অভিনিবেশ গৌতমকে এই দুঃখ-কষ্টের কারণ আকাঙ্ক্ষা বা বাসনার ব্যাপকতার ব্যাপারেও দারুণভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছিল। অহম সর্বগ্রাসী, অবিরাম মানুষ ও অন্য জিনিস গ্রাস করতে চায়। আমরা কখনও কোনও কিছুকে তার আসল রূপে দেখি না। বরং আমরা সেগুলোকে চাই কিনা তারই ভিত্তিতে সেটা রঞ্জিত হয়, আমরা কীভাবে সেটা পাব, বা কেমন করে তা আমাদের জন্যে লাভ বয়ে আনবে। সুতরাং জগৎ সম্পর্কে আমাদের দর্শন লোভ দিয়ে বিকৃত। আমাদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অন্যদের বাসনার সংঘাত দেখা দিলে প্রয়াশঃই অশুভ ইচ্ছা ও বৈরিতার সৃষ্টি করে এটা। এখন থেকে গৌতম সাধারণভাবে ‘আকাঙ্ক্ষা’ (তানহা)র সঙ্গে ‘ঘৃণা’ (দোসা) শব্দটিকে জুড়ে দেবেন। আমরা যখন বলি, ‘আমি চাই’, প্রায়শঃই তখন অন্য কেউ আমাদের ইচ্ছায় বাধা দিলে বা আমরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছি সেখানে সফল হলে নিজেদের ঈর্ষা, হিংসা ও ক্রোধে পূর্ণ অবস্থায় আবিষ্কার করি। মনের এই ধরনের অবস্থা ‘অদক্ষ,’ কারণ আমাদের তা আরও বেশি স্বার্থপর করে তোলে। সুতরাং সহগামী আকাঙ্ক্ষা ও ঘৃণা এভাবে পৃথিবীর বেশিরভাগ ভোগান্তি ও অশুভের যুগ্ম কারণ। আকাঙ্ক্ষা একদিকে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী সন্তুষ্টি দেবে না এমন জিনিস ‘আঁকড়ে’ ধরতে বা ‘ছিনিয়ে’ নিতে প্ররোচিত করে। অন্যদিকে, বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমাদের অবিরাম অসন্তুষ্ট রাখে। মন ও হৃদয়ে একের পর এক বাসনা অধিকার গ্রহণ করছে, এর ফলেই তেমন কিছু পেতে চাইছে। যেমন অন্তহীনভাবে পুনর্জন্মের একটা ধরণ কামনা করছে তারা। এক নতুন ধরনের অস্তিত্ব। এমনকি আমাদের দৈহিক অবস্থানের পরিবর্তন, ভিন্ন কামরায় যাওয়া, নাশতা করা বা হঠাৎ কাজ রেখে কারও সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার মাঝেও বাসনা (তানহা) নিজেকে তুলে ধরে। ঘণ্টায় ঘণ্টায়, মিনিটে মিনিটে এইসব তুচ্ছ আকাঙ্ক্ষা আমাদের আক্রমণ করে, ফলে আমরা বিশ্রাম পাই না। আমরা ভিন্ন কিছু হবার আকর্ষণে নিঃশেষ ও বিক্ষিপ্ত হই। ‘জগতের স্বভাবই পরিবর্তিত হওয়া, অন্য কিছু হওয়ার জন্যে সবসময় প্রতিজ্ঞ সে,’ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন গৌতম। ‘এটা পরিবর্তনের নিয়ন্ত্রণাধীন, কেবল পরিবর্তনের ধারাতেই খুশি হয়। কিন্তু পরিবর্তনের প্রতি এই ভালোবাসা খানিকটা ভয় বহন করে। খোদ এই ভয়ই দুঃখ।[১০]
