পালি টেক্সটে বর্ণিত বোধি বৃক্ষের নিচে বুদ্ধের আলোকপ্রাপ্তির বিবরণ আধুনিক পাঠককে হতবুদ্ধি ও হতাশ করতে পারে। দক্ষ যোগি নয় এমন মানুষের কাছে থেরাভেদীয় ধর্মগ্রন্থগুলো যেসব ক্ষেত্রে অস্পষ্ট হয়ে গেছে, এটা তেমনি একটা; কারণ ধ্যানের কৌশলাদি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এখানে। নিদান কথা নামের পরবর্তী কালের ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত কাহিনী বহিরাগত কারও কাছে অধিকতর সহায়ক, যা আলোকনের ধারণাকে সাধারণ মরণশীলের পক্ষে অধিকতর বোধগম্য করে তুলেছে। গৌতমের ‘অগ্রসর হওয়া’র কাহিনীর মতোই এখানে এমনভাবে আলোকনের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের সন্ধান করা হয়েছে যে একজন সাধারণ মানুষ বা বৌদ্ধ শিক্ষব্রতী বুঝতে পারবে। এখানে কোনও যোগ পরিভাষা নেই। আমাদের কাছে আলোকনের সম্পূর্ণ পৌরাণিক বর্ণনা দেয়। লেখক আমাদের ধারণা অনুযায়ী ইতিহাস রচনার প্রয়াস পাচ্ছেন না, বরং নিব্বানার আবিষ্কারে কী জড়িত ছিল দেখাতে সময়হীন ইমেজারি অঙ্কন করেছেন। মিথলজির সাধারণ মটিফ ব্যবহার করেছেন তিনি, যা মনের অভ্যন্তরীণ পথের সন্ধান এবং অসচেতন মনের আবছা জগৎকে স্পষ্টতর করে তোলার জন্যে মনস্তত্ত্বের প্রাক-আধুনিক রূপ হিসাবে চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে। বৌদ্ধ মতবাদ আবশ্যিকভাবে মনস্তাত্ত্বিক ধর্ম। সুতরাং, এটা বিস্ময়কর নয় যে, প্রাচীন বৌদ্ধ লেখকগণ মিথোলজির এমন সুদক্ষ প্রয়োগ দেখিয়েছেন।[২৮] আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে এইসব টেক্সটের কোনওটাই কিন্তু আসলে কী ঘটেছিল তা জানাচ্ছে না বরং শ্রোতাকে তার নিজস্ব আলোকপ্রাপ্তিতে সাহায্য করতে চেয়েছে।
নিদান কথা সাহস ও প্রতিজ্ঞার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিচ্ছে; এটা দেখাচ্ছে গৌতম নিজের মাঝে নিব্বানা অর্জনের বাধা সৃষ্টিকারী সকল শক্তির বিরুদ্ধে এক বীরত্বসূচক সংগ্রামে লিপ্ত। আমরা পড়েছি, জাউ খাওয়ার পর মুক্তি লাভের শেষ প্রয়াস চালাতে সিংহের মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে বোধি বৃক্ষের দিকে এগিয়ে গেছেন গৌতম। সেইরাতেই লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। প্রথমে নিব্বানা অর্জনের সময় পূর্ববর্তী বুদ্ধগণ কোথায় বসেছিলেন জানার জন্যে গাছটার চারপাশে চক্কর দিয়েছেন তিনি। কিন্তু তিনি যেখানেই দাঁড়িয়েছেন দেখেছেন, ‘বিশাল জমিন ওঠা-নামা করছে, যেন একটা বিশাল ঠেলাগাড়ির চাকা কেন্দ্রের ওপর পড়ে আছে এবং কেউ ওটার কিনারা বরাবর হাঁটছে।