খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতক নাগাদ, অস্থিরতা আরও ছড়িয়ে পড়ে, এবং চারটি আলাদা অঞ্চলে দৈবজ্ঞ আর ঋষিদের একটা চিত্তাকর্ষক বিন্যাস নতুন সমাধান খুঁজতে শুরু করে। জার্মান দার্শনিক জ্যাসপার এই সময়কে ‘Axial Age’ বলে অভিহিত করেছেন কারণ মানবতার আধ্যাত্মিক উন্নতিতে এই সময় নিরতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছে; এই সময়ে অর্জিত অন্তজ্ঞান আজও নারী পুরুষের আত্মিক পুষ্টি সাধন করছে।[৬৭] আমরা আজ ধর্ম বলতে যা বুঝি এসব ছিল তারই সূচনাপর্ব। মানুষ নিজেদের প্রকৃতি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠে এবং নিজেদের পরিস্থিতি আর সীমাবদ্ধতা নজিরবিহীন স্পষ্টতায় বুঝতে পারে। নতুন ধর্মীয় আর দার্শনিক পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটে : চীনে কুনফুসিয়ানিজম আর তাওবাদ; ভারতবর্ষে বৌদ্ধ আর হিন্দু ধর্ম; মধ্যপ্রাচ্যে একেশ্বরবাদ এবং ইউরোপে গ্রীক যুক্তিবাদ। সপ্তম, অষ্টম আর ষষ্ঠ শতকের মহান হিব্রু দৈবজ্ঞদের মতো মানুষ এসব যুগান্তকারী প্রথার সাথে যুক্ত ছিলেন; উপনিষদের ঋষিমণ্ডলী আর বুদ্ধদেব (খ্রি: পূ: ৫৬৩-৪৮৩) ভারতবর্ষে; চীনের কনফুসিয়াস এবং ডাও ডে জিঙের;[৬৮] এবং গ্রীসের সক্রেটিস (খ্রি: পূ: ৪৬৯-৩৯৯), প্লাটো (খ্রি: পূ: ৪২৭- ৩৪৭) এবং এরিস্টটলের (খ্রি: পূ: ৩৮৪-৩২২) মতো পঞ্চম শতকের ট্র্যাজেডি লেখকবর্গের কথাও উল্লেখযোগ্য।
যুগান্তকারী এই সময়ের অনেক কিছুই এখনও রহস্যাবৃত। আমরা জানি না ভারতীয়, চৈনিক, গ্রীক আর ইহুদিরাই কেন এর সাথে সংযুক্ত হয়েছিল এবং কেনইবা এর সাথে তুলনীয় কোনো কিছুর পারস্য বা মিশরে উদ্ভব ঘটেনি। একটা বিষয় অবশ্যই সত্যি যে এসব অ্যাক্সিয়াল অঞ্চলসমূহ রাজনৈতিক, সামাজিক আর অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের ভিতরে পতিত হয়েছিল। যুদ্ধ, নির্বাসন, গণহত্যা আর শহরের বিনাশ ঘটেছিল এখানে। একটা নতুন বাজার অর্থনীতিও ক্রমশ গড়ে উঠছিলো; রাজা আর পুরোহিতদের কাছ থেকে ক্ষমতা ক্রমশ বণিকদের হাতে কুক্ষিগত হচ্ছিল আর এর ফলে পুরাতন সামাজিক কাঠামোতে একটা টানাপোড়েন দেখা দিয়েছিল। প্রত্যন্ত মরুভূমি বা পাহাড়ের নিরালা গুহায় এসব নতুন বিশ্বাসের জন্ম হয়নি, বরং পুঁজিবাদ আর স্বচ্ছলতার বাতাবরণে তাদের আত্মপ্রকাশ। কিন্তু এসব অভ্যুত্থান যুগান্তকারী অ্যাক্সিয়াল বিপ্লবকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না, যা মানুষ পরস্পরের সাথে, নিজের সাথে এবং তার চারপাশের পৃথিবীর সাথে যেভাবে জড়িত, তাতে একটা অনপনেয় ছাপ ফেলেছে।
সব যুগান্তকারী অ্যাক্সিয়াল আন্দোলনের অপরিহার্য উপাদানগুলো একই ধরনের। তারা মানুষের দুর্ভোগ যাকে মানুষের পরিস্থিতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করা হতো সে সম্পর্কে ভীষণমাত্রায় সচেতন এবং সবাই আরো বেশি মাত্রায় আধ্যাত্মিক ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন যা কেবল বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান এবং পূজা অর্চনার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যক্তিগত চেতনা আর নৈতিকতা সম্পর্কে তাদের একটা নতুন ভাবনা ছিল। তাছাড়া প্রথাগত কৃত্যানুষ্ঠান যথাযথভাবে পালন করাটাই যথেষ্ট না; ভক্ত অনুরাগী ব্যক্তিকে অবশ্যই তাদের সাথে বসবাসরত অন্য মানুষদের সাথে ভক্তিসহকারে আচরণ করতে হবে। তাদের সময়ের হিংস্র আচরণ সব ঋষিরাই বর্জন করেছিলেন এবং ন্যায়বিচার আর করুণাময় নীতিকথা প্রচার করেছেন। তারা তাদের শিষ্যদের শিখিয়েছেন সত্যের জন্য নিজের ভিতরে অনুসন্ধান করতে এবং পুরোহিত আর অন্যান্য ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের শিক্ষার উপর নির্ভর না করার জন্য। বিশ্বাস করে কোনো কিছু গ্রহণ করলে চলবে না, সবকিছুকে প্রশ্ন করতে হবে এবং পুরাতন মূল্যবোধ যাকে মেনে নেয়া হয়েছে তাকে সমালোচকের দৃষ্টিতে নিরীক্ষা করতে হবে। আর একটা ক্ষেত্র যার পূর্ণ মূল্যায়ন প্রয়োজন সেটা হলো অবশ্যই পুরাণতত্ত্ব।
