বিচ্যুত না হয়ে ব্রাহ্মণদের শিক্ষার পাদপীঠ ও গুরুত্বপূর্ণ শহর বারানসির উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রাখলেন বুদ্ধ। অবশ্য শহরে বেশি দিন থাকলেন না তিনি। সরাসরি ইসিপাতানার উপকণ্ঠের হরিণ-বাগিচার দিকে চললেন। যেখানে সাবেক পাঁচ সঙ্গী থাকার কথা জানা ছিল তাঁর। তাঁকে এগিয়ে আসতে দেখে সতর্ক হয়ে উঠলেন ওই ভিক্ষুরা। তাঁরা যতদূর জানতেন, তাঁদের পুরোনো মন্ত্রণাদাতা গৌতম পবিত্রজীবন ত্যাগ করে বিলাসিতা ও আত্ম-তুষ্টির জীবন বেছে নিয়েছেন। তাঁকে আর আগের মতো স্বাগত জানাতে পারলেন ন তাঁরা, একজন মহান সাধুঁকে যেভাবে সম্মান জাননো প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অহিংসার প্রতি নিবেদিত ভালো মানুষ ছিলেন তাঁরা। তাঁকে কষ্ট দিতে চাইলেন না। তাঁরা স্থির করলেন, দীর্ঘ যাত্রার শেষে বিশ্রাম নিতে চাইলে গৌতম খানিকটা সময় তাঁদের সঙ্গে বসতে পারেন। কিন্তু বুদ্ধ কাছে আসার পর পুরোপুরি নিরস্ত্র হয়ে পড়লেন তাঁরা। সম্ভবত তাঁরাও তাঁর নতুন প্রশান্তি ও আত্মবিশ্বাস দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন, কারণ ভিক্ষুদের একজন নিজের পোশাক ও বাটি নিয়ে তাঁকে স্বাগত জানাতে ছুটে এসেছিলেন। অন্যরা আসন প্রস্তুত, পানি যোগাড়, পিড়ি আর তোয়ালে আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, যেন তাঁদের পুরোনো নেতা পা ধুতে পারেন। তাঁকে ‘বন্ধু’[২] বলে আন্তরিকতার সঙ্গে স্বাগত জানালেন তাঁরা। প্রায়ই ঘটবে এমন। বুদ্ধের আচরণের দয়া ও সহানুভূতি প্রায়শঃ একইভাবে মানুষ, দেবতা ও প্রাণীকূলের মাঝে বৈরিতা দূর করবে।
সোজাসুজি কাজের কথায় চলে এলেন বুদ্ধ। এখন আর তাঁকে বন্ধু ডাকা উচিত হবে না তাদের, ব্যাখ্যা করলেন তিনি, কারণ তাঁর আগের সত্তা অদৃশ্য হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন মর্যাদা পেয়েছেন তিনি। এখন একজন তথাগত তিনি, এক অদ্ভুত পদবী, যার আক্ষরিক অর্থ, ‘এভাবে গত।’ তাঁর অহমবাদ নিৰ্বাপিত হয়েছে। তিনি পবিত্রজীবন পরিত্যাগ করেছেন, এমন যেন তাঁরা না ভাবেন; বরং সম্পূর্ণ উল্টোটাই সত্যি। তাঁর বক্তব্যে আকর্ষণীয় দৃঢ়তা ও তাগিদ ছিল যা সঙ্গীরা আগে কখনও শোনেননি। ‘শোন!’ বললেন তিনি, ‘আমি নিব্বানা মৃত্যুহীন অবস্থা অর্জন করেছি। আমি তোমাদের নির্দেশনা দেব! ধম্ম শিক্ষা দেব!’[৩] তাঁরা তাঁর শিক্ষা শুনলে, অনুশীলন করলে, তাঁরাও আরাহান্তে পরিণত হতে পারবেন, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরম সত্যে প্রবেশ করে নিজেদের জীবনে একে বাস্তবে পরিণত করতে পারবেন। কেবল মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনতে হবে তাঁদের।
এরপর প্রথম হিতপোদেশ দিলেন বুদ্ধ। টেক্সটে তা ধম্মাকাপ্পাবাত্তানা-সুত্তা অর্থাৎ ধম্মের চাকা ঘোরানোর বয়ান নামে রক্ষিত আছে, কারণ তা শিক্ষাকে জগতে প্রকাশ করে মানবজাতির জন্যে এক নতুন যুগ সূচনা করেছে। যারা এখন জীবন যাপনের শুদ্ধ উপায় জানে। নিগূঢ় অধিবিদ্যিক তথ্য প্রদান নয়, বরং পাঁচ ভিক্ষুকে আলোকনের পথ দেখানোই এর উদ্দেশ্য। তাঁরাও তাঁর মতো অরাহান্ত হতে পারবেন, কিন্তু কখনও গুরুর সমকক্ষ হতে পারবেন না, কারণ বুদ্ধ নিজ প্রচেষ্টায় একা এবং কারও সাহায্য ছাড়া নিব্বানা লাভ করেছেন। মানুষ জাতিকে শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সাম্মা সামবুদ্ধ হয়ে পরম আলোকনের গুরু-আরও উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন তিনি। পরবর্তীকালের বৌদ্ধ শিক্ষা উল্লেখ করবে যে, প্রতি ৩২,০০০ বছরে একবার, যখন ধম্মের জ্ঞান পৃথিবী হতে সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে, সাম্মা সামবুদ্ধ পৃথিবীতে আগমন করবেন। গৌতম আমাদের কালের বুদ্ধে পরিণত হয়েছিলেন। ইসিপাতানার হরিণ বাগিচায় শুরু করেছিলেন তাঁর ধর্মীয় জীবন।
