনের সুবিধার বর্ণনা দিলেন। যখন দেখলেন ইয়াসা মনোযোগি ও প্রস্তুত, তাঁকে চারটি মহান সত্যি শিক্ষা দিতে শুরু করলেন তিনি। শোনার সময় ‘ধম্মের খাঁটি দৃশ্য জেগে উঠল’ ইয়াসার মাঝে, এমনভাবে তাঁর আত্মায় তলিয়ে গেল যেমন করে, আমাদের যেভাবে বলা হয়েছে, রঙ কাপড়ে ভেতরে প্রবেশ করে তাকে রাঙিয়ে তোলে।[৩১] ইয়াসার মন ধম্মে ‘রঞ্জিত’ হবার পর দুটোকে আর আলাদা করার উপায় ছিল না। এটাই ‘প্রত্যক্ষ জ্ঞান,’ কারণ ইয়াসা এমন গভীর স্তরে ধম্ম অনুভব করেছেন যে তিনি এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছেন। এটা তাঁর সম্পূর্ণ সত্তাকে ‘রঞ্জিত’ করেছে। লোকে প্রথম ধম্মের কথা শোনার সময়, বিশেষ করে খোদ বুদ্ধ দীক্ষা দেওয়ার সময় এটাও সাধারণ অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে। ধম্ম তাঁদের প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পূর্ণ খাপ খেয়ে যাচ্ছে ভেবেছে তারা, এটা তাদের পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও অনুকূল; এক অর্থে আগাগোড়াই জানা ছিল তাদের। পালি টেক্সটে আমরা দামাস্কাসের পথে সেইন্ট পলের যন্ত্রণাকর বা নাটকীয় ধর্মান্তরের মতো কোনও ঘটনার উল্লেখ দেখি না। এ ধরনের যেকোনও হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতাকে বুদ্ধ ‘অদক্ষ’ বিবেচনা করতেন। মানুষকে অবশ্যই তার স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, যেমনটি গোলাপজাম গাছের নিচে ছিলেন তিনি।
