যখনই ইতিহাসের নতুন পর্বে মানুষ প্রবেশ করেছে, মানবতা এবং ঐশ্বরিকতা সম্পর্কে তাদের ধারণা পাল্টে গেছে। এসব প্রাচীন সভ্যতাসমূহে, নারী ও পুরুষ আধুনিক আমাদের মতো, আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠে যে নিজের নিয়তির কারিগর তারা নিজেরাই। একইসাথে, দেবতাদের সম্পর্কে তাদের পূর্বপুরুষদের লালিত বিশ্বাস তাদের মাঝে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়। মানুষের কর্ম মূল উপলক্ষ্য হবার কারণে, দেবতাদের অনেক দূরবর্তী বলে মনে হয়; নাগালের সামান্য বাইরে স্বতঃসিদ্ধ বাস্তবতা হিসাবে তারা তাদের যোগ্যতা হারায়। নতুন শহুরে পুরাণ বন্যাকে মানব-দিব্য সম্পর্কের মাঝে একটা সংকট হিসাবে বর্ণনা করে। Atrahasis-এ, পারস্যের সবচেয়ে দীর্ঘ বন্যা কাব্য, দেখা যায় দেবতারাও মানুষের মতো নগর পরিকল্পক। গ্রামাঞ্চলকে বসবাসযোগ্য করার উদ্দেশ্যে সেচ খাল খননের সীমাহীন পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র দেবতারা ধর্মঘট করলে, ধরিত্রী দেবী মানুষ সৃষ্টি করেন তাদের দিয়ে এসব ভৃত্যের কাজ করাবেন বলে। কিন্তু অচিরেই তাদের সংখ্যা মাত্রা ছাড়ায় এবং হট্টগোলের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে ঝড়ের দেবতা এনলিল এই চিৎকার চেঁচামেচিতে জেগে উঠতে বাধ্য হলে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটা নিষ্ঠুর পদ্ধতির সাহায্য নেন, তিনি পৃথিবীকে প্লাবিত করেন। কিন্তু এনকি শুরুপ্পাক শহরের ‘চূড়ান্ত জ্ঞানী মানুষ’ আথরাহসিসকে[৫০] বাঁচাতে চান। দু’জনের ভিতরে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায়, এনকি আথরাসিসকে একটা নৌকা বানাতে বলেন, পানিরোধী করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি তিনিই তাকে বলে দেন এবং এই ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের কারণে আথরাহসিস, নূহ (আঃ) এর ন্যায় তার পরিবারকে এবং সমস্ত গাছগাছালির বীজ রক্ষা করতে সমর্থ হয়। কিন্তু পানি নেমে যাবার পরে, ধ্বংসযজ্ঞ দেখে দেবতারাই ভীত হয়ে উঠেন। পারস্য পুরাণে, পৃথিবী থেকে দেবতাদের প্রস্থানের সূচনা এই বন্যার পর থেকেই শুরু হয়। এনকি আথরাহসিস আর তার স্ত্রীকে ডিলমানে নিয়ে যান। মানুষের ভিতরে কেবল তারাই অমরত্বের বরাভয় লাভ করেন এবং দেবতাদের সাথে পুরাতন সখ্য বজায় রাখতে সক্ষম হন। কিন্তু গল্পটা একই সাথে মানবজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে যে দিব্য প্রযুক্তি উজ্জীবিত হয়েছিল সেটারও জয়গান গায়। আমাদের আধুনিক সমাজের মতো, পারস্যে এই সময় থেকেই সভ্যতা এবং সংস্কৃতি পুরান এবং প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
