কিন্তু পালি টেক্সট হরিণ বনের এই প্রথম শিক্ষার আরেকটি ভাষ্য অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটা আরও দীর্ঘ এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়ার বর্ণনা দেয়। জোড়ায় জোড়ায় ভিক্ষুদের নির্দেশনা দিয়েছেন বুদ্ধ, অন্যদিকে বাকি তিনজন ওদের ছয়জনের জন্যে পর্যাপ্ত খাদ্য যোগাড় করতে বারানসিতে চলে গেছেন। এখানে বোঝানো হয়েছে, অধিকতর নিবিড় এই শিক্ষায় ভিক্ষুদের তাঁর বিশেষ যোগ শিক্ষা দিচ্ছিলেন বুদ্ধ, ‘অভিনিবেশ’ ও ‘অপরিমেয়’র সাথে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।[১৩] ধ্যান অবশ্যই আলোকনের জন্যে অপরিহার্য। শিক্ষাব্রতীরা বুদ্ধের যোগীয় অনুবীক্ষণের নিচে দেহ-মন স্থাপন করতে না শিখলে ও নিজেদের গভীরে ডুব না দিলে ধম্ম ‘প্রত্যক্ষভাবে’ উপলব্ধি করা যাবে না বা বাস্তবতায় পরিণত হবে না। কেবল হিতোপদেশ শুনে আর লোকমুখে শোনা সত্যসমূহ গ্রহণ করে কোন্দান্না ‘স্রোতে প্রবেশকারী’ হয়ে তাঁর ‘প্রত্যক্ষ জ্ঞান’ অর্জন করতে পারবেন না। ভিক্ষুরা আপন অভিজ্ঞতার পরতে পরতে দুঃখ-কষ্ট ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সজাগ না হওয়া পর্যন্ত সঠিকভাবে তাঁর সত্য অনুধাবন করা যাবে না। তাঁর শিক্ষার অষ্টশীল পথে ধ্যানের অনুশীলনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পাঁচ ভিক্ষুকে দেওয়া নির্দেশনা প্রায় নিশ্চিতভাবেই একটি মাত্র সকালের চেয়ে বেশি সময় নিয়েছিল। আগে হতেই তাঁরা সফল যোগি ও অহিংসা নীতিতে দক্ষ হয়ে থাকলেও ধম্মের কার্যকর হতে সময় প্রয়োজন ছিল। যাই হোক, পালি টেক্সট আমাদের বলছে, কোন্দান্নার মাঝে ধম্ম ‘জেগে ওঠার’ অল্প পরেই বাপ্পা, বাদ্যিয়, মহানামা ও আশাজিও ‘স্রোতে প্রবেশকারী’তে পরিণত হন।[১৪]
ধম্মের যৌক্তিক গঠন ধ্যানের অনুশীলনের পরিপূরক ছিল যা শিক্ষার্থীকে তা ‘উপলব্ধি’ করতে সক্ষম করে তুলত। যোগের মাধ্যমে ভিক্ষুগণ মতবাদ কোন্ সত্যি ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছে তা শনাক্ত করতে পারতেন। বৌদ্ধদের ধ্যানের অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে নির্ভরশীল ঘটনার ধারা (পাতিক্কাসমুপদ), যা বুদ্ধ সম্ভবত পরবর্তী কোনও পর্যায়ে দুঃখ-কষ্টের সত্যের সম্পূরক হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন। যদিও পালি টেক্সটগুলো আলোকপ্রাপ্তির অব্যবহিত আগে-পরেই এই ধারা বিবেচনা করেছেন বরে উল্লেখ করেছে।[১৫] এই ধারা বারটি শর্তাধীন ও নিয়ন্ত্রণের সম্পর্কের মাধ্যমে আমাদের জীবনের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতি তুলে ধরে চেতনাশীল কোনও সত্তার জীবন চক্রের সন্ধান করে এবং দেখায় কীভাবে প্রতিটি মানুষ চিরন্তনভাবে ভিন্ন কিছুতে পরিণত হচ্ছে।