কিন্তু এই সত্য নিয়ে ভাববার সময় সাধারণ যৌক্তিক উপায় অবলম্বন করেননি গৌতম। এগুলোর সঙ্গে একাত্ম হওয়া লক্ষ্যে যোগের কৌশল অবলম্বন করেছেন তিনি যা এসব সাধারণ বিচারবুদ্ধির ভেতর দিয়ে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তের তুলনায় ঢের স্পষ্ট ও নিবিড়ভাবে সেগুলো যেন স্পষ্ট ও আন্তরিক হয়ে ওঠে। প্রতিদিন দৈনন্দিন খাবারের পক্ষে পর্যাপ্ত ভিক্ষা সংগ্রহের পর, সাধারণত দুপুরের আগেই খেতেন তিনি, একটা নিরিবিলি জায়গা খুঁজে বের করতেন গৌতম। আসন পেতে বসে যোগের একাগ্রতা বা মনোনিবেশের অনুশীলন শুরু করতেন।[১১] যোগের প্রেক্ষিতে অভিনিবেশের অনুশীলন করতেন তিনি। ফলে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি এক নতুন স্পষ্টতা পায়। তিনি ‘সরাসরি’ এগুলো দেখতে পেতেন, প্রবেশ করতেন এবং সেগুলোকে বিকৃতকারী আত্ম-রক্ষাকারী অহমবাদের ছাকুনি ছাড়াই পর্যবেক্ষণ করতে শিখতেন। মানুষ সচরাচর যন্ত্রণার সর্বব্যাপীতা উপলব্ধি করতে চায় না। কিন্তু গৌতম এখন প্রশিক্ষিত যোগির দক্ষতা নিয়ে ‘বস্তুর আসল রূপে’ সেগুলোকে দেখতে শিখছিলেন। তিনি অবশ্য এইসব অধিকতর নেতিবাচক সত্যে থেমে যাননি, বরং একইরকম ঐকান্তি কতায় ‘দক্ষ’ অবস্থারও লালন করছিলেন। কোনও ব্যক্তি, পরে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি, যোগ অনুশীলন করার সময়, পায়ের ওপর পা তুলে বসে প্রাণায়ামের শ্বাস-প্রশ্বাস অনুশীলনের মাধ্যমে সচেতনতার বিকল্প অবস্থা সৃষ্টি করে এইসব ইতিবাচক ও সহায়ক অবস্থার বিকাশ ঘটাতে পারে।
মন থেকে একবার পরশ্রীকাতরতা ও ঘৃণা তাড়াতে পারলে অসৎ ইচ্ছা বিহীন বাস করবে সে, প্রেমময়ও হয়ে উঠবে। সকল জীবিত সত্তার মঙ্গল কামনা করবে। একবার অলসতা ও নিস্পৃহতার মানসিক অভ্যাস ত্যাগ করার পর সে কেবল আলস্য ও নিস্পৃহতা থেকেই মুক্তি পাবে না, বরং এমন একটা মন পাবে যা সাবলীল, নিজের ব্যাপারে সজাগ ও সম্পূর্ণ সতর্ক…একবার উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দূর করার পর উদ্বেগহীন জীবন কাটাবে সে, হয়ে উঠবে শান্ত, অটল…একবার অনিশ্চয়তা দূর করতে পারলে এমন এক মন নিয়ে বাস করবে যা দুর্বলকারী সন্দেহ হতে মুক্ত ও অনুপকারী (অকুসলা) মানসিক অবস্থায় আক্রান্ত হবে না।
এভাবে যোগি তাঁর মনকে ঘৃণা, নিস্পৃহতা, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা হতে ‘নিষ্কলুষ করে তোলে।’[১২] ব্রাহ্মণরা বিশ্বাস করতেন, পশুবলীর আচরিক কম্ম সম্পাদনের ভেতর দিয়ে তাঁরা এই ধরনের আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করেছেন। কিন্তু গৌতম উপলব্ধি করেছিলেন, কোনও পুরোহিতের মধ্যস্থতা ছাড়াই, ধ্যানের মানসিক কম্ম দিয়ে যে কেউই এই পরিশুদ্ধতার বিকাশ ঘটাতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, যোগ কৌশলে যথেষ্ট গভীরতায় সম্পাদন করা হলে সচেতন ও অচেতন মনের অস্থির ও বিধ্বংসী প্রবণতাকে পরিবর্তন করতে পারে।
