আশা-নিরাশা মেশানো কণ্ঠে ‘নিশ্চয়ই আলোকনের আরও উপায় আছে,’ বলে চেঁচিয়ে ওঠার অনেক বছর পর গৌতম ছোটবেলার এই অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করেছেন। ঠিক এই মুহূর্তে-আবার অপূর্বচিন্তিত ও অপ্রত্যাশিত- ছোটবেলার সেই পরমানন্দের স্মৃতি মনের উপরিতলে উঠে এসেছে তাঁর। শীর্ণকায়, পরিশ্রান্ত ও মারাত্মক অসুস্থ গৌতম ‘গোলাপজাম গাছের শীতল ছায়ার’ কথা মনে করেছেন, যা অনিবার্যভাবে মনের মাঝে নিব্বানার ‘শীতলতা’ নিয়ে এসেছিল। বেশির ভাগ যোগি বহু বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর কেবল প্রথম ঝানা অর্জন করতে পারে। কিন্তু তাঁর দিক থেকে কোনও প্রয়াস ছাড়াই উপস্থিত হয়েছে এটা, তাঁকে নিব্বানার আভাস দিয়েছে। কাপিলাবাস্তু ছাড়ার পর থেকেই আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে সংগ্রামের অংশ হিসাবে সকল সুখ বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি। কৃচ্ছ্রতা সাধনের বছরগুলোয় আপন দেহ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন প্রায়। আশা ছিল, এভাবে নিজেকে মানুষের স্বাভাবিক দুর্দশাগ্রস্ত অস্তিত্বের বিপরীত পবিত্র জগতে ঠেলে দিতে পারবেন। অথচ ছোটবেলায় এক নিখাদ আনন্দের অভিজ্ঞতার পর বিনা ঝামেলাতেই যোগের পরমান্দ লাভ করেছিলেন তিনি। গোলাপজাম গাছের শীতলতার কথা ভাববার সময় দুর্বল অবস্থায় সুদীর্ঘ জ্বরে ভোগার পর খিঁচুনি হতে মুক্তি পাওয়ার কথা কল্পনা করেছেন তিনি। এরপর এক অনন্যসাধারণ ধারণা আঘাত করেছে তাঁকে। ‘এটাই কি’, নিজেকে জিজ্ঞেস করেছেন তিনি, ‘আলোকনের উপায়?’ অন্য গুরুরা কি ভুল করেছেন? আমাদের অনিচ্ছুক সত্তাকে চূড়ান্ত মুক্তি অর্জনের জন্যে নিপীড়ন করার বদলে আমরা হয়তো অনায়াসে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা অর্জন করতে পারি। নিব্বানা কি আমাদের মানবীয় কাঠামোরই অন্তস্থ নির্মাণ? একজন অপ্রশিক্ষিত বালক প্রথম ঝানায় পৌঁছতে পারলে আর বিনা চেষ্টায় নিব্বানার আভাস লাভ করতে পারলে যোগ-দর্শন নিশ্চয়ই মানুষের পক্ষে গভীরভাবে স্বাভাবিক। যোগকে মানুষের উপর হামলা বানানোর বদলে একে কি সেতো-বিমুক্তি, অর্থাৎ ‘মনের উন্মুক্তি’ আনয়নকারী অন্তস্থ প্রবণতা গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করা যায়, যা কিনা পরম আলোকনের প্রতিশব্দ?
ছেলেবেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার পরপরই গৌতম নিশ্চিত হয়ে যান, তাঁর ধারণা সঠিক। এটাই নিব্বানার প্রকৃত পথ। এখন কেবল প্রমাণ করার পালা। কেন এত সহজে প্রথম ঝানায় পৌঁছে দেওয়া প্রশান্ত সুখের আবেশ সৃষ্টি হয়েছিল? একটা অত্যাবশ্যকীয় উপাদান ছিল গৌতমের ভাষায়, “বিচ্ছিন্নতা’। তাঁকে একা রেখে যাওয়া হয়েছিল : পরিচারিকারা গল্পগুজবে তাঁর মন বিক্ষিপ্ত করে রাখলে কখনওই তিনি পরমান্দের পর্যায়ে যেতে পারতেন না। ধ্যানের জন্যে একান্ত পরিবেশ ও নৈঃশব্দ্য প্রয়োজন। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতা শারীরিক নিঃসঙ্গতার অতিরিক্ত। গোলাপজাম গাছের নিচে বসে থাকবার সময় তাঁর মন বস্তুগত জিনিস এবং অপূর্ণাঙ্গ ও অলাভজনক যেকোনও কিছু হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। গৌতম ছয় বছর আগেই বাড়ি ছেড়েছিলেন বলে আপন মানবীয় প্রকৃতিকে আলোকিত করে প্রতিটি প্রবণতা ধ্বংস করে দিচ্ছিলেন। যেকোনও রকম সুখকে অবিশ্বাস করতে শিখেছিলেন তিনি। কিন্তু এবার নিজেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বহু আগের অপরাহ্নের সেই সুখানুভূতিকে কেন ভয় পাবেন? সেই নিখাদ আনন্দের সঙ্গে লোভী বাসনা বা ইন্দ্রিয়জ আকাঙ্ক্ষার কোনওই সম্পর্ক ছিল না। কিছু কিছু সুখানুভূতি সত্যি সত্যি অহমবাদ হতে মুক্ত করে উন্নত যোগ অবস্থায় পৌঁছে দিতে পারে। নিজেকে আবার প্রশ্নটা করামাত্র নিজস্ব আত্মবিশ্বাসী চূড়ান্ত সুরে সাড়া দিলেন গৌতম: ‘আমি অমন আনন্দে ভীত নই,’ বললেন তিনি।[৩] সেই ঘোরের দিকে এগিয়ে যাবার নিঃসঙ্গতা সৃষ্টি করাই আসল কথা এবং মনের সেই সামগ্রিক (কুসলা) অবস্থাকে লালন করা যা নিরাসক্ত দরদে কীটপতঙ্গ ও ঘাসের চারার জন্যে দুঃখবোধ করতে প্রাণিত করছিল তাঁকে। একই সাথে আলোকপ্রাপ্তিতে কাজে আসবে না বা বাধা সৃষ্টি করবে, এমন মানসিক অবস্থা সতর্কতার সঙ্গে পরিহার করে যাবেন।
অবশ্য ‘পাঁচ নিষেধাজ্ঞা’ পালনের ভেতর দিয়ে আগে থেকেই এই আলোকেই চলছিলেন তিনি, যা সহিংসতা, মিথ্যাচার, চুরি, মাদকাসক্তি ও যৌনতার মতো ‘অনুপযোগি’ (অকুসলা) কর্মকাণ্ড নাকচ করেছে। কিন্তু এবার তিনি বুঝতে পারলেন, এটাই যথেষ্ট নয়। অবশ্যই তাঁকে এই পাঁচটি বাধার বিপরীত ইতিবাচক প্রবণতা গড়ে তুলতে হবে। পরবর্তীকালে তিনি বলবেন, আলোকন প্রত্যাশী কোনও ব্যক্তিকে অবশ্যই এইসব ‘সহযোগি’ ‘সামগ্রিক’ বা ‘দক্ষ’ (কুসলা) অবস্থার সন্ধানে ‘শক্তিমান, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও অধ্যাবসায়ী’ হতে হবে যা আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঘটাবে। অহিংসা কেবল সামান্য দূর এগিয়ে দিতে পারবে; সহিংসতা বর্জনের বদলে শিক্ষাব্রতাঁকে অবশ্যই সবকিছু ও সবার সঙ্গে কোমল ও দয়াময় আচরণ করতে হবে; তাকে অবশ্যই অশুভ ইচ্ছার ক্ষীণ অনুভূতি ঠেকাতে প্রেম-প্রীতির অনুভূতি গড়ে তুলতে হবে। মিথ্যা না বলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ‘সঠিক কথা’ বলা ও আপনি যা বলছেন ‘সেটা যৌক্তিক, সঠিক, পরিষ্কার এবং উপকারী’ হওয়াটা নিশ্চিত করতে হবে। চুরি হতে নিবৃত্ত থাকা ছাড়াও একজন ভিক্ষু যা দেওয়া হচ্ছে তাতেই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ না করেই ইতিবাচকভাবে আনন্দ প্রকাশ করতে হবে, তাঁকে সবসময়ই খুশি থাকতে হবে।[৪] যোগিরা সবসময় বলেছে, পাঁচটি নিষেধাজ্ঞার অনুসরণ ‘অসীম সুখ’ বয়ে আনবে, কিন্তু মনের এই ইতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি সচেতন প্রয়াসে এই ধরনের exstasis নিঃসন্দেহে দ্বিগুণ হবে। গৌতম বিশ্বাস করতেন, এই ‘দক্ষতাপূর্ণ’ আচরণ দ্বিতীয় স্বভাবের মতো অভ্যাসে এসে গেলে শিক্ষাব্রতী ‘নিজের মাঝে নিখাঁদ আনন্দ অনুভব’ করবে, ছেলেবেলায় গোলাপজাম গাছের নিচে যে আনন্দ বোধ করেছিলেন তিনি সেটার অনুরূপ না হলেও সমরূপ।[৫]