[১] অজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে [২] কম্ম: কম্মের উপর নির্ভর করে [৩] চেতনাঃ চেতনার উপর নির্ভর করে [৪] নাম ও ধরণ: নাম ও ধরনের উপর নির্ভর করে [৫] ইন্দ্রিয় অঙ্গ: ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করে [৬] সংযোগ: সংযোগের উপর নির্ভর করে [৭] অনুভূতি: অনুভূতির উপর নির্ভর করে [৮] আকাঙ্ক্ষা: আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করে [৯] সম্পর্ক: সম্পর্কের উপর নির্ভর করে [১০] অস্তিত্ব: অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে [১১] জন্ম: জন্মের উপর নির্ভর করে [১২] দুঃখ: বয়স ও মৃত্যু, দুঃখ, বিলাপ, দুর্দশা, শোক ও হতাশা।[১৬]
এই ধারাক্রম বৌদ্ধ শিক্ষার কেন্দ্রিয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এটা উপলব্ধি করা সহজ নয়। এটা যাঁদের কাছে নিরুৎসাহব্যঞ্জক ঠেকে, তাঁরা এই ভেবে আশ্বস্ত হতে পারেন যে, বুদ্ধ একবার এক ভিক্ষুকে এটা সহজ মনে করায় ভর্ৎসনা করেছিলেন। একে উপমা হিসাব দেখতে হবে, এক জীবন হতে অন্য জীবনে টিকে থাকার মতো কোনও সত্তা না থাকা সত্ত্বেও–যেমনটা বুদ্ধ উপলব্ধি করছিলেন–মানুষ কেমন করে পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে এটা যখন সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করে। কী সেই জিনিস যা আবার জন্ম নেয়? এমন কোনও আইন আছে যা পুনর্জন্মকে দুঃখের সঙ্গে সম্পর্কিত করে?
ধারায় ব্যবহৃত পরিভাষাগুলো কিঞ্চিৎ দুর্বোধ্য। যেমন ধরা যাক ‘নাম ও ধরণ’ স্রেফ পালি বাকধারায় ‘ব্যক্তি’; ‘চেতনা’ (বিন্নানা) কোনও ব্যক্তির চিন্তা ও অনুভূতির সামগ্রিকতা নয়, বরং এক ধরনের উচ্চমার্গীয় বস্তু, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের শেষ ভাবনা বা আবেগ যা তার জীবনের সকল কম্ম দিয়ে গঠিত হয়েছে। এই ‘চেতনা’ মায়ের জঠরে এক নতুন ‘নাম ও ধরনের’ বীজানুতে পরিণত হয়। ভ্রুণের ব্যক্তিত্ব পূর্বসুরির মৃত্যুপথযাত্রী ‘চেতনা’র শর্তাধীন। এই ‘চেতনা’র সঙ্গে যখন ভ্রূণ সম্পর্কিত হয়, তখনই নতুন এক জীবনচক্র সূচিত হতে পারে। ভ্রূণ ইন্দ্রিয় অঙ্গগুলোর বিকাশ ঘটায়। জন্মের পর এগুলো বাহ্যিক জগতের সঙ্গে ‘যোগাযোগ’ করে। এই ইন্দ্রিয়জ সম্পর্ক ‘শিহরণ’ বা অনুভূতির জন্ম দেয় যা দুঃখের সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ ‘আকাঙ্ক্ষা’র দিকে চালিত করে। আকাঙ্ক্ষা চালিত করে ‘সম্পর্কের’ দিকে যা আমাদের মুক্তি ও আলোকন প্রতিহত করে। আমাদের যা নতুন ‘অস্তিত্বে’ নতুন জন্ম ও আরও দুঃখ, অসুস্থতা, শোক আর মৃত্যুতে ঠেলে দেয়।[১৭]
