কিন্তু নতুন বুদ্ধ জগতকে অবতারের মতো করে রক্ষা করতে পারবেন না। প্রতিটি প্রাণীকে নিজ আলোকন লাভের জন্যে গৌতমের কর্মসূচির চর্চা করতে হবে। তিনি তাদের পক্ষে সেটা করে দিতে পারবেন না। কিন্তু গোড়াতে যেন মনে হয়েছে বুদ্ধ, এখন তাঁকে অবশ্যই গৌতম ডাকতে হবে আমাদের, তাঁর সতীর্থ প্রাণীদের রক্ষা করার একমাত্র উপায়, এই ধম্ম প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রায়শঃই শাক্যমুনি-শাক্য প্রদেশের নীরবজন-অ্যাখ্যায়িত হবেন তিনি, কারণ তাঁর অর্জিত জ্ঞান অনির্বচনীয়, ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। তারপরেও গাঙ্গেয় এলাকা জুড়ে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে জনসাধারণ এক নতুন আধ্যাত্মিক দর্শনের আকাঙ্ক্ষা করছিল। পালি টেক্সট আমাদের জানাচ্ছে, প্রায় বুদ্ধ’র আলোকপ্রাপ্তির পরপরই তাপুস্য ও ভালুকা নামে দুজন বণিককে দেবতাদের একজন মহান ঘটনাটি অবহিত করার পর তারা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ব্যাপারটা। তারাই প্রথম সাধারণ শিষ্যে পরিণত হয়েছিল।[৩৬] কিন্তু প্রাথমিক সাফল্য সত্ত্বেও অনিচ্ছুক ছিলেন বুদ্ধ। তাঁর ধম্ম ব্যাখ্যা করা বড্ড কঠিন, বলেছেন নিজেকে, লোকে এর জন্যে প্রয়োজনীয় যোগ ও নৈতিক অনুশীলনী চর্চায় আগ্রহী হবে না। আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেওয়ার বদলে বেশির ভাগ মানুষই ইতিবাচকভাবে তাদের অর্জন উপভোগ করে। আত্ম-পরিত্যাগের বার্তা শুনতে চাইবে না তারা। ‘আমি ধৰ্ম্ম শিক্ষা দিলে,’ সিদ্ধান্ত নেন বুদ্ধ, ‘মানুষ বুঝবে না। আমার জন্যে ক্লান্তিকর ও হতাশাব্যাঞ্জক হয়ে দাঁড়াবে ব্যাপারটা।[৩৭]
কিন্তু দেবতা ব্রহ্মা হস্তক্ষেপ করলেন তখন। নিবিড় মনোযোগের সঙ্গে গৌতমের আলোকপ্রাপ্তি লক্ষ করেছেন তিনি, তাঁর সিদ্ধান্ত জেনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। বুদ্ধ তাঁর ধম্ম শিক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, হতাশায় চেঁচিয়ে উঠলেন ব্রহ্মা। ‘জগৎ পরাস্ত হবে। কোনও সুযোগই থাকবে না!’ হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। পালি টেক্সট সম্পূর্ণ অসচেতনভাবে দেবতাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। দেবতারা তাঁদের সৃষ্টির অংশ। বুদ্ধের কাহিনীতে মারা ও ব্রহ্মার অংশগ্রহণ তুলে ধরা এইসব কিংবদন্তী বুদ্ধমতের নতুন ধর্ম ও প্রাচীন বিশ্বাসের মাঝে সহিষ্ণু অংশীদারী বজায় থাকার বিষয়টিই তুলে ধরে। পৌত্তলিক পড়শিদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেবতাদের ভর্ৎসনাকারী হিব্রু পয়গম্বদের বিপরীতে প্রাথমিক বুদ্ধরা বহুসংখ্যক মানুষের প্রথাগত পূজা-অর্চনা বন্ধ করার কোনও প্রয়োজন বোধ করেনি। তার বদলে বুদ্ধ তাঁর জীবনের নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দেবতাদের সাহায্য করার সুযোগ করে দিচ্ছেন, এমনটাই দেখিয়েছে। মারার মতো ব্রহ্মাও হয়তো বুদ্ধের ব্যক্তিত্বেরই একটা দিক তুলে ধরে থাকতে পারে। সম্ভবত দেবতারা যে মানুষের অবচেতন শক্তির অভিক্ষেপ, সেটা বোঝানোরই একটা উপায় এটা। ব্রহ্মার হস্তক্ষেপের কাহিনী এমনটা বোঝাতে পারে যে, বুদ্ধের মনে কোনও দ্বিধা ছিল। তাঁর একটা অংশ নিঃসঙ্গতায় ফিরে গিয়ে বিরক্তিহীনভাবে নিব্বানার শান্তি ভোগ করার ইচ্ছে করার সময় আরেকটা অংশ এভাবে সতীর্থ প্রাণীদের স্রেফ অবহেলা করতে পারেন না বলে উপলব্ধি করেছে।
