এইসব সত্যের কোনও অসাধারণ মৌলিকত্ব আছে বলে মনে হয় না। উত্তর ভারতীয় বেশিরভাগ সাধু-সন্ন্যাসী প্রথম তিনটির সঙ্গে একমত হতো। গৌতম স্বয়ংও তাঁর অনুসন্ধানের একেবারে গোড়া হতে এগুলোর সত্যতায় বিশ্বাসী ছিলেন। নতুন কিছু থাকলে সেটা চতুর্থটি, যেখানে গৌতম আলোকনের পথ পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। মহান অষ্টশীলা পথ। এর আটটি উপাদানকে নৈতিকতা, ধ্যান এবং প্রজ্ঞার সমন্বয়ে তিন পর্যায়ের কর্মধারায় অধিকতর যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছে।
[১] নৈতিকতা (শিলা): সত্য কথন, সত্য কর্ম এবং সঠিক জীবিকা যার অন্তর্ভূক্ত। এখানে আমাদের আলোচনা অনুযায়ী ‘দক্ষ’ অবস্থার বিকাশ সাধন আবশ্যিকভাবে জড়িত।
[২] ধ্যান (সমাধি): সঠিক প্রয়াস, অভিনিবেশ ও মনোসংযোগের অধীনে গৌতমের পরিমার্জিত যোগ অনুশীলন এর অন্তর্ভূক্ত।
[৩] প্রজ্ঞা (পান্না): সঠিক উপলব্ধি ও সঠিক সিদ্ধান্তের দুটি গুণ শিক্ষার্থীকে নৈতিকতা ও ধ্যানের সাহায্যে বুদ্ধের ধম্মকে উপলব্ধি, প্রত্যক্ষভাবে প্রবেশ ও একে পরবর্তী অধ্যায়ে আমাদের আলোচনা অনুযায়ী তার জীবনে আত্মস্থ করতে সক্ষম করে তোলে।
বোধ গয়ায় রাতারাতি গৌতমের আলোকপ্রাপ্তির কাহিনীতে কোনও সত্যি থেকে থাকলে সেটা এমন হতে পারে যে, তিনি সহসা এমন একটা পদ্ধতি আবিষ্কারের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চয়তা লাভ করেছিলেন যা সউদ্যমে অনুসরণ করলে একজন নিবিষ্ট সন্ধানীকে নিব্বানায় পৌঁছে দেবে। তিনি এটা নিৰ্মাণ করেননিঃ এটা তাঁর নতুন সৃষ্টি বা উদ্ভাবন ছিল না। উল্টো, তিনি সবসময়ই জোর দিয়ে ‘সুপ্রাচীন কালের একটা পথ আবিষ্কারের’ কথা বলেছেন যে পথে ‘বহুযুগ আগের মানুষ চলাচল করেছে।’[২০] তাঁর পূর্বসুরি অন্য বুদ্ধগণ গণনার অতীত দীর্ঘদিন আগে এই পথের শিক্ষা দিয়েছিলেন, কিন্তু এই প্রাচীন জ্ঞান বছর পরিক্রমায় ম্লান হয়ে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছে। গৌতম জোর দিয়ে বলেছেন, এই দর্শন স্রেফ বস্তুর ‘প্রকৃত রূপের’ বিবরণ; অস্তিত্বের মূল কাঠামোতেই এই পথের উপস্থিতি। সুতরাং এটাই ধম্ম-এর সর্বোচ্চ রূপ, কারণ তা বিশ্ব জগতের জীবনধারা পরিচালনাকারী মৌলিক নীতিমালা ব্যাখ্যা করে। এপথে থাকলে নারী-পুরুষ, পশুপাখী ও দেবতাদের সবাইই আলোকপ্রাপ্ত হতো যা এনে দিত শান্তি ও সম্পূর্ণতা, কারণ তখন আর তারা তাদের গভীরতম উপাদানের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত থাকত না।