অজ্ঞতা দিয়ে সূচিত হয় এই ধারা যা দুঃখকষ্টের সবচেয়ে শক্তিশালী না হলেও প্রধান কারণে পরিণত হয়। গাঙ্গেয় অঞ্চলের অধিকাংশ সন্ন্যাসী আকাঙ্ক্ষাই দুঃখের প্রথম কারণ বলে বিশ্বাস করতেন। এদিকে উপনিষদ ও সমক্ষ্যের ধারণা ছিল যে বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতাই মুক্তির পথে প্রধান অন্তরায়। বুদ্ধ এ দুটো কারণকে সম্পর্কিত করতে পেরেছিলেন।[১৮] তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি মানুষ বেঁচে আছে, কেননা চারটি কারণ সম্পর্কে অজ্ঞ সত্তার মাধ্যমে সে সাবেক অস্তিত্বে বিরাজ করেছে। ফলে নিজেদের তারা আকাঙ্ক্ষা ও ভোগান্তির কবল হতে মুক্ত করতে পারে না। সঠিকভাবে ওয়াকিবহাল নয় এমন মানুষ মারাত্মক বাস্তব ভুল করতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, একজন যোগি ভাবতে পারে যে ঘোরের কোনও একটি উচ্চতর পর্যায়ই নিব্বানা। ফলে সম্পূর্ণ মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে সে আর বাড়তি প্রয়াস পাবে না। পালি টেক্সটে দেওয়া ধারাক্রমের অধিকাংশ ভাষ্যে দ্বিতীয় ধারাটি কম্ম নয় নয়, বরং আরও কঠিন বিষয় সাংখারা (গঠন)। কিন্তু দুটো শব্দই একই ক্রিয়াপদ মূল হতে নেওয়া: ক্র (করা)। সাংখারা শব্দটিকে কিছুটা দুর্বোধ্যভাবে অনুবাদ করা হয়েছে: ‘অবস্থা বা বস্তু যা গঠন বা প্রস্তুত হচ্ছে।’[১৯] এভাবে আমাদের কর্মকাণ্ড (কম্ম) আগামী অস্থিত্বের ‘চেতনা’ গঠন করছে: তাকে আকার নিচ্ছে ও শর্তাধীন করছে। বুদ্ধ যেহেতু আমাদের ইচ্ছাগুলোকে মানসিক কৰ্ম্ম হিসাবে দেখেছেন, ধারাক্রম দেখাচ্ছে যে, আমাদের বাহ্যিক কর্মকাণ্ডকে প্ররোচিতকারী আবেগসমূহের ভবিষ্যৎ পরিণাম থাকবে: লোভী, বিভ্রান্ত পছন্দের একটি জীবন আমাদের শেষ, মৃত্যুপযাত্রী চিন্তার (বিন্নানা) মানকে প্রভাবিত করবে। এটা আবার পরবর্তীকালে আমরা কোন জীবন পাব তাকে প্রভাবিত করবে। নতুন ‘নাম ও ধরনে’ বাহিত এই শেষ, মৃত্যুপথযাত্রী ‘চেতনা’ কী চিরন্তন, স্থির অস্তি ত্ব? একজন ব্যক্তি কী বারবার জীবন যাপন করবে? হ্যাঁ এবং না। চেতনাকে যোগিদের মতো স্থায়ী, চিরন্তন সত্তা বলে বিশ্বাস করতেন না বুদ্ধ। একে বরং এক সলতে থেকে আরেক সলতেয় যাওয়া শিখার মতো অন্তিম টিমটিমে শক্তি হিসাবে দেখেছেন।[২০] অগ্নিশিখা কখনওই ধ্রুব নয়। সন্ধ্যারাতে জ্বালানো আগুনই ভোরবেলার জ্বলন্ত আগুন, আবার ঠিক তা নয়।
