কিন্তু সংগ্রাম তখনও শেষ হয়নি। গৌতমকে তাঁর অজাগ্রত জীবন আঁকড়ে থাকা ও বিদায় নিতে অস্বীকৃতি জানানো অবশিষ্ট শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে। গৌতমের ছায়া-সত্তা মারা বিশাল সেনাদল সজ্জিত নিয়ে বিশ্ব শাসক চক্কবত্তীর রূপ ধরে তাঁর সামনে উপস্থিত হলেন। স্বয়ং মারা ১৪০ লীগ উঁচু একটা হাতির পিঠে আসীন। ১০০০ হাত গজিয়েছে তাঁর, প্রত্যেক হাতে মারাত্মক সব অস্ত্র দেখা যাচ্ছে। মারা নামের অর্থ কুহক। আমাদেরকে আলোকন থেকে দূরে ঠেলে রাখা অজ্ঞতাকেই তুলে ধরেন, কারণ চক্কবত্তী হিসাবে কেবল শারীরিক শক্তি দিয়ে অর্জন সম্ভব বিজয়ের দেখা পান তিনি তখনও পুরোপুরি আলোকপ্রাপ্ত হননি গৌতম। ফলে করুণার মাধ্যমে সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করলেন তিনি। নিজের অর্জিত গুণাবলীকে তরবারি বা বর্মের মতো এই মারাত্মক বাহিনীকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র মনে করেছিলেন।[৩২] কিন্তু আমাদের লেখক বলে যাচ্ছেন, মারার প্রতাপ সত্ত্বেও গৌতম ‘অপরাজেয় অবস্থানে’ বসেছিলেন, অমন অশ্লীল নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রমাণ। মারা তাঁর উদ্দেশে নয়টি ভীতিকর ঝড় প্রেরণ করার পরেও অটল রইলেন গৌতম। গৌতমের আলোকপ্রান্তি প্রত্যক্ষ করার জন্যে তাঁর পাশে জড়ো হওয়া দেবতাগণ আতঙ্কে পালিয়ে গেলেন। একা রয়ে গেলেন তিনি। বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী মুক্তি সন্ধান করার সময় নারী-পুরুষের স্বর্গীয় সাহায্য প্রত্যাশা করার উপায় নেই।
এ পর্যায়ে মারা গৌতমের কাছে এসে অদ্ভুত কথোপথনে ব্যস্ত করে রাখলেন। গৌতমকে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে বললেন, ‘ওটা তোমার নয়, আমার।’ মারা ভেবেছিলেন গৌতম জগৎ ছাড়িয়ে গেছেন, সকল বাহ্যিক বিরোধিতায় অনাক্রান্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু মারা এই জগতের অধিশ্বর, চক্কবত্তী হিসাবে ওই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসার অধিকার তারই। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, এই মাত্র দেখানো তাঁর ক্রোধ, ঘৃণা ও সহিংসতা তাঁকে বোধি বৃক্ষের নিচে অবস্থান গ্রহণের অযোগ্য করে তুলেছে। কেবল যারা সহানুভূতিময় জীবন যাপন করে এ শুধু তাদেরই অধিকার। গৌতম যুক্তি দেখালেন যে, মারা আলোকনের পক্ষে মোটেই প্রস্তুত নন। তিনি কখনও কোনওরকম আধ্যাত্মিক প্রয়াস চালাননি, কখনও দান করেননি, যোগ অনুশীলন করেননি। তো, উপসংহার টানলেন গৌতম, ‘এই আসন তোমার নয়, বরং আমার।’ তিনি আরও যোগ করলেন, পূর্ববর্তী জীবনে তিনি সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন, এমনকি অন্যের জন্যে নিজের জীবনও বিসর্জন দিয়েছেন। মারা কী করেছেন? তিনি এমন এমন দয়াময় কাজ করার কোনও প্রমাণ হাজির করতে পারবেন? সঙ্গে সঙ্গে মারার সেনাদল সমস্বরে চিৎকার করে উঠল: ‘আমি সাক্ষী!’ বিজয়ীর ঢঙে গৌতমের দিকে ফিরলেন মারা, নিজ দাবির প্রমাণ রাখতে বললেন তাঁকে।[৩৩]
