ইনানার সাথে সম্পৃক্ত আচার অনুষ্ঠান তার কাহিনীর শোকাবহতার উপরে আধারিত এবং বসন্ত কালে দুমুজির সাথে তার একত্রিত হওয়াটা কখনও উদ্যাপন করা হয় না। কারণ এটা খুব শক্তিশালীভাবে উপস্থাপিত যা অস্তিত্বের মূলনীতি হিসাবে অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়, ধর্মীয় প্রথা বেশ ব্যাপক বিস্তৃত। ব্যাবিলনে ইনানাকে ইশতার নামে অভিহিত করা হয়, সিরিয়াতে আশতারতে (আশেরাহ্ ); নিকট প্রাচ্যে দুমুজি, তামুজ নামে পরিচিত এবং এই অঞ্চলের রমণীরা তার মৃত্যুতে শোক পালন করে থাকে।[৪০] গ্রীসে তাকে ডাকা হয় এডনিস নামে, কারণ সেমিটিক দুনিয়ার মেয়েরা তাদের ‘লর্ড’ (এডন) এর জন্য শোক পালন করে। এডনিসের কাহিনী সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু এর মূল আখ্যানে, সুমেরীয় পুরাণের সাথে এর মৌলিক বিন্যাসে মিল রয়েছে, সেখানে দেখানো হয় যে দেবী মৃত্যুর কাছে তার তরুণ প্রেমিককে হস্তান্তর করছে। [৪১] শিকারীদের মহান দেবীর ন্যায়, নিওলিথিক ধরিত্রী দেবী আমাদের দেখায় যে, যদিও পুরুষকে অনেক শক্তিশালী বলে মনে হয় তবে মেয়েরাই অধিক শক্তিশালী এবং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা তাদেরই হাতে।
ডিমিতির আর তার কন্যা পার্সিফোনের পুরাণে এটা আপাতভাবে ফুটে উঠেছে, যা নিশ্চিতভাবেই নিওলিথিক পর্বের।[৪২] শস্যমাতা ডিমিতির দায়িত্ব ছিল পৃথিবীর উর্বরতা শক্তি আর শস্য রক্ষা করা। পাতালের শাসক হেডেস পার্সিফোনকে অপহরণ করলে ডিমিতির মাউন্ট আলিম্পাসের আবাস পরিত্যাগ করে বেদনাবিধুর চিত্তে পৃথিবীময় ঘুরে বেড়ায়। কুপিত হৃদয়ে সে নবান্ন আটকে দিয়ে মানুষকে অনাহারে রাখার হুমকি দেয় যদি না তাকে তার কন্যা কোরে (মেয়ে) ফেরত দেয়া না হয়। শঙ্কিত হয়ে দেবরাজ জিউস, দিব্য বার্তাবাহক হামেসকে পাঠান কোরেকে উদ্ধার করতে কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে দিকশূন্যপুরে অবস্থানকালে সে কিছু ডালিমের বীচি খেয়ে ফেলে এবং সে কারণে বছরের চারমাস হেডেসের সাথে কাটাতে বাধ্য হয় এখন যে তার পতিদেব। মায়ের সাথে পুনরায় তার মিলন ঘটলে ডিমিতির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং পৃথিবী আবারও শস্যশ্যামল হয়ে উঠে।
এটা প্রকৃতির কোনো মামুলি রূপক নয়। ডিমিতির কৃত্যানুষ্ঠান শস্য রোপণ বা কাটার সাথে কখনও মিলে না। পৃথিবীর অভ্যন্তরে বীজের ন্যায় পার্সিফোনই হয়তো অবতরণ করে কিন্তু ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে একটা বীজ থেকে কয়েক সপ্তাহে অঙ্কুরোদ্গম ঘটে, সেজন্য চারমাস অপেক্ষা করতে হয় না। ইনানার পুরাণের ন্যায়, এটা আরেকটা দেবীর উধাও হয়ে ফিরে আসবার গল্প। এটা মৃত্যু সম্পর্কীয় পুরাণ। প্রাচীন গ্রীসে, ডিমিতির, শস্য দেবী, আবার মৃত্যুর সহচরী এবং এথেন্সের কাছে অ্যালুসিসে অবস্থিত রহস্যময় প্রার্থনা সভার সভাপতিত্বকারী। এগুলো সব গোপন কৃত্য কিন্তু মনে হয় যে এসব মিসটাই (দীক্ষা) কৃত্য মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবিতা মেনে নেয়ার লক্ষ্যে সূচিত যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এভাবেই মৃত্যু সম্পর্কিত ভীতি কাটানো হয়। এই দীর্ঘ দীক্ষাদান প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের মনমানসিকতার উপরে এইসব শক্তিশালী কৃত্যানুষ্ঠান পুরাণের অর্থ অনপনেয়ভাবে মুদ্রিত করে দেয়। মৃত্যুর উপর চূড়ান্ত বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। কোরেকে অনন্তকাল ধরে মর্ত্য আর পাতালে ঘুরে বেড়াতে হবে। কুমারীর প্রতীকী মৃত্যু ব্যতীত কোনো জীবন খাদ্য বা শস্যকণা বেঁচে থাকতে পারবে না।
