সেকারণেই এখানে মহাবিশ্বের সৃষ্টি বা পরম সত্তার অস্তিত্ব সংক্রান্ত কোনও দুর্বোধ্য তত্ত্ব নেই। এসব বিষয় আগ্রহোদ্দীপক হতে পারে, কিন্তু সেগুলো শিষ্যকে আলোকন এনে দেবে না বা দুঃখ হতে মুক্তি দেবে না। কোসাম্বির সিমসাপা বনে বাস করার সময় বুদ্ধ একদিন কিছু পাতা ছিঁড়ে শিষ্যদের দেখালেন, গাছে আরও পাতা বেড়ে উঠছে। তিনিও তেমনি তাদের সামান্য কিছু শিক্ষা দিয়ে আরও অনেক শিক্ষা তুলে রেখেছেন। কেন? ‘কারণ, শিষ্যগণ, সেগুলো তোমাদের কাজে আসবে না, পবিত্রতার সন্ধানে সেগুলো উপযোগি নয়; ওসব শান্তি ও নিব্বানার প্রত্যক্ষ জ্ঞানে পৌঁছে দেবে না।’[৫] দর্শন নিয়ে বারবার প্রশ্ন করে চলা সন্ন্যাসীদের একজনকে তিনি বলেছেন, সে একজন আহত মানুষের মতো যে কিনা তাকে আঘাতকারী ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা না জানা পর্যন্ত চিকিৎসা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। অর্থহীন এসব তথ্য পাবার আগেই সে মারা যাবে। ঠিক একইভাবে যার জগৎ বিশ্বজগতের সৃষ্টি বা পরম সম্পর্কিত তথ্য পাওয়ার আগে বুদ্ধের শিক্ষা অনুসরণে অস্বীকৃতি জানায় তারা এইসব দুর্ভেয় তথ্য জানবার আগেই কষ্ট ভোগ করে মারা যাবে। বিশ্বজগৎ সৃষ্ট বা চিরন্তন হয়ে থাকলে কী এসে যাবে? শোক, দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশা তারপরও থাকবে। কেবল বেদনা বিনাশের সঙ্গেই বুদ্ধের সম্পর্ক। ‘আমি বর্তমানে অসুখী অবস্থার প্রতিকারের উপদেশ দিতে এসেছি।’ দার্শনিকভাবে আগ্রহী ভিক্ষুকে বলেছিলেন বুদ্ধ, ‘সুতরাং আমি তোমাদের কাছে কোন কোন বিষয় ব্যাখ্যা করিনি এবং তার কারণ সব সময় মনে রাখবে।’[৬]
কিন্তু হরিণ বাগিচায় পাঁচ সাবেক সঙ্গীর সাথে সাক্ষাতের পর একটা কিছু দিয়ে শুরু করতে হয়েছিল বুদ্ধকে। কীভাবে ওদের সন্দেহ দূর করবেন তিনি? চারটি মহান সত্য সম্পর্কে কোনও ধরনের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল তাঁকে। আমরা জানি না, সেদিন পাঁচ ভিক্ষুকে আসলে কী বলেছিলেন তিনি। পালি টেক্সটে প্রথম হিতোপদেশ নামের বয়ানটি সেদিনের ধর্মোপদেশের হুবহু বিবরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ধর্মগ্রন্থসমূহ সংকলিত হওয়ার সময় সম্পাদকগণ সম্ভবত সুবিধাজনকভাবে অত্যাবশ্যকীয় বিষয়সমূহ চালুকারী এই সুত্তার দেখা পেয়ে এই পর্যায়ে বর্ণনায় সংযোজন করেছেন।’[৭] কিন্তু যেভাবেই হোক, প্রথম হিতোপদেশ যথার্থ ছিল। বুদ্ধ সবসময়ই তাঁর শিক্ষাকে যে জনসাধারণকে তিনি শিক্ষা দিচ্ছেন তাদের উপযোগি করে তোলার বিষয়ে যত্নবান ছিলেন। পাঁচ ভিক্ষু গৌতমের কৃচ্ছ্রতা ত্যাগের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিলেন। সুতরাং বর্তমান সুত্তায় তাঁর মধ্যপন্থার মূল তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে তাঁদের আশ্বস্ত করার মাধ্যমে শুরু করেছিলেন। যেসব মানুষ ‘অগ্রযাত্রা’য় নেমে পবিত্র জীবনে গিয়েছে, বলেছেন তিনি, তাদের উচিৎ একদিকে ইন্দ্রিয় সুখের দুটি চরম রূপ এবং অন্যদিকে চরম কৃচ্ছ্রতা সাধন এড়িয়ে যাওয়া। কোনওটাই উপকারী নয়, কারণ এগুলো নিব্বানার দিকে চালিত করে না। তার বদলে তিনি এই দুই বিকল্পের মাঝে এক সুখকর মধ্যপন্থা, অষ্টশীল পথ আবিষ্কার করেছেন, এবং নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারেন সন্ন্যাসীদের তা সরাসরি আলোকনের দিকে নিয়ে যাবে।
