দেবতা ব্রহ্মা (কিংবা বুদ্ধের ব্যক্তিত্বের উচ্চতর অংশ) বিরাট সাফল্য হিসাবে এটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বুদ্ধ সযত্নে তাঁর আবেদন শুনলেন; পালি টেক্সট আমাদের বলছে, ‘বুদ্ধের চোখ দিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে পৃথিবীর দিকে তাকলেন তিনি।[৪০] এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য। কেবল আপন মুক্তি অর্জনকারী কেউ বুদ্ধ নন, বরং তিনিই বুদ্ধ যিনি যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে উঠে গেলেও অন্যদের বেদনায় সহানুভূতিশীল হতে পারেন। বুদ্ধ এবার উপলব্ধি করলেন, নিব্বানার পথগুলো সবার জন্যেই ‘হাট করে খোলা’: কীভাবে সতীর্থদের কাছে হৃদয়ের দরজা বন্ধ করবেন তিনি?[৪১] বোধি বৃক্ষের নিচে তাঁর উপলব্ধ সত্যের একটা আবশ্যিক অংশ হচ্ছে অন্যের জন্যে বাঁচাই নৈতিকভাবে বাঁচা। জীবনের পরবর্তী চল্লিশ বছর ক্লান্তিহীনভাবে নগর আর শহরে শহরে ঘুরে দেবতা, পশুপাখি, নারী ও পুরুষের কাছে আপন ধম্ম পৌঁছে দেবেন তিনি। এই প্রেমময় আক্রমণের কোনও সীমাবদ্ধতা থাকবে না।
কিন্তু কে প্রথম শুনবে এই বার্তা? সবার আগে প্রাক্তন গুরু আলারা কালাম ও উদকা রামপুত্তের কথা ভাবলেন বুদ্ধ। কিন্তু কাছেই অপেক্ষামান কয়েকজন দেবতা তাঁকে জানালেন তাঁরা দুজনই সম্প্রতি পরলোকগমন করেছেন। প্রচণ্ড শোকের খবর ছিল এটা। তাঁর গুরুরা ভালো মানুষ ছিলেন। নিশ্চয়ই তাঁরা তাঁর ধম্ম বুঝতে পারতেন। তাঁদের কোনও দোষ না থাকলেও এখন বেদনাময় আরেক জীবনে পতিত হয়েছেন তাঁরা। এই সংবাদ বুদ্ধকে নতুন তাগাদা দিয়ে থাকতে পারে। এরপর সেই পাঁচ ভিক্ষুর কথা ভাবলেন তিনি যারা তাঁর সঙ্গে প্রায়শ্চিত্তমূলক তাপস অনুশীলন করেছিলেন। প্রথম খাদ্য গ্রহণের পর সভয়ে সরে গিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু ওই প্রত্যাখ্যানকে বিচার-বিবেচনাকে ঘোলা করতে দেবেন না তিনি। এক সঙ্গে অবস্থানের সময় তাঁদের সহায়তা ও সমর্থনের কথা ভাবলেন। সরাসরি বেরিয়ে পড়লেন তাঁদের খোঁজে। তাঁরা এখন বারানসির (আধুনিক বানারস) বাইরে হরিণ বাগিচায় বাস করছেন জানতে পেরে ধম্মের চাকা চালু করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন তিনি। তিনি যেভাবে বলেছেন, ‘নিব্বানার মৃত্যুহীন ঢোল বাজানোর জন্যে।’[৪২] খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করেননি তিনি। ভ্রান্তিবশত বুদ্ধ ভেবেছিলেন তাঁর শিক্ষা মাত্র কয়েক শো বছর অনুসৃত হবে। কিন্তু মানুষকে উদ্ধার করতে হবে; এবং বুদ্ধ তাঁর অর্জিত নিব্বানার প্রকৃতির কারণেই তাঁদের জন্যে যথাসাধ্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তথ্যসূত্র
১. জোসেফ ক্যাম্পবেল, অরিয়েন্টাল মিথলজি: দ্য মাস্কস্ অভ গড, নিউ ইয়র্ক, ১৯৬২, ২৩৬।
২. মাজহিমা নিকয়া, ৩৬।
৩. প্রাগুক্ত।
৪. আঙুত্তারা নিকয়া ৯: ৩; মাজহিমা নিকয়া, ৩৮, ৪১।
৫. মাজহিমা নিকয়া ২৭, ৩৮, ৩৯, ১১২।
৬. প্রাগুক্ত, ১০০।
৭. দিঘা নিকয়া, ৩২৭।
৮. সামুত্তা নিকয়া, ২: ৩৬।
৯. বিনয়া: মহাভাগ্য, ১: ৬।
১০. উদনা, ৩: ১গ।
১১. মাজহিমা নিকয়া, ৩৮।
১২. প্রাগুক্ত।
১৩. মাজহিমা নিকয়া, ২।