অ্যালুসিনিয়ান রহস্য সম্পর্কে আমরা খুব অল্পই জানি, কিন্তু যারা এসব কৃত্যে অংশ নিত তারা বিভ্রান্তবোধ করত যদি তাদের জিজ্ঞেস করা হতো সত্যিই কি তারা বিশ্বাস করে যে পার্সিফোন আসলেই পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল, পুরাণে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। পুরাণটা সত্যি, কারণ যেদিকেই তুমি তাকাবে দেখবে জীবন আর মৃত্যু অচ্ছেদ্য এবং পৃথিবী মারা গিয়ে পুনরায় প্রাণের স্পন্দনে ফিরে আসে। মৃত্যু, ভীতিকর, আতঙ্কময় এবং অবশ্যম্ভাবী কিন্তু সেটাই শেষ কথা না। একটা গাছ কেটে তার মৃত শাখা ছুঁড়ে ফেলে দিলে সেখান থেকে একটা চারা গাছ জন্মায়। কৃষিকাজ একটা নতুন, যদিও সীমিত অর্থে, সম্ভাবনার কথা বলে।[৪৩] শস্য জন্ম দেবার জন্য বীজকে মারা যেতে হবে; ডালপালা ছাঁটা গাছের জন্য আক্ষরিক অর্থে মঙ্গলময় এবং নতুন প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানায়। অ্যালুসিসে দীক্ষানুষ্ঠান দেখায় যে মৃত্যুর সাথে মোকাবেলা আধ্যাত্মিক জাগরণের দিকে নিয়ে যায় এবং মানুষের ক্ষেত্রে সেটা নিড়ানির কাজ করে। এটা অমরত্ব বয়ে আনবে না- সেটা কেবল দেবতাদের জন্য নির্দিষ্ট- কিন্তু এটা আমাদের নির্ভীকভাবে আর পরিপূর্ণভাবে বাঁচতে সাহায্য করে এবং মৃত্যুর মুখের দিকে এখন অনেক শান্তভাবে আমরা তাকাতে পারি। বাস্তবিক প্রতিদিন আমরা আমাদের অর্জিত সত্তাকে মৃত্যুর হাতে সমৰ্পণ করতে বাধ্য হই। নিওলিথিক সময়েও শেষকৃত্যের পুরাণ এবং আচারাদি মানুষকে তাদের মরণশীলতা মেনে নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে যেতে সাহায্য করেছে।
৪. সভ্যতার সূচনাপর্ব
(খ্রি : পূ: ৪০০০ থেকে খ্রি: পূ: ৮০০ সাল) :
খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ সালের দিকে মানুষ সামনের দিকে আরেকটা বড় পদক্ষেপ নেয়, এসময়ে তারা বিভিন্ন নগরীর পত্তন করতে শুরু করে, প্রথমে পারস্যে এবং মিসরে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ সালে এবং পরবর্তীকালে চীন, ভারত এবং ক্রীটে। এসব প্রাচীন সভ্যতার কিছু কোনো স্মারক ব্যতীত পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেছে কিন্তু উর্বর চন্দ্রাকৃতি ভূখণ্ড, এখন যেখানে ইরাক অবস্থিত, আমরা পুরাণে নগরায়নের ফলে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের একটা প্রাথমিক প্রয়াস দেখতে পাই যা শহুরে জীবন উদযাপন করে। এ সময়ে মানুষ অনেক বেশি আত্মসচেতন হয়ে উঠে। উন্নত মার্জিত চিত্রকলায় মানুষ এখন তার আকাঙ্ক্ষার স্থায়ী ছাপ আঁকতে সক্ষম এবং অক্ষর আবিষ্কারের মানে দাঁড়ায় নিজেদের পৌরাণিকতত্ত্বের স্থায়ী সাহিত্যিক ব্যঞ্জনা এখন তারা দিতে পারবে। তারা ঐতিহাসিক যুগে প্রবেশ করে : শহরগুলোতে, পরিবর্তনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং কার্যকরণের পরম্পরা সম্পর্কে মানুষ অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠে। নতুন নতুন প্রযুক্তি শহরের অধিবাসীদের প্রকৃতির উপরে অধিকমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ কায়েমে সাহায্য করে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ধীরে ধীরে তাদের সাথে ব্যবধান বাড়াতে থাকে। উত্তেজনা, স্বাধীনতা আর গর্বের একটা সময় ছিল সেটা।
