ইশতার প্রতিশোধ নেয়, এবং এনকিছু অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং মারা যায়। গিলগামেশ বিহ্বল হয়ে পড়ে। তাকেও মরতে হবে এই উপলব্ধির ফলে যখন সে ভারাক্রান্ত, তখন তার মনে পড়ে বন্যার কবল থেকে যে বেঁচে গেছে– এই মহাকাব্যে উথনাপিসতিম বলে অভিহিত করা হয়েছে- তাঁকে অনন্ত জীবন দান করা হয়েছে, সে তখন তার সাথে দেখা করার জন্য ডিলমান রওয়ানা হয়। কিন্তু মানুষ প্রাচীন আধ্যাত্মিকতায় ফিরতে পারবে না এবং দেবতাদের রাজ্যের খোঁজে এই অভিযান সাংস্কৃতিক প্রত্যাবৃত্তির পরিচায়ক; তৃণভূমির মাঝে গিলগামেশ ঘুরে বেড়ায়, মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল, চুল বড় বড়, লজ্জাস্থান সিংহের চামড়া দিয়ে ঢাকা একজন শামানের ন্যায়, জনবসতিহীন প্রান্তরের মাঝ দিয়ে সে সূর্যের গতিপথ অনুসরণ করে, মনশ্চক্ষে পাতাল অবলোকন করে এবং ‘দেবতাদের গোপন জ্ঞান’ খুঁজে বেড়ায়।[৬১] শেষ পর্যন্ত সে যখন ডিলমানে পৌঁছায়, উথনাপিসতিম তাকে বোঝায় যে দেবতারা তাদের প্রিয় মানুষের জন্য আর প্রাকৃতিক নিয়ম স্থগিত করবে না। মানুষের আকাঙ্ক্ষার পথপ্রদর্শক হিসাবে পুরাতন পুরাণ আর কোনো কাজে আসবে না। ডিলমান ভ্রমণ পুরাতন পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।[৬২] আথরাসিসে, বন্যার গল্প দেবতাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বর্ণনা করা হয়েছে কিন্তু এখানে উথনাপিসতিম তার নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে, নৌকা তৈরি করে পানিতে ভাসাতে গিয়ে সে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল এবং বন্যার দ্বারা সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের প্রতি তার নিজের মানবিক প্রতিক্রিয়া। পুরাতন পুরাণগুলো পবিত্র পৃথিবীকেন্দ্রিক ছিল ক্ষণস্থায়ী ঘটনা বা চরিত্রের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ ছিল না তাদের, আর এখানে ঐতিহাসিক গিলগামেশ পৌরাণিক উথনাপিসতিমের সাথে দেখা করে। ইতিহাস পুরাণকে আঘাত করতে শুরু করেছে, একই সাথে দেবতারাও মানুষের পৃথিবী ছেড়ে প্রস্থান আরম্ভ করেছেন।[৬৩]
দেবতাদের কাছ থেকে প্রাধিকার বলে সংবাদ পাবার বদলে, গিলগমেশ মানুষের সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে কষ্টদায়ক শিক্ষা লাভ করে। সে সভ্যতার কাছেই ফিরে আসে : গোসল করে, সিংহের চামড়া বর্জন করে, চুল পরিপাটি করে বিন্যস্ত করে পরিষ্কার পোশাক পরিচ্ছেদ পরিধান করে। এরপরে উর্কের সীমানা প্রাচীর নির্মাণে সে মনোনিবেশ করে এবং সভ্য শিল্পকলার চর্চা শুরু করে। ব্যক্তি গিলগামেশ মারা যাবে, কিন্তু এসব সৌধচূড়ায় সে অমরত্ব লাভ করবে, বিশেষ করে লেখনীর আবিষ্কারের কারণে, যা তার অর্জনকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করবে।