কিন্তু এই মাত্রার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ব্যাপক ভয়েরও জন্ম দিয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে, ইতিহাস পূর্ণ বিলয়ের একটা প্রক্রিয়া, কারণ প্রতিটি নতুন পরিবর্তনের জন্য পূর্ববর্তী সবকিছুর ধ্বংসের প্রয়োজন।[৪৪] পারস্যের শহরগুলোর ক্ষেত্রে পরিষ্কারভাবে এটাই ঘটেছিল, সেখানকার মাটির তৈরি দেয়ালগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ আর মাঝে মাঝেই পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতো। তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমিতে বিলীন হয়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষের উপরে নতুন কাঠামো নির্মিত হয়েছিল এবং ক্ষয় আর নবায়নের এই প্রক্রিয়া শহর পরিকল্পনার নতুন বিদ্যার জন্ম দিয়েছিল।[৪৫] সভ্যতার অভিজ্ঞতা ছিল জাঁকজমকপূর্ণ কিন্তু ভঙ্গুর, একটা শহর নাটকীয়ভাবে কলেবরে বৃদ্ধি পেয়ে ততোধিক দ্রুততায় বিলুপ্তির গর্ভে তলিয়ে যেত। যখন একটা নগর-রাষ্ট্র সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপরে সে প্রভাব বিস্তার করে। তার ইতিহাস যুদ্ধ, গণহত্যা, বিদ্রোহ আর নির্বাসনের ইতিহাস। ধ্বংসযজ্ঞের মানে হলো তিল তিল করে বহু শ্রমে গড়ে তোলা সংস্কৃতিকে পুনর্নির্মাণ আর প্রতিষ্ঠা করতে হবে বার বার। জীবন আবার পুরাতন বর্বরতায় ফিরে যাবে এই ভয় সবসময়ে কাজ করতো। ভয় আর আশার জট পাকানো পরিস্থিতিতে, নিয়ম আর অনিয়মের মাঝে অনন্ত সংগ্রামকে, নতুন শহুরে পুরাণ মধ্যস্থতার চেষ্টা করে।
নতুন সভ্যতাকে কেউ কেউ যখন বিপর্যয়ের চোখে দেখে তখন অবাক হবার কিছু থাকে না। বাইবেলের লেখকরা একে ঈশ্বর থেকে বিচ্যুতির একটা স্মারক হিসাবে দেখেন, ইডেন থেকে নির্বাসনের পরে থেকে যা তাদের অনুসরণ করছে। শহুরে জীবনের বৈশিষ্ট্যই যেন হিংসা, মারামারি আর স্বার্থসিদ্ধির বোঝাপরা। কেইন ছিল প্রথম শহরটার নির্মাতা আবার প্রথম হত্যাকারীও বটে।[৪৬] তারই বংশধরেরা সভ্যতার আবিষ্কারক : জুবাল ছিল ‘বীনা এবং বংশীবাদক সবার পূর্বপুরুষ,’ এবং টুবালকেইন ছিল ‘সব ধরনের ব্রোঞ্জ আর লোহার হাতিয়ারের নির্মাতা’।[৪৭] ব্যাবিলনের বিখ্যাত মন্দিরের তোরণ বা ziggurat প্রাচীন ইসরালাইটসদের উপরে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। পৌত্তলিক প্রগলভ অহংকার, যার মূল প্রেষণা কেবলমাত্র আত্ম-সংবর্ধনার আকাঙ্ক্ষা এটা তারই প্রতিনিধিত্বকারী বলে তাদের কাছে মনে হয়েছিল। তারা একে টাওয়ার অভ ব্যাভেল বা ব্যাবেল বলে অভিহিত করতো কারণ এর নির্মাতাদের শাস্তি দেবার জন্য ঈশ্বর ‘পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীর ভাষায় একটা বিশৃঙ্খলা আনয়ন করেন এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাদের ছড়িয়ে দেন’।[৪৮]