কিন্তু এটা অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে চারটি মহান সত্যিকে কেবল যৌক্তিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যাচাই করা যাবে নাঃ এগুলো স্রেফ কল্পিত বৈচিত্র্য নয়। বুদ্ধের ধম্ম আবশ্যিকভাবে একটা পদ্ধতি। কেবল অধিবিদ্যিক সূক্ষ্মতা কিংবা বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতার কারণেই এটা সফল বা ব্যর্থ হয় না, বরং কতদূর পর্যন্ত কাজ করছে তার ওপর নির্ভর করে। সত্যসমূহ দুঃখ-কষ্টের সমাপ্তি আনে বলে দাবি করা হয়, সেটা মানুষ কোনও পরিত্রাণমূলক বিশ্বাসে বা নির্দিষ্ট বিশ্বাসে আস্থা স্থাপন করে বলে নয়, বরং তারা গৌতমের কর্মধারা বা জীবন ধারা অবলম্বন করে বলে। শত শত বছরের পরিক্রমায় নারী-পুরুষ প্রকৃতপক্ষেই এইসব নিয়ম-কানুন এক ধরনের শান্তি ও অন্তর্দৃষ্টি এনে দিয়েছে বলে আবিষ্কার করেছে। অ্যাক্সিয়াল যুগের অন্য সকল সাধুদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত বুদ্ধের দাবি ছিল যে, নিজেকে অতিক্রম করে এক দুৰ্জ্জেয় সত্তায় পৌঁছানোর মাধ্যমে যৌক্তিক উপলব্ধি ছাপিয়ে নারী-পুরুষ পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠে। বুদ্ধ কখনও চারটি সত্যের জ্ঞান অনন্য সাধারণ বলে দাবি করেননি। কিন্তু বর্তমান কালে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি এসব ‘উপলব্ধি’ করতে পেরেছেন ও সেগুলোকে নিজ জীবনে বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন। আকাঙ্ক্ষা, ঘৃণা ও অজ্ঞতাকে ধ্বংস করেছেন বলে আবিষ্কার করেছেন, মানুষকে যা বন্দি করে রাখে। নিব্বানা অর্জন করেছিলেন তিনি। যদিও এখনও শারীরিক অসুস্থতা ও অন্যান্য উত্থান-পতনের শিকার হন তিনি, কিন্তু তাই বলে কোনও কিছুই তাঁর অন্তস্থ-শান্তিকে স্পর্শ করতে পারবে না কিংবা গুরুতর মানসিক পীড়ার কারণ হবে না। তাঁর পদ্ধতি কাজে এসেছে। বোধি বৃক্ষের নিচে সেই গুরুত্বপূর্ণ রাতের শেষে বিজয়ীর সুরে চিৎকার করে উঠেছিলেন তিনি, ‘পবিত্র জীবন শেষ পর্যন্ত যাপন করা হয়েছে! যা করার ছিল, সম্পাদন করা হয়েছে। আর কিছু করার নেই।’[২১]
আমরা যারা নৈতিকতা ও ধ্যানের বৌদ্ধ কর্মসূচি অনুযায়ী চলি না তাদের পক্ষে এই দাবি যাচাই করার কোনও উপায় নেই। বুদ্ধ বরাবর পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, স্রেফ যৌক্তিক চিন্তা দিয়ে তাঁর ধম্ম বোঝা যাবে না। কেবল যোগি পদ্ধতিতে ও সঠিক নৈতিক পটভূমিতে ‘প্রত্যক্ষভাবে’ বুঝতে পারলেই তা আসল তাৎপর্য নিয়ে প্রকাশিত হয়।[২২] চারটি মহান সত্যি যৌক্তিক অর্থ প্রকাশ করে বটে, কিন্ত শিক্ষার্থী এক গভীর স্তরে সেগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে সেগুলোকে নিজ জীবনে আত্মস্থ না করা পর্যন্ত তা আবশ্যক হয়ে ওঠে না। তখন, একমাত্র তখনই সে ‘মহাউল্লাস,’ ‘আনন্দ’ ও ‘প্রশান্তি’ অনুভব করবে। পালি টেক্সট অনুযায়ী আমরা আমাদের অহমবাদ বিসর্জন দিলে, আত্মকেন্দ্রিকতা হতে নিজেদের মুক্ত করলে ও সত্যকে ‘তার আসল রূপে’ প্রত্যক্ষ করলে আমাদের কাছে তা ধরা দেয়।[২৩] বুদ্ধের নির্দেশিত ধ্যান ও নৈতিকতা বাদে সত্যি সঙ্গীতের মতোই বিমূর্ত রয়ে যায়, আমাদের বেশিরভাগই কাগজের পাতায় তার আসল সৌন্দর্য ধরতে পারি না, বরং কোনও দক্ষ শিল্পীর বাদন ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়।
