টেক্সট অনুযায়ী প্রায় প্রুস্তিয় এই স্মৃতিচারণ গৌতমের জন্যে বাঁক বদলকারী ঘটনা ছিল। সেই থেকে মানুষের স্বাভাবের বিপক্ষে যুদ্ধ করার বদলে তার সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন-আলোকনের পক্ষে অনুকূল মানসিক অবস্থাকে বাড়িয়ে তুলে তার সম্ভাবনাকে বাধাগস্ত করার মতো যেকোনও কিছুকে এড়িয়ে যাওয়া। গৌতম তাঁর ভাষায়, ‘মধ্যপন্থা’ গড়ে তুলছিলেন যা একদিকে যেমন শারীরিক ও আবেগগত আত্মপ্রশ্রয় বর্জন করেছে, অন্যদিকে বাদ দিয়েছে চরম কৃচ্ছ্রতা সাধনও যা সমান মাত্রায় বিধ্বংসী হতে পারে। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পাঁচ সঙ্গীর সঙ্গে অনুসরণ করা শাস্তিমূলক পদ্ধতি অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে যা তাঁকে এমন অসুস্থ করে দিয়েছে যে মুক্তির প্রাকশর্ত ‘খাঁটি আনন্দ’ বোধ করার কোনও উপায়ই নেই এখন। টেক্সট অনুযায়ী কয়েক মাসের ভেতর প্রথমবারের মতো কুম্মাসা নামে দুধের পায়েস বা ফিরনি দিয়ে শক্ত খাবার গ্রহণ করলেন তিনি। তাঁকে খেতে দেখে ভিক্ষুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। বিতৃষ্ণার সঙ্গে সরে গিয়েছেন তাঁরা। গৌতম আলোকনের জন্যে সংগ্রাম ত্যাগ করছেন, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন।[৬]
কিন্তু অবশ্যই মোটেই তেমন কিছু ছিল না ব্যাপারটা। গৌতম নিশ্চয়ই আপন পরিচর্যায় স্বাস্থ্য উদ্ধার করেছিলেন। এই সময়ে সম্ভবত নিজস্ব ধরনের যোগ সাধনা গড়ে তুলতে শুরু করেন তিনি। তিনি আপন চিরন্তন সত্তার দেখা পাওয়ার আশা করছিলেন না, কেননা তখন ভাবতে শুরু করেছিলেন যে, এটা মানুষকে আলোকন হতে দূরে সরিয়ে রাখা আরেকটা বিভ্রম মাত্র। মানবীয় প্রকৃতির সঙ্গে আরও একাত্ম হতে সাহায্য করার লক্ষ্যেই তাঁর যোগ নির্মিত হয়েছিল যাতে নিব্বানা অর্জনের পথে একে কাজে লাগাতে পারেন তিনি। প্রথমে ধ্যানের প্রস্তুতি হিসাবে এসেছে ‘অভিনিবেশ’ (সাতি) নামের অনুশীলন, যেখানে দিনের প্রতিটি মুহূর্তে নিজ আচরণ নিরীক্ষা করেছেন তিনি। সচেতনতার ওঠা-নামার সাথে সাথে নিজের অনুভূতি ও চাঞ্চল্যের জোয়ার ভাটা জরিপ করেছেন। ইন্দ্রিয়জ বাসনা দেখা দিলেই সেটাকে স্রেফ দমন না করে তার আবির্ভাবের কারণ এবং কতটা দ্রুত মিলিয়ে গেছে, লক্ষ করতেন তিনি। বাহ্যিক জগতের সঙ্গে বোধ ও চিন্তার মিথষ্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রতিটি দৈহিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সজাগ করে তুলেছেন নিজেকে। কীভাবে হাঁটছেন, উবু হওয়া কি হাত-পা মেলে রাখা, এবং ‘খাওয়া, পান করা, চিবানো, স্বাদ গ্রহণ, বর্জত্যাগ, হাঁটা, দাঁড়ানো, বসা, ঘুমানো, জেগে ওঠা, কথা বলা ও নীরব থাকা’র[৭] সময় নিজের আচরণ সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন ধরনের ধারণা কীভাবে মনের ভেতর খেলে যায়, সংক্ষিপ্ত আধঘণ্টা সময়ে আকাঙ্ক্ষা ও বিরক্তির অবিরাম ধারা আক্রান্ত করতে পারে তাঁকে, যেসব লক্ষ্য করেছেন। আকস্মিক কোনও শব্দ বা তাপমাত্রায় পরিবর্তনে তিনি কেমন করে সাড়া দিচ্ছেন সেদিকে “মনোযোগী” হয়ে ওঠেন তিনি। দেখেছেন কত দ্রুত অতি তুচ্ছ জিনিসও তাঁর মনের শান্তি নষ্ট করছে। এই ‘অভিনিবেশ’ স্নায়বিক অন্তর্মুখীতার চেতনায় বিকশিত হয়নি। গৌতম ‘পাপে’র প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যে নিজ মনুষ্যত্বকে এভাবে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে স্থাপন করেননি। তাঁর