স্বাভাবিক ভূমিকার সম্পূর্ণ উল্টো ভূমিকায় স্বর্গ ছেড়ে মর্ত্যে নেমে এলেন ব্রহ্মা, নতুন বুদ্ধের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। ‘প্রভু’ প্রার্থনা জানালেন তিনি, ‘দয়া করে ধম্ম প্রচার করুন…খুব সামান্য আকাঙ্ক্ষা অবশিষ্ট রয়ে গেছে এমন মানুষ এই পদ্ধতির অভাবে আটকা পড়ে আছে। ওদের কেউ কেউ বুঝতে পারে।’ বুদ্ধের কাছে ‘যন্ত্রণায় তলিয়ে যাওয়া মানুষের দিকে তাকাতে’ আবেদন জানালেন তিনি, ‘জগতকে রক্ষা করার জন্যে দূর দূরান্তে সফর করার’[৩৮] আবেদন রাখলেন। সহানুভূতি ছিল বুদ্ধের আলোকনের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। এক কিংবদন্তীতে আছে: গৌতম তাঁর মায়ের হৃদয়ের সমান অবস্থান থেকে একপাশ দিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছেন।[৩৯] এটা আধ্যাত্মিক মানুষের জন্মের একটা উপমা, অবশ্যই আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করার জন্যে নয়। আমরা যখন হৃদয় দিয়ে জীবন যাপন করতে শিখি, ঠিক আমাদের মতোই অন্যের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করতে পারি, কেবল তখনই আমরা সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়ে উঠি একজন পশুবৎ নারী বা পুরুষ যেখানে নিজের স্বার্থকে সবার আগে স্থান দেয়, আধ্যাত্মিক পুরুষ সেখানে অন্যের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে ও দূর করতে শেখে। আমাদের অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের হৃদয়হীন করে রাখি, তরুণ গৌতমের প্রবল প্রতিরক্ষা সম্পন্ন প্রমোদ প্রাসাদের অনুরূপ একটা অবস্থা। কিন্তু বুদ্ধত্ব অর্জনের জন্যে দীর্ঘ ধ্যান ও প্রস্তুতিকালে গৌতম তাঁর সমগ্র সত্তাকে গভীরতম কন্দরে অনুরণিত হতে দিয়েছেন। নিজেকে ‘প্রত্যক্ষ জ্ঞান’-এর সঙ্গে দুঃখ-কষ্টের মহান সত্যকে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছেন তিনি, নিজের সাথে একে এক ও সম্পূর্ণ আত্মস্থ না করা পর্যন্ত।আপন নিব্বানায় নিরাপদে বন্দি হয়ে থাকতে পারেননি তিনি। তাহলে এক নতুন ধরনের প্রমোদ প্রাসাদে প্রবেশ করতেন তিনি। এমন প্রত্যাহার ধম্মের আবশ্যকীয় গতিশীলতাকে লণ্ডভণ্ড করত: বুদ্ধ চারটি ‘অপরিমেয়’র অনুশীলন করতে পারেন না, সতীর্থ প্রাণীকূল কুটিল হয়ে ওঠা এক জগতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকবে আর বুদ্ধ কেবল আপন আধ্যাত্মিক সুবিধার জন্যে পৃথিবীর চারকোণে দয়াময় অনুভূতি পাঠিয়ে যাবেন, তা হতে পরে না। তিনি যেভাবে সেতো- বিমুক্তি-আলোকনের মুক্তি-অর্জন করেছিলেন তাঁর অন্যতম প্রধান উপায় ছিল প্রেমময়-দয়া ও নিঃস্বার্থ সহানুভূতি। ধম্মের দাবি ছিল তিনি বাজার এলাকায় প্রত্যাবর্তন করবেন, নিজেকে বিষাদপূর্ণ পৃথিবীতে জড়িত করবেন।
