বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির অন্যান্য গল্পে সত্যিকারের সৃষ্টিশীলতা আত্মোৎসর্গ দাবী করে এমনটা বলা হয়েছে। ভারতীয় বৈদিক পুরাণে, আত্মাহুতির ফলেই সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। পুরুষ, এক মহাজাগতিক দৈত্য, নিজেকে দেবতাদের কাছে উৎসর্গ করলে, তারা তাকে বলি দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করেন; বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং সামাজিক শ্রেণী যা মানব সমাজ গঠন করেছে তার ধড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এবং সেজন্য এটা পবিত্র এবং প্রশ্নাতীত। চীনে, আরেকটা দৈত্য পানগু, তাকে নিয়ে একটা জনপ্রিয় পুরাণ রয়েছে, সে ৩৬০০০ বছর পরিশ্রম করেছে চলনসই বিশ্ব সৃষ্টি করতে এবং তারপরে এই পরিশ্রমের কারণে ক্লান্ত হয়ে সে মারা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পুরাণে একই ছক আমরা দেখতে পাই। তিয়ামাত, মট, এবং লেভিয়াথান কেউই খল না তারা কেবল তাদের মহাজাগতিক ভূমিকা পালন করেছে। মরতে তাদের হবে আর মৃত্যুর পর অঙ্গহানি সহ্য করার পরেই কেবল বিশৃঙ্খলা থেকে সুশৃঙ্খল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আবির্ভাব ঘটতে পারে। টিকে থাকতে, সভ্য সমাজ অন্যের মৃত্যু আর ধ্বংসের উপরে নির্ভর করে এবং দেবতা এবং মানুষ কেউই সত্যিকারের সৃষ্টিশীল হবে না যতক্ষণ না তারা নিজেদের উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হবে।
এখন পর্যন্ত পৌরাণিক তত্ত্ব প্রায় সম্পূর্ণরূপেই আদ্যকালীন বৈশিষ্ট্যকেন্দ্রিক এবং দেবতাদের সংগ্রাম বা আদ্যকালীন সময়ের পূর্বপুরুষদের আদি রূপের উপর কেন্দ্রীভূত। কিন্তু এখন থেকে শহুরে পুরাণ ঐতিহাসিক জগতের উপরে অভিঘাত সৃষ্টি করবে। কারণ মানুষ এখন পূর্বেকার চাইতে অনেক বেশি নিজের উদ্ভাবন কুশলতার উপরে নির্ভরশীল, মানুষ ক্রমশ নিজেকে স্বাধীন সত্তা হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ড এখন প্রধান হয়ে উঠেছে এবং সেইসাথে পাল্লা দিয়ে দেবতারাও দূরে সরে যেতে শুরু করেছে। পুরাতন গল্প কবিরা নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করছে। এই বিষয়টা আমরা ব্যাবিলনীয় মহাকাব্য যা গিলগামেশের মহাকাব্য নামে পরিচিত সেখানে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করি। গিলগামেশ সম্ভবত কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র, খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ সালে সম্ভবত তিনি জীবিত ছিলেন : দক্ষিণ পারস্যে উর্কের পঞ্চম রাজা হিসাবে তার নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং পরবর্তীকালে তিনি লোককথার নায়কে পরিণত হন। তার ভৃত্য এনকিছুর সাথে তার অভিযান প্রাচীন কিংবদন্তীর বিষয়বস্তু। সেখানে আমরা বীরোচিত এবং শামানিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করি যেমন দানবের সাথে যুদ্ধ, পাতাল ভ্রমণ, এবং দেবীদের সাথে মিলন। পরবর্তীকালে এসব কাহিনীতে গূঢ় মানে আরোপিত হয়েছে এবং অনন্ত জীবনের অভিযানে পরিণত হয়েছে। খ্রীস্টপূর্ব ১৩০০ সালে লিখিত, এই মহাকাব্যের সর্বশেষ নমুনায়, আমরা দেখি মানুষের সংস্কৃতির স্বরূপ এবং সীমা নিয়ে পুরাণ অনুসন্ধান করতে চাইছে।