কিন্তু গৌতম ছিলেন একা। আলোকনের জন্যে দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রমাণ রাখার মতো কোনও মানুষ বা দেবতা ছিলেন না তাঁর পাশে। হাত বাড়িয়ে সামনের জমিন স্পর্শ করে পৃথিবীকেই তাঁর অতীতের সহানুভুতিসূচক কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাক্ষী দেওয়ার আবেদন জানালেন তিনি। প্রচণ্ড গর্জনে চিৎকার করে উঠল পৃথিবী: ‘আমি তোমার সাক্ষী!’ আতঙ্কে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল মারার হাতি। সৈন্যরা আতঙ্কে দৌড়ে দিকবিদিক সটকে গেল।[৩৪] পৃথিবীর সাক্ষীর ভঙ্গি, যেখানে বুদ্ধকে পদ্মাসনে বসে জমিনের দিকে ডান হাত বাড়ানো ভঙ্গিতে থাকতে দেখা যায়, বৌদ্ধ শিল্পকলার একটা প্রিয় আইকন। এটা কেবল মারার নির্জীব পৌরুষের বিরুদ্ধে গৌতমের প্রত্যাখ্যানই দেখায় না, বরং এই গভীর যুক্তি তুলে ধরে যে, বুদ্ধ প্রকৃতই পৃথিবীর মানুষ। ধম্ম কষ্টকর হলেও প্রকৃতিবিরুদ্ধ নয়। পৃথিবীর সাথে নিঃস্বার্থ মানুষের রয়েছে এক গভীর সখ্যতা। গোলাপজাম গাছের নিচের সেই ঘোরের কথা মনে করে এটা বুঝতে পেরেছিলেন গৌতম। আলোকন-প্রত্যাশী নারী-পুরুষ মহাবিশ্বের মৌল কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। জগৎ মারা ও তাঁর সেনাদলের সহিংসতায় শাসিত মনে হলেও প্রেমময় বুদ্ধই অস্তিত্বের মৌল বিধিমালার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানানসই।
মারার বিরুদ্ধে, আসলে যা নিজের বিরুদ্ধেই, বিজয়ের পর গৌতমকে পিছু টানার মতো আর কিছু ছিল না। দেবতারা স্বর্গ হতে ফিরে এসে তাঁর চূড়ান্ত মুক্তি প্রত্যক্ষ করার জন্যে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলেন, কারণ যেকোনও মানুষের মতো তাঁদেরও গৌতমের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। এবার প্রথম ঝানায় প্রবেশ করলেন গৌতম, তারপর নিজের মনের অন্তস্থ জগতে অনুপ্রবেশ করলেন। অবশেষে নিব্বানার শান্তিতে প্রবেশ করার পর বৌদ্ধবিশ্বের জগৎসমূহ কেঁপে উঠেছিল, স্বর্গ ও নরক আন্দোলিত হয়েছে। বোধিবৃক্ষ আলোকপ্রাপ্ত পুরুষের ওপর লাল ফুল ঝরিয়েছে। গোটা জগৎ জুড়ে,
ফুল গাছ সুশোভিত হয়ে উঠল: ফলজ গাছ নুয়ে পড়ল ফলভারে; গাছে গাছে ফুটল স্থলপদ্ম…দশ হাজার জগতের ব্যবস্থা যেন হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া ফুলের তোড়ার মতো।[৩৫]
সাগর লোনা স্বাদ হারিয়ে ফেলল। অন্ধ ও মুকরা দেখতে ও শুনতে পেল। পঙ্গুরা ফিরে পেল চলৎশক্তি। কারাগারের বন্দিদের শেকল খসে পড়ল। সহসা সমস্ত কিছু মুক্তি ও সম্ভাবনার দেখা পেল: কয়েক মুহূর্তের জন্যে জীবনের প্রতিটি ধরণ আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।