প্রাচীন পুরাণ বিবেচনাকালে, প্রতিটা যুগান্তকারী আন্দোলন সামান্য ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে। কেউ আবার নির্দিষ্ট পৌরাণিক ধারার প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণ করে; অন্যেরা Laissez-faire হস্তক্ষেপ না করার রীতি গ্রহণ করে। সবাই নিজ নিজ পুরাণের নৈতিক ব্যাখ্যা আর ভিতরের বিন্যাস নতুন করে সাজায়। শহুরে জীবনের অভ্যাগমের মানে একটাই পুরাণগুলোকে কেউ আর কোনো প্রশ্ন না করে মেনে নেবে না। মানুষ সমালোচকের দৃষ্টিতে এগুলোকে বিশ্লেষণ করা অব্যাহত রাখে কিন্তু তারা যখন আত্মার রহস্যের সম্মুখীন হয়, তারা দেখে যে সহজাত প্রবৃত্তির বলে তারা পুরাতন পুরাণেরই দ্বারস্থ হচ্ছে। গল্পগুলোকে হয়তো নতুন করে লিখতে হবে, কিন্তু এখনও তাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা যায়। যদি কোনো পুরাণ কোনো কঠোর সংস্কারকের দ্বারা উদ্বাসিত হয়, কখনও কখনও সামান্য ভিন্ন আঙ্গিকে পরবর্তী সময়ে সে আবার মূল ধারায় ফিরে এসেছে। এমনকি এই পরিশীলিত ধর্মীয় ব্যবস্থায়, মানুষ দেখে যে পুরাণ ব্যতীত কোনো কিছু করতে তারা অপারগ।
কিন্তু পূর্বপুরুষের ন্যায় মানুষ এখন আর সহজেই দিব্য অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে না। প্রাচীন কিছু কিছু শহুরে-বাসিন্দাদের চেতনা থেকে দেবতারা ইতিমধ্যেই বিদায় নিতে শুরু করেছে। অ্যাক্সিয়াল রাষ্ট্রে বসবাসকারীরা এখনও সর্বব্যাপী অভিজ্ঞতা লাভের জন্য আকুল, কিন্তু দিব্য এখন যেন বহুদূরের বস্তু এবং কখনও হয়তোবা ভিনগ্রহের বাসিন্দা। মরণশীল মানুষ আর তাদের দেবতাদের মাঝে এক যোজন ব্যবধান। সেই একই প্রকৃতিতে তারা আর সহাবস্থান করে না; এটা এখন বিশ্বাস করা কঠিন যে দেবতা আর মানুষ একই ঐশ্বরিক উপাদান থেকে সৃষ্ট। প্রাচীন হিব্রু পুরাণে এমন একজন দেবতার কথা কল্পনা করা হয়েছিল যিনি খেতে পারেন এবং বন্ধুর ন্যায় আব্রাহামের সাথে কথোপকথন চালিয়ে যেতে সক্ষম।[৬৯] কিন্তু অ্যাক্সিয়াল যুগের পয়গম্বরের দল যখন এই একই দেবতার মুখোমুখি হন, তার কারণে একটা ভীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় তারা, যা তাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে বা বিস্মিত বিপর্যস্ত অনুভূতি তাদের মাঝে রেখে যায়।[৭০] পরম বাস্তবতার মাঝে লীন হওয়াটা এখন অসম্ভব রকমের কঠিন মনে হয়। ভারতবর্ষে, বৌদ্ধরা অনুভব করে যে নির্বাণের দিব্য শান্তির জগতে তারা প্রবেশ করতে পারবে কেবল তাদের সাধারণ চেতনার প্রতি যোগাসনের মাধ্যমে ব্যাপক আক্রমণ শাণিত করে যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে, আবার জৈনরা এমন কঠিন তপশ্চর্যা করে যে কেউ কেউ অনাহারের কারণে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। চীনে, কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন যে, ডাও, পরম বাস্তবতা, মানুষের পৃথিবী থেকে এতটাই আলাদা যে সে সম্পর্কে কথা না বলাই ভালো।[৭১] মৌলিকভাবে পৃথক এসব ধর্মীয় অভিজ্ঞতার মানে এই যে পুরাণ তার সেই প্রাচীন দেবতাদের সাথে তুলনীয় anthropomorphic উপায়ে দিব্য সম্পর্কে আলোচনা করতে পারছে না।
