যদিও সত্যিসমূহ যৌক্তিক অর্থ প্রকাশ করে, কিন্তু টেক্সট জোর দেয় যে, যৌক্তিক প্রক্রিয়ায় এগুলো গৌতমের কাছে ধরা দেয়নি। বোধি বৃক্ষের নিচে বসে ধ্যান করার সময় যেন তাঁর সত্তার গভীরতা হতে তাঁর মাঝে ‘জেগে উঠেছে’। তিনি ‘আন্তরিকতা, উৎসাহ ও আত্মনিয়ন্ত্রণে’র ভেতর দিয়ে যোগ অনুশীলন চর্চাকারী যোগির অর্জিত ‘প্রত্যক্ষ জ্ঞানের’ মতো কিছুর সাহায্যে নিজের ভেতর উপলব্ধি করেছেন। গৌতম এমন নিবিড়ভাবে তাঁর ধ্যানের লক্ষ্য এইসব সত্যির মাঝে নিমগ্ন ছিলেন যে, কোনও কিছুই এগুলো ও তাঁর হৃদয়- মনের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মানুষ যখন তাঁর মতো আচরণ করে এবং ঘটনার প্রতি সাড়া দেয়, ধম্মের রূপ দেখতে পায় তারা, মানবীয় রূপে নিব্বানার দেখা পায়। গৌতমের অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে হলে আমাদেরকে সম্পূর্ণ আত্ম-পরিত্যাগের চেতনায় সত্যির দিকে অগ্রসর হতে হবে। আমাদেরকে আমাদের পুরোনো অজাগ্রত সত্তাকে পেছনে ফেলে যেতে প্রস্তুত থাকতে হবে। শিক্ষাব্রতী সব রকম অহমবাদ দূরে ঠেলে দিতে তৈরি থাকলেই কেবল গৌতম আবিষ্কৃত প্রেমময় নৈতিকতা ও যোগ মুক্তি এনে দেবে। এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে, বোধি বৃক্ষের নিচে নিব্বানা লাভের মুহূর্তে গৌতম ‘আমি মুক্ত বলে চেঁচিয়ে ওঠেননি, বরং বলেছেন ‘এটা মুক্তি পেয়েছে।[২৪] নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। এক ধরনের exstasis অর্জন করেছেন। নিজের মানবীয় সত্তার এক পরিবর্ধিত ‘অপরিমেয়’ মাত্রা আবিষ্কার করেছেন, যার কথা তাঁর আগে জানা ছিল না।
বসন্তের সেই রাতে নিব্বানা লাভের দাবি করে কী বুঝিয়েছিলেন নতুন বুদ্ধ? তিনি স্বয়ং কি শব্দের অর্থ অনুযায়ী মোমবাতির শিখার মতো ‘নিভে গিয়েছিলেন’? ছয় বছর ব্যাপী অন্বেষণকালে গৌতম মর্ষকামীর মতো নিশ্চিহ্নতাকে আমন্ত্রণ জানাননি, আলোকনের সন্ধান করেছেন তিনি। মানুষ হিসাবে আপন সম্ভাবনার পূর্ণতায় জাগ্রত হতে চেয়েছেন। নিভে যেতে চাননি 1 নিব্বানা ব্যক্তিগত বিলুপ্তি বোঝায়নি, ব্যক্তিত্ব নয়, নিভে গিয়েছিল তাঁর লোভ, ঘৃণা ও কুহকের অগ্নিশিখা। ফলে এক আশীর্বাদময় ‘শীতলতা’ ও শান্তি বোধ করেছেন তিনি। মনের ‘অসহায়ক’ অবস্থাগুলোকে চাপা দিয়ে বুদ্ধ স্বার্থহীনতা হতে উদ্ভুত শান্তি অর্জন করেছেন। এটা এমন একটা অবস্থা যা আমরা যারা এখনও আমাদেরকে অন্যের প্রতি বৈরী করে তোলা ও আমাদের দৃষ্টিকে বিকৃতকারী অহমবাদের আকাঙ্ক্ষায় বিজড়িত তাদের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব নয়। সেজন্যেই আলোকপ্রাপ্তির পরবর্তী বছরগুলোয় বুদ্ধ সবসময় নিব্বানাকে সংজ্ঞায়িত বা বর্ণনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, তেমন কিছু করাটা ‘অসঙ্গত’ হবে, কারণ অনালোকিত কোনও মানুষের কাছে এমন একটা অবস্থার বর্ণনা দেওয়ার উপযোগি কোনও শব্দ নেই।