কিন্তু কী শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন তিনি? মতবাদ বা বিশ্বাসের কোনও অবকাশ ছিল না বুদ্ধের: কোনও ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা দেওয়ার ছিল না তাঁর, দুঃখের মূল কারণ সম্পর্কে কোনও তত্ত্ব নয়, আদি পাপের কোনও গল্পও নয়; নয় পরম বাস্তবতার কোনও সংজ্ঞা। এই ধরনের আঁচ-অনুমানে কোনও যুক্তি খুঁজে পাননি তিনি। বিশেষ অনুপ্রাণিত ধর্মীয় মতামতকে যারা ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে বুদ্ধ মতবাদ তাদের কাছে অস্বস্তিকর। ব্যক্তির ধর্মতত্ত্ব বুদ্ধের কাছে সম্পূর্ণ উপেক্ষার বিষয়! অন্য কারও কথায় কোনও মতবাদ গ্রহণ করা তাঁর চোখে একটা ‘অদক্ষ’ অবস্থা যা আলোকনের দিকে চালিত করতে পারে না, কারণ তা ব্যক্তিগত দায়িত্বের বরখেলাপ। কোনও প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসে আত্মসমর্পণে কোনও কৃতিত্ব দেখেননি তিনি। নিব্বানার অস্থিত্বে আস্থা এবং নিজে তার প্রমাণ করার প্রতিজ্ঞাই ‘বিশ্বাস’। বুদ্ধ সব সময় জোর দিয়ে বলেছেন, শিষ্যরা যেন তাঁর শিক্ষা নিজস্ব অভিজ্ঞতায় যাচাই করে নেয়, কিছুই যেন শোনা কথায় মেনে না নেয়। ধর্মীয় ধারণা অনায়াসে আঁকড়ে থাকার আরেকটা বস্তু মানসিক প্রতিজ্ঞায় পরিণত হতে পারে, অথচ ধম্মের উদ্দেশ্যে মানুষকে বিসর্জনে সহায়তা যোগানো।
‘বিসর্জন দেওয়া’ ছিল বুদ্ধের শিক্ষার অন্যতম মূল সুর। আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তি সবচেয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ নির্দেশনাও আঁকড়ে থাকে না বা অবলম্বন করে না। সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। কিছুই টিকে থাকে না। শিষ্যরা তাদের সত্তার প্রতি তন্ত্রীতে এই বিষয়টি শনাক্ত করতে না পারা পর্যন্ত নিব্বানা অর্জন করতে পারবে না। নিজেদের কম্ম সম্পাদনের পর এমনকি খোদ তাঁর শিক্ষাও ত্যাগ করতে হবে। একবার তিনি তাদের ভেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সুবিশাল জলরশির মুখোমুখি হয়ে সেটা পেরুনোর জন্যে মরিয়া এক পর্যটকের গল্প বলেছেন। কোনও সেতু, ফেরি ছিল না সেখানে, নিজেই ভেলা বানিয়ে নদ। পার হয় সে। কিন্তু তারপর, বুদ্ধ শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করলেন, ভেলা দিয়ে পর্যটকের কী করা উচিৎ? ওটা উপকারে এসেছে বলে পিঠে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ হবে তার? যেখানে যাবে সাথে করে নিয়ে যাবে? নাকি স্রেফ বেঁধে রেখে যাত্রা অব্যাহত রাখবে? উত্তরটা পরিষ্কার। ‘ঠিক একইভাবে, ভিক্ষুগণ, আমার শিক্ষা নদী পেরুনোর কাজে লাগানোর জন্যে একটা ভেলার মতো, আঁকড়ে থাকার জন্যে নয়,’ উপসংহার টেনেছেন বুদ্ধ। ‘তোমরা সঠিকভাবে ভেলাসুলভ প্রকৃতি বুঝতে পারলে, এমনকি সুশিক্ষা ও (ধম্ম) ত্যাগ করবে, অশুভগুলোর কথা তো না বললেই চলে।’[৪] তাঁর ধৰ্ম্ম পুরোপুরি প্রায়োগিক ছিল। অনিচনীয় সংজ্ঞা প্রদান বা কোনও শিষ্যের অধিবিদ্যিক প্রশ্নের বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল মেটানো এর কাজ ছিল না। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বেদনার নদী পেরিয়ে ‘দূরের পাড়ে’ পৌঁছাতে মানুষকে সক্ষম করে তোলা। তাঁর কাজ ছিল দুঃখ-কষ্ট দূর ও শিষ্যদের নিব্বানা অর্জনে সাহায্য করা। এই লক্ষ্য পূরণ করেনি এমন যেকোনও কিছুই যেকোনও রকম গুরুত্বহীন।