মহাকাব্যের শুরুতে, আমরা দেখি মানুষ গিলগামেশ পথ হারিয়েছে। তার হৃদয় বিক্ষুব্ধ এবং নিজের লোককেই সে ভয় দেখাতে শুরু করলে, তারা দেবতার কাছে গিয়ে প্রতিকার চায়। কিন্তু, লক্ষণীয় বিষয় হলো, দেবতারা এখন আর সরাসরি মানুষের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে রাজি না এবং তারা একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। গিলগামেশকে বশে আনতে তারা এনকিছুকে সৃষ্টি করেন, বন্য আদিম এক মানুষ গ্রামাঞ্চলে যে মনের ফুর্তিতে ঘুরে বেড়ায়। তার দেহ রুক্ষ চামড়া দ্বারা আচ্ছাদিত, অপরিপাটি চুল, উলঙ্গ, ঘাস খায় আর পুকুরের পানি পান করে, এনকিডু হলো ‘মানুষ-শুরুতে-যা-ছিল,’[৫৭] মানুষের চাইতে পশুর সাথে থাকতেই সে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এনকিডুকে বশ মানাতে, গিলগামেশ বেশ্যা সামহাতকে পাঠায় তাকে সভ্য আদব কায়দা শিখাতে। সামহাতের সাথে ছয় রাত কাটাবার পরে, এনকিছু বুঝতে পারে প্রকৃতি এবং পশু জগতের সাথে তার যে বন্ধন ছিল সেটা ভেঙে গেছে। সে ক্রমশ সভ্য হয় কিন্তু এতে লাভ আর ক্ষতি দুটোই হয়। এনকিছুর পশুসত্তা ‘লোপ’ পেয়েছে বটে কিন্তু একইসাথে সে হয়ে উঠেছে ‘দেবতার ন্যায়’ এবং ‘দুয়ে’।[৫৮] উর্কের পরিশীলিত জীবনযাত্রা উপভোগ করার মতো জ্ঞান এবং শিষ্টাচার তার ভিতরে এসেছে কিন্তু সেটা মানবিকতার স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে এতদূর বিস্তৃত যে একে ঐশ্বরিক বলে মনে হয়।
গিলগামেশ আর এনকিডু পরস্পরের বন্ধুতে পরিণত হয়, এবং তাদের অভিযান শুরু করে। এক সাথে ঘুরে বেড়াবার সময়ে তাদের দেখা হয় ইশতারের সাথে। প্রাচীন পুরাণে ধরিত্রী দেবীর সাথে বিয়ে প্রায়শই সর্বোচ্চ জ্ঞানার্জনের বিষয়টা বোঝাত এবং সেটা হতো বীরের অভিযানের চরম পরিণতি, কিন্তু গিলগামেশ ইশতারকে ফিরিয়ে দেয়। প্রচলিত পুরাণের এটা একটা কঠোর সমালোচনা, যা শহুরে নারী পুরুষের সাথে আর তাল রাখতে পারে না। গিলগামেশ সভ্যতাকে ঐশ্বরিক প্রচেষ্টা বলে মনে করতেন না। এশতার সংস্কৃতি ধ্বংসকারী : সে অনেকটা পানির আবরণের মতো যা এর বহনকারীকে শুষে নেয়, একটা জুতো যা পরিধানকারীকেই খোঁচায় এবং একটা দরজা যা বায়ু প্রবাহ রোধ করতে পারে না।[৫৯] তার কোনো সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; সে তার প্রতিটা প্রেমিকের সর্বনাশ করেছে।[৬০] দায়িত্বজ্ঞানহীন দেবতাদের সাথে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক যোগাযোগ ছাড়াই মরণশীলেরা ভালো থাকবে। গিলগামেশ, সভ্য মানুষ, দিব্যর কাছ থেকে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এবার সময় হয়েছে দেবতা আর মানুষের পৃথক পথ অবলম্বন করার।
