নতুন দেবতারা অনেক বেশি সক্রিয় এবং তাদের পিতামাতাকে অতিক্রম করতে সক্ষম : আপসু ভূগর্ভের অতলে দেবে যায় এবং আ আর অনু তার জীর্ণ খোলসের উপর নিজেদের প্রাসাদ তৈরি করে প্রার্থনা আর মন্ত্রণাকক্ষ সম্বলিত। শহুরে দালানসমূহ সব সময়ে পারস্যের সৃষ্টিতত্ত্বের গৌরবময় মুহূর্ত চিহ্নিত করতো। কিন্তু তিয়ামাত এখনও পরাস্ত হয়নি এবং আপসুর বদলা নিতে সে ভয়ংকর দানবদের একটা বাহিনী তৈরি করে। আর যোগ্য সন্তান মারডুক একমাত্র দেবতা যে, তাকে যুদ্ধে হারাতে সক্ষম। এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর মারডুক, তিয়ামাতের বিশাল শবের উপর দাঁড়িয়ে এক বিশাল খোলসি মাছের মতো তাকে দু’টুকরো করে স্বর্গ আর মর্ত্যের সৃষ্টি করে যেখানে এখন থেকে কেবল মানব সন্তানেরা বাস করবে। সে আইন প্রণয়ন করে এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নতুন শৃঙ্খলা সুসংবদ্ধ করার জন্য একটা দিব্য সংঘ প্রতিষ্ঠা করে। শেষে, অনেকটা পরবর্তীকালীন অনুধ্যানের ন্যায়, মারডুক তার হাতে পরাস্ত এক দেবতার রক্তের সাথে একমুঠো ধুলো মিশিয়ে প্রথম মানুষ তৈরি করেন, তিনি দেখাতে চান দেবতারা কেবল তাদের অতিপ্রাকৃতিক এবং প্রাকৃতিক জগতে একলা, আলাদা নেই, বরং মানব সম্প্রদায় এবং প্রাকৃতিক জগৎ সবই একই দিব্য বস্তু থেকে তৈরি হয়েছে।
মানুষের পরিবর্তনের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে পুরাণ যা দেবতাদের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পারস্যের নগর-রাষ্ট্রের বিবর্তন এতে প্রতিফলিত হয়, প্রাচীন কৃষিজীবী সমাজ থেকে সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে (সেটাকে এখন অনুন্নত এবং স্থবির আখ্যা দেয়া হয়েছে) এবং সামরিক শক্তির দ্বারা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিজয় সমাপ্ত হবার পরে মারডুক ব্যাবিলনের পত্তন করে। শহরের কেন্দ্রে ইসাগলিয়ার সুউচ্চ মিনারযুক্ত মন্দির, দিব্য জগতে মারডুকের প্রার্থনালয়ের প্রতিরূপ। ‘অনন্ত স্বর্গের স্মারক’ হিসাবে শহরের সব ভবনের মধ্যে উঁচু মন্দির পরবর্তীকালে দেবতাদের পার্থিব বাসগৃহের মর্যাদা পায়। শহরের নাম ‘বাব-ইলানি’ (দেবতাদের তোরণ) রাখা হয় কারণ এখানেই ঐশ্বরিকতা মানুষের পৃথিবীতে প্রবেশ করে। ইসাগিলার, পবিত্র বিধান উদ্যাপন করতে দেবতারা একত্রিত হন যা থেকে ব্রহ্মাণ্ড তার কাঠামো লাভ করেছে, গোপন পৃথিবী হয়েছে স্পষ্ট এবং ব্রহ্মাণ্ডে দেবতাদের স্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছে।[৫৪]
নতুন শহরটা axis mundiকে এবার প্রতিস্থাপন করতে পারে। যা স্বর্ণযুগে স্বৰ্গ আর মর্ত্যের মাঝে যোগসূত্র হিসাবে বিদ্যমান ছিল।
বাইবেলও সৃষ্টি পুরাণ সংরক্ষণ করেছে যাতে আমরা দেখি তিয়ামাতের ন্যায় ইয়াহ্ওয়েহ্র সমুদ্রের একটা দানবকে হত্যা করে পৃথিবীকে অস্তিত্ব প্রদান করেন।[৫৫]
বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির এধরনের আখ্যান মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের ভিতরে বেশ জনপ্রিয়। এটা তাদের বিশ্বাসকেই সমর্থন করে যে সভ্যতা একটা চলমান সংগ্রাম, পশ্চাদপসরণ করে আকৃতিহীন বর্বরতায় পতন থেকে রক্ষা পেতে অভিভূত করার মতো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। নববর্ষের উৎসবের চতুর্থ দিনে এনুমা এলিশ সুর করে গাওয়া হয়। যে কোনো পৌরাণিক আখ্যানের ন্যায়, সময় নিরপেক্ষ পবিত্র ক্ষণে রহস্যময় এবং অশিষ্ট ঘটনা যা সংঘটিত হয়েছিল, তারই একটা বর্ণনা। সাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনার মতো না যা শেষ হয়ে হেজেমজে গেছে। পৃথিবীর সৃষ্টি একটা চলমান প্রক্রিয়া; বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে ঐশ্বরিক যুদ্ধ আজও ঘটমান এবং বিশৃঙ্খলা এবং বিপর্যয় রুখতে মানুষের দিব্য শক্তির বরাভয় প্রয়োজন।
প্রাচীন পৃথিবীতে, অপ্রেক্ষিত বস্তু বা ঘটনা থেকে তার প্রতীক অচ্ছেদ্য হয়ে উঠে। কারণ সাদৃশ্যতা এক ধরনের পরিচয়ের জন্ম দেয়, অদৃশ্য বাস্তবতাকে বর্তমান করে তুলে। নববর্ষের উৎসবের প্রতীকী কৃত্যানুষ্ঠান একটা নাটক, যা, যে কোনো ভালো নাটকের ন্যায়, স্থানকালের বেড়াজাল ছিন্ন করে, দর্শক এবং কুশীলবদের তাদের পার্থিব চিন্তাবিষ্টতা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। পবিত্রতার ভান করা পুরো ব্যাপারটাই একটা খেলা। প্রার্থনাকারীরা অনুভব করে যে তাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রেক্ষাপট সৃষ্টিকারী যে অনন্ত ঐশ্বরিক জগৎ তারা সেখানে ব্যস্ত হয়ে উঠছে। শেষ হয়ে আসা বছরের জীর্ণতা কাটাতে ছাগল বলি দেয়া হয়; তিয়ামাতের বিরুদ্ধে মারডুকের সংঘর্ষ উপস্থাপিত করতে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার আয়োজন করা হয়; খেলাচ্ছলে রাজাকে লাঞ্ছিত করে উৎসবের মধ্যে থেকে একজনকে সিংহাসনে বসিয়ে বিশৃঙ্খলার শক্তিগুলোকে আবার সৃষ্টি করা হয়। আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই অবলুপ্তি আধ্যাত্মিক বৈকল্যকে স্মরণ করে শামানরা তাদের দীক্ষার সময়ে, যা অনুভব করত, এবং অতিক্রমণের যজ্ঞের প্রত্যাবৃত্তি সতর্কতার সাথে বিন্যস্ত করা হতো। প্রাচীন আধ্যাত্মিকতায়, যে কোনো নতুন সৃষ্টির ক্ষেত্রে আদ্যকালীন বিশৃঙ্খলায় প্রতীকী প্রত্যাবর্তন ছিল অপরিহার্য।[৫৬]
আমরা যেমন জানি, সৃষ্টির গল্প কখনও মানুষকে জীবনের উৎস সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সরবরাহ করে না। প্রাচীন কালে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির গল্প সাধারণত নির্দিষ্ট বিধিমতে আবৃত্তি করা হতো এবং চরম মুহূর্তে : নতুন অভিযানের শুরুতে তারা অজানার দিকে তাকিয়ে আছে– নববর্ষে, বিয়েতে বা রাজাভিষেকের সময়ে, যখন মানুষ দিব্য শক্তির আশীর্বাদ কামনা করে। কিছু জানানো এর উদ্দেশ্য না, এর উদ্দেশ্য মূলত নিরাময় সংক্রান্ত। মানুষ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পুরাণের আবৃত্তি তখনই শ্রবণ করে যখন তারা কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, যখন তারা কোনো সংঘাতের সমাপ্তি চায় বা কোনো অসুস্থকে আরোগ্য লাভ করাতে চায়। মূল ধারণাটা হলো অনন্ত শক্তির বরাভয় লাভ যা মানুষের অস্তিত্বকে ধারণ করে আছে। পুরাণ এবং এর আনুষঙ্গিক আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটাই স্মরণ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় যে ভালো হবার আগে পরিস্থিতি প্রায়ই অনেক সময় খারাপের দিকে যায়, এবং বেঁচে থাকা আর সৃষ্টিশীলতা উভয়েরই জন্য প্রয়োজন নিবেদিত শ্ৰম নিষ্ঠা।