[২৯] অবশেষে গাছের পুব দিকে এগিয়ে গেলেন গৌতম। সেখানে দাঁড়াতেই জমিন স্থির হয়ে গেল। গৌতম সিদ্ধান্তের পৌঁছলেন, নিশ্চয়ই এটা সেই ‘নিশ্চল স্থান’ যেখানে অতীতের বুদ্ধগণ অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং ভোরের অঞ্চল পুবদিকে ফিরে আসন পেতে বসলেন তিনি। মনে দৃঢ় প্রত্যাশা, মানুষের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে যাচ্ছেন। ‘দেহের রক্ত-মাংসসহ আমার ত্বক, পেশি, হাড় শুকিয়ে যাক। আমি মেনে নেব!’ শপথ নিলেম গৌতম। ‘কিন্তু পরম ও চূড়ান্ত প্রজ্ঞা অর্জন না করে এখান থেকে নড়ব না।[৩০]
গৌতম গাছ ঘিরে চক্কর দেওয়ার সময় পৃথিবীর বিচিত্র কম্পনের ওপর জোর দিয়ে টেক্সট আমাদের এই কাহিনী আক্ষরিক অর্থে পাঠ না করার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এটা কোনও বাস্তব স্থান নয়; মহাজগতের অক্ষে দাঁড়ানো জগৎ-বৃক্ষ নিষ্কৃতির পুরাণের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এখানেই স্বর্গীয় শক্তি পৃথিবীতে আসে। সেখানে মানুষ পরমের দেখা পায় ও পরিপূর্ণতায় এক হয়ে যায়। আমাদের শুধু মনে রাখতে হবে, ক্রিশ্চান কিংবদন্তী অনুযায়ী জেসাসের ক্রস স্বর্গোদ্যানের জ্ঞান ও পাপ বৃক্ষের মতোই একই জায়গায় অবস্থিত। কিন্তু বৌদ্ধ মিথে ঈশ্বর-মানুষ নন বরং মানুষ গৌতমই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসেছিলেন, কারণ মানুষকে অবশ্যই অতিলৌকিক সাহায্য ছাড়াই আত্মরক্ষা করতে হবে। টেক্সট এটা পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে, গৌতম মহাবিশ্বের অক্ষে, সমগ্র সৃষ্টি জগতকে ধরে রাখা কিংবদন্তীর কেন্দ্রে পৌঁছেছেন। এই ‘নিশ্চল স্থান’ সেই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যা আমাদের জগৎ ও নিজেদের নিখুঁত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় দেখতে সক্ষম করে তোলে। মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা ও সঠিক পরিচিতি ছাড়া আলোকন অসম্ভব; সেকারণেই সকল বুদ্ধকে–মনের এই অবস্থা অর্জনের জন্যে-নিব্বানা অর্জনে সফল হয়ে ওঠার আগে এখানেই আসন গ্রহণ করতে হয়েছে। এটাই সেই মান্দি অক্ষ, নিশ্চল বিন্দু যেখানে বহু বিশ্ব কিংবদন্তীতে মানুষ বাস্তব ও অনিয়ন্ত্রিতের মোকাবিলা করেছে। এটাই সেই ‘স্থান’ সেখানে সমস্ত কিছু জাগতিক বিশ্বে বিপরীত মনে হওয়া জীবন ও মৃত্যু, শূন্যতা ও প্রাচুর্য, লৌকিক ও অলৌকিক চাকার কেন্দ্রে এসে স্পোকের মতো স্বাভাবিক সচেতনতায় অকল্পনীয় coincidentia oppositorum-এ মিলিত হয়ে পবিত্রতার অনুভূতি সৃষ্টি করে।[৩১] গৌতম যখন ছেলেবেলোয় গোলাপজাম গাছের নিচের অনুরূপ নিখুঁত ভারসাম্যে পৌঁছেছিলেন, যখন তাঁর সমস্ত ইন্দ্ৰিয় একাগ্র হয়ে উঠেছে, তাঁর অহমবাদ নিয়ন্ত্রণাধীনে আসার পরেই, তাঁর বিশ্বাস মতো তিনি ‘অটল স্থানে’ বসতে তৈরি হয়েছিলেন। অবশেষে পরম আলোক গ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন তিনি।