এরপর বুদ্ধ চারটি মহান সত্যের রূপরেখা দিলেন: দুঃখ-কষ্টের সত্য, দুঃখ-কষ্টের কারণের সত্য, দুঃখ-কষ্ট অবসান বা নিব্বানার সত্য এবং এই মুক্তি অভিমুখী পথের সত্যি। অবশ্য এই সত্যগুলোকে অধিবিদ্যিক তত্ত্ব নয় বরং প্রায়োগিক কর্মসূচি হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধম্ম শব্দটি কেবল কী নয়, বরং কী হওয়া উচিৎ তাও বোঝায়। বুদ্ধ’র ধম্ম ছিল জীবনের সমস্যা- সংকটের রোগ নির্ণয় ও প্রতিষেধকের ব্যবস্থাপত্রও, যা হুবহু অনুসরণ করতে হবে। তাঁর হিতোপদেশে প্রতিটি সত্যের তিনটি উপাদান ছিল। প্রথমে তিনি ভিক্ষুদের সত্য প্রত্যক্ষ করিয়েছেন। এরপর এ ব্যাপারে কী করতে হবে সেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন: দুঃখ-কষ্টকে ‘সম্পূর্ণভাবে’ জানতে হবে,’ দুঃখ-কষ্টের কারণ ‘আকাঙ্ক্ষা’ ‘বিসর্জন দিতে হবে’: দুঃখ-কষ্টের অবসান, নিব্বানাকে আরাহান্তের হৃদয়ে একটি ‘বাস্তবতায়’ পরিণত হতে হবে। এবং অষ্টশীল পথ ‘অবশ্যই’ অনুসরণ করতে হবে। সবশেষে, তিনি স্বয়ং কী অর্জন করেছেন তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন বুদ্ধ: তিনি ‘প্রত্যক্ষভাবে দুঃখকে উপলব্ধি করেছেন: আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করেছেন: নিব্বানার অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন: শেষ পর্যন্ত তিনি এর পথ অনুসরণ করেছেন। এটা, ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি, যখন নিজের কাছে ধম্মের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছেন ও বাস্তব অর্থে কর্মসূচি সম্পাদন করেছে, তখনই আলোকন সম্পূর্ণ হয়েছে: ‘চূড়ান্ত মুক্তি অর্জন করেছি আমি।’ বিজয়ীর সুরে চিৎকার করেছে তিনি।[৮] সত্যিই সামসারা হতে মুক্ত হয়েছিলেন তিনি। জানতেন মধ্যপন্থাই সত্যি পথ। নিজ জীবন ও ব্যক্তিত্ব সেটা প্রমাণ করেছে।
পালি টেক্সট আমাদের বলছে, বুদ্ধের হিতোপদেশ শোনার সময় পাঁচ ভিক্ষুর অন্যতম কোন্দান্না ‘প্রত্যক্ষভাবে’ তাঁর শিক্ষা অনুভব করতে শুরু করেছিলেন। যেন সত্তার গভীরতা থেকে তাঁর মাঝে ‘জেগে উঠেছিল’ এটা। যেন চিনতে পেরেছিলেন তিনি-বরাবরই জানা ছিল।[১০] এভাবেই সবসময় ধর্মগ্রন্থগুলো কোনও নতুন শিষ্যের ধম্মে শিক্ষা গ্রহণের বর্ণনা দিয়েছে। এটা বিশ্বাসের প্রতি কোনও ধারণাগত সম্মতি ছিল না। আসলে হরিণ বাগিচায় দীক্ষানুষ্ঠান সম্পাদন করেছিলেন বুদ্ধ। ধাত্রীর মতো একজন আলোকপ্রাপ্ত মানুষের জন্মে সহায়তা দান করছিলেন, বা তাঁর নিজস্ব উপমা ব্যবহার করে বলা যায়, খাপ হতে তরবারি বা খোলস হতে সাপ বের করে আনছিলেন তিনি। প্রথম হিতোপদেশ শোনার জন্যে হরিণ বাগিচায় সমবেত দেবতাগণ কোন্দান্নার পরিবর্তন লক্ষ করে আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন: ‘প্রভু বারানসির হরিণ বনে ধম্মের চাকা চালু করেছেন!’ দেবতাদের চিৎকার একের পর এক আকাশে অন্য দেবতাদের কাছে পৌঁছে গেল। শেষে খোদ ব্রহ্মার কানেও গেল। ধরণী কেঁপে উঠল, দেবতার চেয়েও উজ্জ্বল আলোয় ভরে উঠল ‘কোন্দান্না জানে! কোন্দান্না জানে!’ খুশিতে চেঁচালেন বুদ্ধ। বৌদ্ধ ট্র্যাডেশন অনুযায়ী ‘স্রোতে প্রবেশকারীতে’ (সোতাপান্না)[১১] পরিণত হয়েছিলেন কোন্দান্না। পুরোপুরি আলোকপ্রাপ্ত হননি বটে, কিন্তু তাঁর সন্দেহ কেটে গিয়েছিল। তিনি আর অন্য কোনও ধম্মে আগ্রহী ছিলেন না। বুদ্ধের পদ্ধতিতে অবগাহন করতে প্রস্তুত ছিলেন তিনি; জানতেন এটাই তাঁকে নিব্বানার দিকে নিয়ে যাবে। বুদ্ধের সংঘে যোগদানের আবেদন জানালেন তিনি। ‘এসো, ভিক্ষু,’ জবাব দিলেন বুদ্ধ। ‘ধম্ম চমৎকারভাবেই প্রচার করা হয়েছে। পবিত্র জীবন যাপন করো, যা তোমার দুঃখ কষ্টকে চিরকালের জন্যে দূর করে দেবে।[১২]
