অভিনিবেশ ও অপরিমেয় উভয়ের উদ্দেশ্য ছিল সেই অহমবাদের ক্ষমতাকে নিরপেক্ষ করা যা মানুষের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে। ‘আমি চাই’ না বলে যোগি অন্যদের মঙ্গল কামনা করতে শেখে: আমাদের আত্ম-কেন্দ্রিক লোভের ফল ঘৃণার কাছে হার স্বীকার না করে গৌতম দয়া ও শুভেচ্ছার এক প্রেমময় আগ্রাসন পরিচালনা করছিলেন। যোগির প্রাবল্যের সঙ্গে এইসব ইতিবাচক, দক্ষ পর্যায়ের বিকাশ ঘটানো হলে আরও সহজে আমাদের মনের অচেতন প্রবণতায় প্রবেশ করে অভ্যাসে পরিণত করবে। ভঙ্গুর অহমকে বাঁচাতে আমরা আমাদের ও অন্যদের ভেতর যেসব বাধা গড়ে তুলি সেগুলোকে ধ্বংস করাই অপরিমেয়র নকশার উদ্দেশ্য: এগুলো সত্তার বৃহত্তর আওতা ও বর্ধিত দিগন্তের সন্ধান করে। মন স্বাভাবিক, স্বার্থপর দৃষ্টিভঙ্গি হতে মুক্ত হয়ে অন্য সকল সত্তাকে আলিঙ্গন করার সময় ‘প্রসারণশীল, সীমাহীন, বর্ধিত, ঘৃণা বা তুচ্ছ বৈরিতামুক্ত’ হওয়ার অনুভূতি জাগে। এখনকার অনুভূত সচেতনতা জগতকে ঘিরে রাখা ‘দক্ষ শাখারির ফু’-এর শব্দের মতোই অসীম মনে হয়। একেবারে উঁচু পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হলে দরদের এই যোগ (করুণা) ‘মনের মুক্তি’ (সেতো-বিমুক্তি) বয়ে আনে, এই পরিভাষাটি পালি টেক্সটে খোদ আলোকপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।[১৫] অভিনিবেশের অনুশীলনের মাধ্যমেও, বিশেষ করে প্রাণায়ামের সঙ্গে যুক্ত হওয়া অবস্থায় এক গভীরতর প্রশান্তি অনুভব করতে শুরু করেছিলেন গৌতম। আমাদের নিজস্ব প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার তুচ্ছ সীমানায় আবদ্ধ করে আমাদের জীবন ও অন্যদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে বিষময় করে তোলা স্বার্থপর কামনা হতে মুক্ত অবস্থায় জীবন যাপনের রূপ আবিষ্কার করছিলেন তিনি। এসব উচ্ছৃঙ্খল আকাঙ্ক্ষায় হ্রাসমানহারে প্রভাবিত হচ্ছিলেন। দেখা গেছে, এই ধরনের আত্ম-পর্যালোচনার অভ্যাস বৌদ্ধ অনুশীলনকারীদের আমাদের শান্তি হতে বঞ্চিতকারী বিচ্যুতিসমূহ জরিপে সাহায্য করেছে: ধ্যানী ওইসব হানাদার চিন্তা ও চাহিদার ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতি সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠার সাথে সাথে সেগুলোর সঙ্গে নিজেকে মেলানো বা কোনওভাবে সেগুলোকে ‘আমার’ হিসাবে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সেগুলো কম বিঘ্ন সৃষ্টিকারী হয়ে পড়ে।[১৬]
বহু বছরের কৃচ্ছ্রতা সাধনের পর স্বাস্থ্য উদ্ধারে গৌতমের কত দীর্ঘ সময় লেগেছিল আমরা জানি না। ধর্মগ্রন্থগুলো নাটকীয় রূপ দেওয়ার জন্যে প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। ধারণা দিয়েছে যে, গৌতম প্রথম জাউ খাবার পরপরই নিজের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন। এটা সত্যি হতে পারে না। অভিনিবেশ ও দক্ষ অবস্থার বিকাশে সময় লাগে। স্বয়ং গৌতম বলেছেন, এতে অন্তত সাত বছর লাগতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় অলক্ষে নতুন সত্তা গড়ে উঠবে। ‘ঠিক সাগর যেমন ক্রমশঃ ঢালু হয়ে যায়, ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, আর কোনও রকম আকস্মিক খাদ ছাড়াই ক্রমশঃ ঢালু হয়,’ পরে শিষ্যদের সতর্ক করেছেন তিনি, ‘এই পদ্ধতিতেও তেমনি পরম সত্যের আকস্মিক কোনও অনুভূতি ছাড়াই প্রশিক্ষণ, অনুশীলন ও চর্চা ধীর মাত্রায় কার্যকর হয়।’[১৭] টেক্সট দেখায় যে, গৌতম রাতারাতি পরম আলোকপ্রাপ্ত হয়ে বুদ্ধে পরিণত হয়েছেন, কারণ এগুলো ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে নয়, মুক্তি ও অভ্যন্তরীণ শান্তি অর্জন প্রক্রিয়ার সাধারণ বাঁক অনুসন্ধানেই বেশি আগ্রহী।