পরবর্তী বছরগুলোয়, গৌতম দাবি করেছেন, তাঁর উদ্ভাবিত যোগ পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের মানুষের জন্ম দিয়েছে যে কিনা আকাঙ্ক্ষা, লোভ ও অহমবাদের অধীনে নয়। এটা, ব্যাখ্যা করেছেন তিনি, খাপ থেকে বের করা তরবারি বা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা সাপের মতো; ‘তরবারি ও সাপ এক জিনিস; কিন্তু খাপ ও গর্ত সম্পূর্ণ আলাদা কিছু।’[১৩] তাঁর ব্যবস্থায় ধ্যান পশুবলীর স্থান দখল করবে। একই সঙ্গে প্রেমের অনুশীলন প্রাচীন শাস্তিমূলক কৃচ্ছ্রতার (তাপস) জায়গা নেবে। প্রেম, দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তাঁর, শিক্ষার্থীকে মানুষের এযাবৎ অজানা যাত্রায় প্রবেশের সুযোগ করে দেবে। আলারা কালামের সঙ্গে যোগ অনুশীলনের সময় চারটি পর্যায়ক্রমিক ঝানা পর্যায়ের ভেতর দিয়ে চেতনার উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছাতে শিখেছিলেন গৌতম; প্রতিটি ঘোর যোগিকে বৃহত্তর আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি ও পরিশুদ্ধতা এনে দেয়। এবার তিনি এই চারটি ঝানাকে সম্মিলিতভাবে তাঁর ভাষায় ‘অপরিমেয়’তে রূপান্তরিত করলেন। প্রতিদিনের ধ্যানে ইচ্ছাকৃতভাবে তিনি প্রেমের আবেগকে জাগিয়ে তুলতেন–”ঘৃণার সাথে অপরিচিত বিশাল, বিস্তৃত ও অপরিমেয় অনুভূতি–এবং তাঁকে পৃথিবীর চার কোণে পাঠিয়ে দিতেন। এই হিত সাধনের সংকল্প হতে কোনও কিছুই–গাছ, পশু, দানো, বন্ধু বা শত্রু–কাউকেই বাদ দিতেন না। প্রথম ঝানার অনুরূপ প্রথম ‘অপরিমেয়’তে তিনি সবকিছু ও সবার প্রতি বন্ধুত্বের একটা অনুভুতির বিকাশ ঘটান। এখানে দক্ষতা অর্জনের পর তিনি দ্বিতীয় ঝানার সাহায্যে সহানুভুতির বিকাশ ঘটাতে অগ্রসর হন। অন্য মানুষ ও বস্তুর সঙ্গে কষ্ট ভোগ করতে ও তাদের ব্যথায় সমবেদনা জানানো শেখেন, ঠিক যেমন গোলাপজাম গাছের নিচে ঘাস ও কীটপতঙ্গের কষ্ট অনুভব করেছিলেন। তিনি তৃতীয় ঝানায় পৌঁছানোর পর অন্যের সুখে আনন্দিত হওয়ার ‘প্রেমময় আনন্দের’ লালন করেছেন, সেটা কীভাবে তাঁকে লাভবান করতে পারে তা না ভেবেই। সব শেষে চতুর্থ ঝানা অর্জন করার পর, যেখানে যোগি ধ্যানের বস্তুর সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় সে যন্ত্রণা বা সুখের উর্ধ্বে উঠে যায়, আকর্ষণ বা বৈরিতার কোনও বোধ ছাড়াই গৌতম অন্য সবার প্রতি সামগ্রিক প্রশান্তি আকাঙ্ক্ষা করেন।[১৪] খুব কঠিন একটা পর্যায় ছিল এটা, কেননা এখানে যোগির সেই অহমবাদকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিতে হয় যা সবসময় অন্য বস্তু বা মানুষ কীভাবে কারও জন্যে সুবিধাজনক বা অসুবিধাজনক হতে পারে সেটা লক্ষ করে। এর জন্যে প্রয়োজন সকল ব্যক্তিগত পছন্দের পরিত্যাগ এবং সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ঔদার্য অবলম্বন। প্রথাগত যোগ যেখানে যোগির মাঝে এমন এক দুর্ভেদ্য স্বাধীনতা গড়ে তুলেছে যাতে করে যোগি ক্রমবর্ধমানহারে জগৎ সম্পর্কে নিস্পৃহ হয়ে পড়ে, সেখানে গৌতম অন্য সকল সত্তার প্রতি পুরোনো অনুশীলনের সঙ্গে প্রেমময় দয়া মিশিয়ে সামগ্রিক সহানুভূতির মধ্য দিয়ে নিজেকে অতিক্রম করে যাওয়া শিখছিলেন।