১৪. হারমান অলদেনবার্গ, দ্য বুদ্ধা: হিজ লাইফ, হিজ ডকট্রিন, হিজ অর্ডার (অনু: উইলিয়াম হোয়ে), লন্ডন, ১৮৮২, ২৯৯-৩০২; এডোয়ার্ড কনযে, বুদ্ধজম: ইটস্ এসেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, অক্সফোর্ড, ১৯৫৭, ১০২।
১৫. আঙুত্তারা নিকয়া, ৮: ৭: ৩; রিচার্ড এফ, গমব্রিচ, হাউ বুদ্ধজম বিগান: দ্য কন্ডিশনড জেনেসিস অভ দ্য আর্লি টিচিংস, লন্ডন ও আটলান্টিক হাইল্যান্ডস, এনজে, ১৯৯৬, ৬০-৬১।
১৬. মাইকেল কারিথার্স, দ্য বুদ্ধা, অক্সফোর্ড ও নিউ ইয়র্ক, ১৯৮৩, ৭৫-৭৭।
১৭. আঙুত্তারা নিকয়া ৪: ২০।
১৮. মাজহিমা নিকয়া ১০০।
১৯, প্রাগুক্ত, ৩৬; সামুত্তা নিকয়া ১২: ৬৫।
২০. সামুত্তা নিকয়া ১২: ৬৫।
২১. মাজহিমা নিকয়া ৩৬।
২২. বিনয়া: মহাভাগ্য ১: ৫।
২৩. দিঘা নিকয়া, ১: ১৮২।
২৪. মাজহিমা নিকয়া, ৩৬।
২৫. আঙুত্তারা নিয়া, ১০.৯৫।
২৬. অলদেনবার্গ, দ্য বুদ্ধা, ২৭৯-৮২।
২৭. সুত্তা-নিপাতা, ৫: ৭।
২৮. জাতকা, ১: ৬৮-৭৬; হেনরি ক্লার্ক ওয়ারেন, বুদ্ধজম ইন ট্রান্সলেশন, ক্যাম্ব্রিজ, ম্যাস, ১৯০০, ৭১-৮৩।
২৯. জাতকা, ১: ৭০।
৩০. প্রাগুক্ত, ১: ৭১।
৩১. মির্চা এলিয়াদ, দ্য স্যাক্রেড অ্যান্ড দ্য প্রোফেন: দ্য নেচার অভ রিলিজিয়ন (অনু. উইলিয়াম আর. ট্রাস্ক), নিউ ইয়র্ক ও লন্ডন, ১৯৫৭, ৩৩- ৩৭; ৫২-৫৪; ১৬৯। জোসেফ ক্যাম্পবেল, দ্য হিরো উইদ আ থাউজেন্ড ফেইসেস, প্রিন্সটন, এনজে, ১৯৮৬, সংস্ক. ৪০-৪৬, ৫৬-৫৮; দ্য পাওয়ার অভ মিথ (বিল ময়ার্সের সঙ্গে) নিউ ইয়র্ক, ১৯৮৮, ১৬০-৬২।
৩২. জাতকা, ১: ৭২।
৩৩. প্রাগুক্ত, ১: ৭৩।
৩৪. প্রাগুক্ত, ১: ৭৪।
৩৫. প্রাগুক্ত, ১: ৭৫।
৩৬. বিনয়া: মাহভাগ্য, ১: ৪।
৩৭. প্রাগুক্ত, ১: ৫।
৩৮. প্রাগুক্ত।
৩৯. এলিয়াদ, স্যাক্রেড অ্যান্ড প্রোফেন, ২০০; ক্যাম্পবেল, দ্য পাওয়ার অভ মিথ, ১৭৪-৭৫।
৪০. বিনয়া: মহাভাগ্য, ১: ৫।
৪১. প্রাগুক্ত।
৪২. প্রাগুক্ত, ১: ৬।
৪. ধম্ম
কিন্তু বুদ্ধের শিক্ষাদানের প্রথম প্রয়াস সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। গয়া যাবার পথে উপকা নামের পূর্ব পরিচিত এক জৈনের দেখা পান তিনি। বন্ধুর পরিবর্তন নিমেষে লক্ষ করেছিল সে। ‘তোমাকে দারুণ প্রশান্ত লাগছে! কত সজাগ!’ চেঁচিয়ে বলেছে সে। ‘কী শান্ত তুমি। তোমার চেহারা পরিষ্কার। চোখজোড়া উজ্জ্বল। তোমার গুরু কে? আজকাল কার ধম্ম অনুসরণ করছ?’ নিখুঁত ছিল সুচনাটা। বুদ্ধ জানালেন, তাঁর কোনও গুরু নেই। কোনও সংঘেরও সদস্য নন তিনি। এখন পর্যন্ত জগতে তাঁর মতো আর কেউ নেই, কারণ তিনি আরাহান্ত, ‘সফল জনে’ পরিণত হয়েছেন, যিনি পরম আলোকন লাভ করেছেন। ‘কী?’ অবিশ্বাসের সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল উপকা। “নিশ্চয়ই নিজেকে বুদ্ধ, জিনা, আধ্যাত্মিক বিজয়ী, পবিত্রজন দাবি করছ না, আমরা যাঁর অপেক্ষা করছি?’ ‘হ্যাঁ,’ জবাব দিলেন বুদ্ধ। তিনি সকল আকাঙ্ক্ষা জয় করেছেন। প্রকৃতই তাঁকে জিনা ডাকা যেতে পারে। সংশয়ের চোখে তাঁকে দেখল উপকা। মাথা নাড়ল: ‘বন্ধু, স্বপ্ন দেখে যাও,’ বলল সে। ‘আমি চললাম এই দিকে।’ হঠাৎ মূল রাস্তা ছেড়ে একটা পার্শ্ববর্তী পথ বেছে নিল সে, নিব্বানার প্রত্যক্ষ পথ অস্বীকার করল।[১]