ব্যবস্থায় পাপের কোনও স্থান নেই, কেননা যেকোনও অপধারই স্রেফ ‘অনুপযোগি’ হয়ে দাঁড়াবে: এটা শিক্ষাব্রতীর ভেতর সেই অহমই রোপন করবে সে যা অতিক্রম করার প্রয়াস পাচ্ছে। গৌতমের ব্যবহৃত কুসলা ও অকুসলা শব্দ দুটি তাৎপর্যপূর্ণ। উদাহরণ স্বরূপ, পাপপূর্ণ হওয়ার কারণে নয় বরং বরং নিব্বানা অর্জনে ব্যক্তিকে সাহায্য করবে না বলেই যৌনতা পাঁচটি ইয়ামার অন্তর্ভুক্ত হয়নি। যৌনতা মানুষকে সামসারায় বন্দিকারী আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এতে যে শক্তি ব্যয় হয় তা যোগে নিয়োজিত করাই শ্রেয়। কোনও ক্রীড়াবিদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার আগে নির্দিষ্ট খাবার গ্রহণে বিরত থাকে একজন ভিক্ষুও তেমনি যৌনতা হতে বিরত থাকেন। যৌনতার প্রয়োজন আছে, কিন্তু ‘মহান অনুসন্ধানে’ নিয়োজিত কারও পক্ষে তা ‘উপযোগি’ নয়। অনুভূতির ওপর হামলে পড়বেন বলে নিজ মানবীয় প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন না গৌতম, বরং এর ক্ষমতা কাজে লাগাতে এর কার্যধারা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে উঠছিলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তাঁর নিজের মাঝেই দুঃখ-কষ্টের সমাধান নিহিত রয়েছে, যাকে তিনি বলেছেন, ‘এই ফ্যাদম-দীর্ঘ শরীরে, এই দেহমনে।’[৮] নিজ জাগতিক স্বভাবের পরিমার্জনের মধ্য দিয়েই আসবে মুক্তি। সুতরাং তাঁকে এর তদন্ত করতে হবে এবং এমন নিবিড়ভাবে জানতে হবে যেমন করে তালিম দেওয়ার সময় সওয়ারি ঘোড়াকে চিনে নেয়।
কিন্তু অভিনিবেশের অনুশীলন তাঁকে আগের চেয়ে আরও প্রকটভাবে দুঃখ- কষ্ট ও তার উৎস আকাঙ্ক্ষার সর্বব্যাপীতা সম্পর্কে সজাগ করে তুলেছিল। তাঁর সচেতনতায় ভিড় জমানো এইসব চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী। সমস্ত কিছুই অস্থায়ী (অনিক্য)। বাসনা যত প্রখরই হোক না কেন, অচিরেই ক্ষয়ে যায় ও সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু তার জায়গা দখল করে। কিছুই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এমনকি ধ্যানের সুখও নয়। জীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপই ভোগান্তির অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি মুহূর্তের অনুভূতি লক্ষ করতে গিয়ে গৌতম আরও সচেতন হয়ে উঠলেন যে, জীবনের দুঃখ অসুস্থতা, বয়স ও মৃত্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। এটা দৈনিক, এমনকি ঘণ্টা হারেও ঘটে। ছোট ছোট হতাশা, প্রত্যাখ্যান, নিরাশা ও ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে কোনও এক দিনে আমাদের ওপর আপতিত হয়: ‘যন্ত্রণা, শোক ও হতাশাই দুঃখ,’ পরবর্তী সময়ে ব্যাখ্যা করবেন তিনি, ‘আমরা যার কাছাকাছি হতে বাধ্য হওয়া ঘৃণা করি সেটাই ভেগান্তি, আমরা যা ভালোবাসি তা হতে বিচ্ছিন্ন হওয়াই কষ্ট, আমরা যা চাই তা না পাওয়াই কষ্ট।’[৯] জীবনে আনন্দ আছে বটে, কিন্তু গৌতম অভিনিবেশের নিষ্ঠুর পরীক্ষার বিষয়ে পরিণত করার পর গৌতম লক্ষ করলেন, আমাদের সন্তুষ্টি কীভাবে অন্যদের কষ্টে পরিণত হয়। একজনের সমৃদ্ধি সাধারণত অন্য কারও দারিদ্র্য বা বর্জনের ওপর নির্ভরশীল। আমরা যখন কিছু পাই, আমাদের তা সুখী করে। সঙ্গে সঙ্গে সেটা হারানোর উদ্বেগে ভুগতে শুরু করি আমরা। এমনকি দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের অসুখী করবে অন্তর দিয়ে জানা থাকা সত্ত্বেও আমরা কাঙ্ক্ষিত বস্তুর সন্ধান করি।