[৬৪] উথনাপিসতিম দেবতাদের সাথে কথা বলে যেখানে জ্ঞানী হয়েছিল, সেখানে গিলগমেশ ঐশ্বরিক সহায়তা ছাড়াই নিজের অভিজ্ঞতা বলতে শিখে নেয়। তার কিছু স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে কিন্তু তার বদলে সে ‘পরিপূর্ণ’ জ্ঞান লাভ করেছে, ‘ক্লান্ত কিন্তু আত্মসমর্পিত চিত্তে’ ফিরে এসেছে।[৬৫] প্রাচীন পৌরাণিক অন্তজ্ঞান থেকে সে দূরে সরে গিয়েছে কিন্তু ইতিহাসের নিজস্ব সান্ত্বনা রয়েছে।
গ্রীসেও প্রাচীন পৌরাণিক আদর্শের একই ধরনের পূর্ণ মূল্যায়ন হয়েছে। এডোনিসের পুরাণে, যেমন, ডুমুনিস আর ইশতারের গল্প নতুন করে লেখা হয়েছে এবং একে একটা রাজনৈতিক পুরাণের রূপ দেয়া হয়েছে।[৬৬] এডোনিস নাগরিকত্ব লাভের যোগ্য না। এক হতাশ শিকারী, সে নিশ্চয়ই দীক্ষাদানের অনুষ্ঠান পালন করতে ব্যর্থ হয়েছিল যা সদ্যযুবা গ্রীকদের নাগরিকে পরিণত করে, বা প্রায়শই যা শিকারের অভিজ্ঞতার উপর আধারিত হতো। দুই দেবীর বন্ধনে আবদ্ধ, সে কখনও মেয়েদের আকর্ষণ কাটাতে পারেনি। প্রাচীন গ্রীক নগর রাষ্ট্র Polis–এ পরিবারের মাধ্যমে গ্রীক নাগরিকেরা একতাবদ্ধ হতো কিন্তু এডোনিস ব্যভিচারের ফলে জন্ম নেয়া সন্তান, এমন একটা কাজ যা পারিবারিক আদর্শকে নস্যাৎ করে এবং নিজের আপন পরিবার খুঁজে পেতে সে ব্যর্থ হয়। তার দায়িত্বজ্ঞানহীন জীবনযাপন স্বেচ্ছাচারেরই নামান্তর, এমন এক ধরনের প্রশাসন যা আইনের ঊর্ধ্বে রাজাকে স্থান দেয় এবং এথেন্সবাসীরা যা বর্জন করেছে। এডোনিসের উৎসবের, বৈশিষ্ট্যই হলো মেয়েদের মাত্রা ছাড়া বিলাপ, পুরুষরা যাকে বিতৃষ্ণার সাথে দেখে। সংক্ষেপে, সে ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রতিবন্ধী, এবং এথেন্সবাসীদের হয়তো সাহায্যই করেছিল সংযমের বিপরীত সব কিছুকে মানবিক গুণাবলী দ্বারা প্রকাশ করে নিজেদের সীমা নির্ধারণে, Polis এর পুরুষদের মূল্যবোধ।
শহুরে জীবন পুরাণকে বদলে দিয়েছে। দেবতারা দূরবর্তী হতে শুরু করেছেন। দিব্য জগতে নারী ও পুরুষকে পৌঁছে দিতে পুরাতন আচার অনুষ্ঠান আর গল্পজ্ঞানের প্রতি মানুষের মোহভঙ্গ হচ্ছে যা তাদের পূর্বপুরুষদের এক সময় মানসিক পুষ্টি জুগিয়েছে। শহরগুলো আরো সংগঠিত হলে, পাহারাদারীর দক্ষতা বাড়লে এবং চোর ও ডাকাতদের শাস্তি দেয়ার হার বেড়ে গেলে, দেবতারা যেন ক্রমশ মানবতার দুর্দশা সম্পর্কে উদাসীন বেখেয়াল হয়ে উঠেন। একটা আধ্যাত্মিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। সভ্য পৃথিবীর কোনো কোনো অংশে, পুরাতন আধ্যাত্মিকতা হ্রাস পায় এবং এর স্থান নিতে নতুন কিছু সামনে এগিয়ে আসে না। শেষ পর্যন্ত এই অস্থিরতা আরেকটা মহান রূপান্তরের জন্ম দেয়।
৫. যুগান্তকারী পর্ব
(খ্রি: পূ: ৮০০ থেকে খ্রি: পূ: ২০০ )