[২৫] নিব্বানা লাভের অর্থ এমন ছিল না যে বুদ্ধ আর কখনওই দুঃখ-কষ্ট বোধ করবেন না। তিনি বৃদ্ধ হবেন, অসুস্থ হয়ে আর সবার মতোই মারা যাবেন এবং এসব ক্ষেত্রে কষ্ট পাবেন। নিব্বানা জাগ্রত ব্যক্তিকে ঘোরের মতো নিষ্কৃতি দেয় না, বরং দুঃখ- কষ্টের মাঝে এমন এক অন্তস্থ আশ্রয় যোগায় যা নারী ও পুরুষকে কষ্টের সঙ্গে মানিয়ে নিতে, একে আয়ত্ত করতে, নিশ্চিত করতে ও গভীর মানসিক স্তরে শান্তি অনুভব করতে শেখায়। সুতরাং, যে কারও মাঝেই, প্রত্যেকের সত্তার একান্ত গভীরে নিব্বানার দেখা মেলে। এটা নেহাতই স্বাভাবিক একটা অবস্থা, কোনও অতিলৌকিক ত্রাতা আমাদের জন্যে অর্জন করেননি বা কারও করুণায় অবতীর্ণ হয়নি। গৌতমের মতো একাগ্রতার সঙ্গে আলোকনের পথের বিকাশ ঘটালে যে কেউ এটা অর্জন করতে পারে। নিব্বানা এক অটল কেন্দ্র; এটা জীবনকে অর্থ দেয়। যারা এই প্রশান্ত স্থানের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে ও এই লক্ষ্যে জীবন পরিচালিত করে না, তারা ভেঙে পড়তে পারে। শিল্পী, কবি, সঙ্গীত শিল্পী কেবল শান্তি ও শুদ্ধতার এই অন্তস্থ কেন্দ্রে পৌঁছানোর সুযোগ পেলে তখন সে আর সংঘাতময় আতঙ্ক ও আকাঙ্ক্ষায় পরিচালিত হয় না, প্রশান্তির সঙ্গে বেদনা, বিষাদ ও শোক মোকাবিলা করতে পারে। একজন আলোকপ্রাপ্ত বা জাগ্রত মানুষ নিজের মাঝে এক শক্তি আবিষ্কার করেছে যা স্বার্থপরতার নাগালে বাইরে যথাযথভাবে স্থাপিত সত্তা হতে উদ্ভূত।
একবার শান্তির এই অস্তস্থ বলয়, অর্থাৎ নিব্বানার দেখা পাবার পর, গৌতম পরিণত হয়েছিলেন বুদ্ধে। অহমবাদের বিনাশ ঘটাতে পারলে নতুন অস্তিত্ব জাগিয়ে তোলার মতো শিখা বা জ্বালানি থাকবে না, এব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি, কারণ তাঁকে সামসারার সঙ্গে বন্ধনে জড়িতকারী আকাঙ্ক্ষার পুরোপুরি বিনাশ ঘটেছে। মৃত্যুর পর পরিনিব্বানা, চূড়ান্ত বিশ্রাম লাভ করবেন তিনি। তবে অনেক সময় পশ্চিমাবাসীরা যেমন মনে করে, এটা সম্পূর্ণ বিলুপ্তি বোঝায়নি। পরিনিব্বানা এক ধরনের অস্তিত্ব নিজেরা আলাকপ্রাপ্ত না হলে আমরা যা বুঝতে পারব না। এর বর্ণনা দেওয়ার মতো কোনও ভাষা বা তত্ত্ব নেই, কারণ আমাদের ভাষা উদ্ভুত হয়েছে আমাদের অসুখী জাগতিক অস্তিত্বের ইন্দ্রিয়জ উপাত্ত হতে; অহমবাদের অস্থিত্বহীন একটা জীবনের কল্পনা করতে পারি না আমরা। কিন্তু তাই বলে তেমন একটা অস্তিত্ব অসম্ভব বোঝায় না। মৃত্যুর পর একজন আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তি আর অস্তিত্বশীল থাকবে না বিশ্বাস করা বৌদ্ধ বিশ্বাসের পরিপন্থী।[২৬] একইভাবে একেশ্বরবাদীরা জোর দিয়ে বলেছে, যে সত্তাকে তারা ‘ঈশ্বর’ নামে ডাকে তাঁর যথার্থ বর্ণনা দেওয়ার মতো কোনও ভাষা নেই। পরবর্তী জীবনে বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের বলবেন, ‘চূড়ান্ত বিশ্রামে (পরিনিব্বানা) গমনকারীকে কোনওভাবে সংজ্ঞায়িত করা যাবে না। তাকে বর্ণনা করার মতো কোনও ভাষা নেই। চিন্তা যা ধরতে পারত তা বাতিল হয়ে গেছে, তেমনি সবধরনের ভাষাও।’[২৭] একেবারে জাগতিক ভাষায় নিব্বানা ‘কিছু না’, সেটা অস্তিত্বহীন বলে নয়, বরং তা আমাদের জানা কোনও কিছুর সঙ্গে মেলে না বলে। কিন্তু যারা যোগ অনুশীলন ও প্রেমময় নৈতিকতার মাধ্যমে আপন সত্তায় অটল কেন্দ্রের সন্ধান পেয়েছে তারা অপরিমেয় সমৃদ্ধ সত্তার দেখা লাভ করেছে, কারণ অহমবাদের সীমাবদ্ধতা ছাড়া বাঁচতে শিখেছে তারা।