পারস্যের লোকেরা কিন্তু শহরকে এমন একটা স্থান হিসাবে বিবেচনা করতে থাকে যেখান থেকে তারা দিব্যের মোকাবেলা করতে পারবে। এটা ছিল- প্রায়- হারিয়ে যাওয়া স্বর্গের পুনর্নির্মাণ। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পাহাড়কে মন্দির তোরণ বা ziggurat প্রতিস্থাপন করে, যা প্রাচীন মানুষদের দেবতাদের রাজত্বে বেয়ে উঠতে সাহায্য করতো। দেবতারা শহরে বাস করেন, মানুষের পাশাপাশি দিব্য জগতে তাদের প্রাসাদের অনুকরণে নির্মিত মন্দিরে তাদের অধিষ্ঠান। প্রাচীন পৃথিবীর সব শহরই ছিল পবিত্র শহর। তাদের পূর্বপুরুষেরা যেমন শিকার আর চাষাবাদকে পবিত্র এবং সাংস্কারিক হিসাবে বিবেচনা করতো, গোড়ার দিকের এসব শহরবাসীরা তাদের সাংস্কৃতিক অগ্রগতিকেও তেমনি পবিত্র হিসাবে বিবেচনা করতো। পারস্যে, দেবতারা মানুষকে শিখিয়েছিল কিভাবে উঁচু তোরণযুক্ত মন্দির নির্মাণ করতে হয় এবং জ্ঞানের দেবতা এনকি ছিল চামার, কামার, নাপিত, কুমার, রাজমিস্ত্রী, সেচ, কবিরাজ, সঙ্গীতশিল্পী এবং লেখকদের পৃষ্ঠপোষক।[৪৯] তারা জানত যে তারা একটা চমকপ্রদ কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে যা মানুষের জীবন চিরতরে বদলে দেবে; তাদের নগরগুলো ছিল সর্বব্যাপী কারণ তারা পূর্বেকার জ্ঞাত সবকিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। দেবতাদের দিব্য সৃষ্টিশীলতায় তারা অংশ নিয়েছিল, যারা বিশৃঙ্খলার বিভ্রান্তিতে সামান্য পরিমাণে হলেও শৃঙ্খলা আনতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু পারস্যের লোকদের অহংকারী হিসাবে কল্পনা করাটা ইসরালাইটসদের ভুল হয়েছিল। তারা জানত যে মানবজীবন, দেবতাদের জগতের তুলনায়- এমনকি তাদের অতিকায় নগরগুলোতেও- ত্রুটিপূর্ণ এবং স্বল্পস্থায়ী যা এখনও তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রেক্ষাপট জুড়ে রয়েছে। তাদের নগরগুলো হারিয়ে যাওয়া স্বর্গ ডিলমানের জেলো প্রতিচ্ছবি, যেখানে এখন কেবল দেবতারা এবং কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ বাস করে। তারা খুব ভালো করেই জানত যে, মানব জীবনের মতো, সভ্যতাও নশ্বর এবং অস্থায়ী। ঘনবিন্যস্ত, বিচ্ছিন্ন এবং পাহাড় দ্বারা বিরুদ্ধ শক্তির হাত থেকে সুরক্ষিত এবং নীল নদের নিয়মিত বন্যার কারণে উর্বরা মিশরে মানুষের এইসব পার্থিব অর্জনের প্রতি যথেষ্ট বিশ্বাস ছিল। কিন্তু পারস্যে, যেখানে টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিসের বন্যা ছিল অতর্কিত এবং প্রায়শই বিধ্বংসী, যেখানে মৌসুমী বৃষ্টি মাটিকে চোরাকাদায় পরিণত করতো বা লু হাওয়া তাকে করতো ধুলোয় মলিন, যেখানে বহিরাগত শত্রুর হামলার হুমকি লাগাতার বিব্রত করত মানুষকে, সেখানে জীবন ছিল অনেক বেশি অরক্ষিত। প্রকৃতির বিধ্বংসী আর খেয়ালী শক্তির হাত থেকে সভ্যতাকে বাঁচাতে বীরোচিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বন্যা পুরাণে এসব ভয়ের কথা বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। কোনো প্রাকৃতিক বাধা না থাকার কারণে পারস্যের নদীসমূহের সহসা গতিমুখ পরিবর্তন করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল আর সে কারণে ঘন ঘন বন্যা হতো এবং প্রায়শই তার মাত্রা হতো প্রলয়ংকর। মিশরের মতো, বন্যাকে এখানে আশীর্বাদ হিসাবে দেখা হতো না, বরং তা রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিনাশের রূপকে পরিণত হয়।