এভাবে ধর্মগ্রন্থের অন্যতম প্রাচীন অংশে আমরা পড়ি, গৌতম তাঁর পাঁচ সঙ্গী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়েছিলেন। প্রথম খাদ্য গ্রহণের পর পরিপুষ্ট হয়ে সহজভাবেই উরুবেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তিনি, নিরঞ্জর নদীর পাশে সেনানীগামায় পৌঁছার পর ‘পছন্দসই একটুকরো জমিন, একটা মুগ্ধকর বন, চমৎকার মসৃণ তীর অলা একটা নদী এবং একটা গ্রাম, যে গ্রামের অধিবাসীরা তাকে খাওয়াবে,’[১৮] লক্ষ করলেন। গৌতম ভাবলেন, এটাই চূড়ান্ত প্ৰয়াস গ্রহণের উপযুক্ত জায়গা, যা তাঁকে আলোকপ্রাপ্তি এনে দেবে। গোলাপজাম গাছের নিচের সেই অনায়াস প্রথম ঝানায় পৌঁছে দেওয়ার মতো প্রশান্ত সন্তুষ্টির পুনর্নির্মাণ করতে হলে ধ্যানের জন্যে একটা জুৎসই স্থান খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজন ছিল। ট্র্যাডিশন বলছে, একটা বোধি বৃক্ষের নিচে বসে নিব্বানা লাভ না করা পর্যন্ত জায়গা না ছাড়ার শপথ নিয়ে আসন গ্রহণ করেন তিনি। মনোরম সেই বন এখন তীর্থযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ স্থান বোধ গয়া নামে পরিচিত, কারণ মনে করা হয় এখানেই গৌতম যথাভূতো–আলোকন বা জাগ্রত হওয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন।
বসন্তের শেষ সময় ছিল সেটা। পণ্ডিতগণ সাধারণত গৌতমের আলোকপ্রাপ্তির সময়কে মোটামুটি বিসিই ৫২৪ সাল নির্ধারণ করেছেন, যদিও কেউ কেউ পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম ভাগে আরও পরের সময়ের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন। সে রাতে কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে পালি টেক্সট আমাদের কিছু তথ্য যোগায়, কিন্তু বৌদ্ধদের নিয়ম কানুনের অভিজ্ঞতাহীন কারও কাছে এসব তেমন অর্থ বহন করে না। এসব তথ্য জানায় যে, আমাদের জানা সকল জীবনের শর্তাধীন প্রকৃতি নিয়ে ভেবেছেন গৌতম, নিজের গোটা অতীত জীবন দেখতে পেয়েছেন, এবং তারপর সেই ছেলেবেলার ‘বিচ্ছিন্ন’ ও নিঃসঙ্গ অবস্থা নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। এরপর অনায়াসে প্রথম ঝানায় প্রবেশ করেছেন তিনি এবং তারপর ক্রমান্বয়ে উচ্চতর পর্যায় হয়ে তাঁকে চিরতরে বদলে দেওয়া অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে চেতনার এমন অবস্থায় পৌঁছে গেছেন যা তাঁর মনে বিশ্বাস জাগিয়েছে, নিজেকে সামসারা ও পুনর্জন্মের চক্র হতে মুক্ত করেছেন তিনি।[১৯] কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে চার মহান সত্যি হিসাবে পরিচিত ও বুদ্ধ মতবাদের মৌল শিক্ষা হিসাবে বিবেচিত এই অন্তর্দৃষ্টির বেলায় তেমন নতুনত্ব আছে মনে হয় না। এই বৈচিত্র্যের প্রথমটি হচ্ছে সমগ্র মানব জীবন ঘিরে থাকা ভোগান্তির (দুঃখ) মহান সত্যি। দ্বিতীয় সত্য হচ্ছে, এই ভোগান্তির কারণ আকাঙ্ক্ষা (তানহা)। তৃতীয় মহান সত্যে গৌতম জোর দিয়ে বলেছেন, এই বিপত্তি হতে উদ্ধারের উপায় হিসাবে নিব্বানার অস্তিত্ব এবং সব শেষে, তিনি নিব্বানার পর্যায়ে দুঃখকষ্ট ও বেদনা হতে অবসানের দিকে চলে যাওয়া পথের সন্ধান লাভ করার দাবি করেছেন।