পারস্যবাসীরা কিন্তু পুরোপুরি আমাদের ন্যায় ছিল না। দেবতারা হয়তো বিদায় নিয়েছিল কিন্তু মানুষ তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপে সর্বব্যাপী উপাদান সম্পর্কে অধিকমাত্রায় সচেতন রয়ে যায়। একেকজনে দেবতার পার্থিব জায়গীর হিসাবে একেকটা শহরকে অভিহিত করা হয় এবং প্রতিটি নাগরিক- শাসক থেকে শুরু করে নগণ্য শ্রমিক সবাই– পৃষ্ঠপোষক দেবতা- এনলিল, ইনানা বা এনকির- অধীনতা মেনে নেয়।[৫১] মানুষ তখনও বর্ষব্যাপী দর্শন আঁকড়ে ছিল, যা পৃথিবীর সবকিছুই দিব্য বাস্তবতার প্রতিরূপ হিসাবে দেখত। নগর রাষ্ট্রগুলো বয়স্কদের একটা সংঘ শাসন করত, পারস্যবাসীরা তাই বিশ্বাস করতো যে শীর্ষস্থানীয় দেবতাদের ঐশ্বরিক একটা সংঘও দেবতাদের শাসন করে। তারা আরও মনে করতো যে, ক্ষুদ্র কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী থেকে যেমন তাদের শহুরে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, গ্রামাঞ্চলের প্রাকৃতিক উত্থানপতনের সাথে যা সম্পৃক্ত, দেবতাদের মাঝেও একই ধরনের বিবর্তন সংঘটিত হয়েছিল।
ব্যাবিলোনিয়ান মহাকাব্যে যে সৃষ্টি পুরাণ টিকে আছে শুরুর শব্দ দিয়েই যা পরিচিত Enuma Elish . আমাদের এই ভাষ্য খ্রীস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথম অর্ধের কিন্তু অনেক পুরাতন বিষয়বস্তুও এর অন্তর্ভুক্ত।[৫২] দেবতাদের সৃষ্টি রহস্য দিয়ে কাব্যটার সূচনা যেখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে প্রথমে দেবতাদের সৃষ্টি হয়েছিল। শূন্য থেকে সৃষ্টির (ex nihilo) কোনো কথা সেখানে নেই, কেবল একটা বিবর্তনের প্রক্রিয়া। সেখানে পবিত্র আদি বস্তু থেকে, যা এক প্রকার পিচ্ছিল, অনির্ধারিত পদার্থ, যেখানে কোনো কিছুরই কোনো পরিচয় নেই, প্রথম পর্যায়ের দেবতাদের সৃষ্টি হয়। লবণ আর তিক্ত পানি এক সাথে মথিত হয়, আকাশ, পৃথিবী বা সমুদ্রের কোনো আলাদা অস্তিত্ব ছিল না; এবং দেবতারাও তখন ছিলেন ‘নামহীন, পরিচয়হীন এবং আকৃতিহীন’।[৫৩] এই নোংরা থেকে সৃষ্ট এই দেবতারা উপাদান থেকে ছিল অচ্ছেদ্য। আপসু ছিল মিষ্টি পানির নদী, তিয়ামাত ছিল লবণাক্ত সমুদ্র আর মুম্মু ছিল ধোঁয়াটে মেঘ। তাদের নামগুলোকে আমরা ভাষান্তরিত করতে পারি যথাক্রমে ‘অতল গহ্বর,’ ‘শূন্যতা’ এবং ‘তলাবিহীন খাদ’ হিসাবে।
এসব আদি দেবতারা তখনও ছিল আকৃতিহীন এবং নিষ্ক্রিয়। কিন্তু তাদের ভিতর থেকে অন্যান্য দেবতারা জোড়া জোড়ায় আবির্ভূত হন, প্রতিটি জোড়া পূর্ববর্তী জোড়া অপেক্ষা স্পষ্টভাবে নির্দেশিত। এসব দিব্য উপাদান পরস্পর থেকে পৃথক হলে একটা সুবিন্যস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অস্তিত্ব লাভ করে। প্রথমে সৃষ্টি হলো পলিমাটি (কাদা ও পানি সহযোগে), যথাক্রমে লাহমু আর লাহামু দ্বারা। তারপরে আনশের এবং কিশর (আকাশ এবং সমুদ্রের দিগন্ত) এবং সবশেষে আকাশ দেবতা, অনু এবং ধরিত্রী আ। কিন্তু দেবতাদের সৃষ্টির এই পুরাণ সম্পূর্ণভাবে ঐশ্বরিক বিবর্তনের অধিবিদ্যামূলক অনুমান নির্ভর না; গভীর চিন্তার একটা ছাপ আমরা পারস্যের মাঝে অনুভব করি পলিমাটি জমে সৃষ্টি হওয়া পাললিক অঞ্চল। অন্যদিকে মানব জগতের একটা দিক হলো ঐশ্বরিকতা। ভূ-প্রকৃতি থেকে দেবতারা অচ্ছেদ্য এবং পারস্যের অন্যতম প্রাচীন শহর এরিডুতে অগভীর লবণাক্ত উপহ্রদ যা বসতিকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল এবং যা প্রার্থনা কেন্দ্র ঘিরে রেখেছে, তাকে আপসু বলা হয়। পুরাণে প্রকৃতি থেকে ক্রমিক বিচ্যুতির কথা বলা হয়েছে যা নতুন শহরের বাসিন্দারা নিজেদের ভিতরে অনুভব করেন।
